সেদিনের সেই ‘বলবয়’!
প্রকাশ : ১৭ জুন ২০১৪, ১৯:১৭
২০১০ সালের মার্চ মাসের ঘটনা। অ্যালিয়াঞ্জ অ্যারেনায় আর্জেন্টিনার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে জার্মানির হয়ে অভিষেক হয়েছিল তার। ম্যাচ হেরে যাওয়ার পর আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে তাকেই পাঠিয়ে দিয়েছিল জার্মানরা। মুশকিল হল ওপাশ থেকে সংবাদ সম্মেলনে এলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার, তখনকার আর্জেন্টাইন কোচ ডিয়েগো ম্যারাডোনা। সংবাদ সম্মেলনে এসেই মঞ্চে ১৭-১৮ বছর বয়সী ছেলেটাকে দেখে ক্ষেপে গেলেন ম্যারাডোনা। ক্ষেপে বেরিয়ে যাওয়ার আগে চিত্কার করে বললেন, ‘আমি এই বলবয়ের সঙ্গে একমঞ্চে বসে সংবাদ সম্মেলন করবো নাকি!’
মাত্র কয়েক মাস পরের ঘটনা। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওই ছেলেটারই গোলে এবং তারই অপ্রতিরোধ্য আক্রমণ তত্পরতায় ৪-০ গোলে স্রেফ উড়ে গেল আর্জেন্টিনা। এবারও সংবাদ সম্মেলনে সেই ছেলেটা। এবার সে স্মিত হাসি হেসে বললো, ‘ম্যারাডোনা আমার কাছে এখনও আগের মতোই হিরো আছেন। উনি সেদিন আমাকে বলবয় ভেবেছিলেন। সমস্যা নেই। এখন নিশ্চয়ই উনি জানেন, আমি কে।’ এখন ম্যারাডোনা কেন, ফুটবলের সামান্যতম খোঁজখবর রাখা প্রতিটি মানুষ জানে, তিনি কে। তিনি থমাস মুলার। আর্জেন্টিনা, নেদারল্যান্ডস থেকে শুরু করে ইউরোপের ছোট-বড় ক্লাবগুলোকে গুঁড়িয়ে দেয়া থমাস মুলার। মাত্র ২৪ বছর বয়সেই বিশ্বকাপ কিংবদন্তীদের কাতারে নাম লেখাতে চলা থমাস মুলার! সোমবার পর্তুগালের বিপক্ষে আরেকবার, বলা চলে এখন পর্যন্ত ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বলতমবারের মতো করে সারাবিশ্বকে মুলার চেনালেন তিনি কে! পর্তুগাল-জার্মানির ম্যাচটা নিয়ে অনেক আলোচনা ছিল। ইউরোপের দুই ‘বড় শক্তি’ মুখোমুখি হচ্ছে বলে এক ধরনের হাইপও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পর্তুগালকে সে ফ গলির দল বানিয়ে ৪-০ গোলের এক দাপুটে জয় তুলে নিলো জার্মানি। কার্যত জয়টা তুলে নিলেন ‘হ্যাটট্রিক ম্যান’ মুলার। বলাই বাহুল্য, এটি বিশ্বকাপে মুলারের প্রথম হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটি ছিল ৪৯তম হ্যাটট্রিক; এবারের আসরের প্রথম। মুলারের জন্য হ্যাটট্রিকটা প্রথম হলেও বিশ্বকাপ মাতানো এই প্রথম নয়। ২০১০ বিশ্বকাপে খেলতে এসেছিলেন একেবারে মাত্র কৈশোর পার করা এক ফুটবলার হিসেবে। তাকে ২৩ জনের দলে রেখে এক ধরনের বিস্ময়ই উপহার দিয়েছিলেন জার্মান কোচ। কিন্তু আসল বিস্ময়টা জমিয়ে রেখেছিলেন মুলার নিজেই। বিশ্বকাপে দলকে চ্যাম্পিয়ন করাতে পারেননি। কিন্তু একটার পর একটা গোল করে তৃতীয় স্থানটা নিশ্চিত করে এসেছিলেন। গোল করেছিলেন গুনে গুনে ৫টি। সংখ্যার বিচারে সেবারের বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন মুলার। ডেভিড ভিয়া, ডিয়েগো ফোরলান ও ওয়েসলি স্নেইডারও করেছিলেন ৫টি করে গোল। কিন্তু এদের চেয়ে মুলার যে পরিষ্কার এগিয়েছিলেন, তারই স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছিলেন গত বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট। কারণ ৫টি গোলের পাশাপাশি ৩টি গোলে পরিষ্কার সহায়তা ছিল তার। গোল্ডেন বুট জেতার পাশাপাশি টুর্নামেন্টের ‘সেরা তরুণ তারকা’ পুরস্কারও জিতলেন মুলার।
ততোদিনে আসলে দুনিয়া জেনে গেছে কে এই মুলার। ক্লাবের হয়েও সেটা জানান দিতে শুরু করেছেন।
মিউনিখ থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের উইহেম শহরে জন্ম মুলারের। এই ৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে প্রতি সকালে বায়ার্নের অ্যাকাডেমিতে সংক্ষিপ্ত ট্রেনিংয়ে হাজির হতেন ১০ বছর বয়সী মুলার। এরপর অবশ্য অ্যাকাডেমির আবাসিক ছাত্র হয়ে গেলেন। বায়ার্ন মিউনিখ যুব প্রকল্পের আবিষ্কার মুলার বায়ার্নেরই দ্বিতীয় দলের হয়ে ক্লাব ক্যারিয়ার শুরু করেন ২০০৮ সালে। পরের বছরই প্রমোশন পেয়ে মূল দলে চলে আসেন। বায়ার্নের কর্মকর্তারা তাকে দু’বছরের চুক্তি সই করিয়ে বলেছিলেন, আপাতত তাকে ধারে কোথাও পাঠানো হতে পারে। সেটা হতে দিলেন না তখনকার বায়ার্ন কোচ লুই ভ্যান গল। তিনি মুলারকে নিয়মিত বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মূল একাদশে খেলাতে থাকলেন। ফলও মিললো হাতে-নাতে। বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে জাত চেনালেন। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি মুলারকে।
এইটুকু ক্যারিয়ারে তিনবার বুন্দেসলিগা জিতেছেন; শেষ দু’বার তাতে নিজেই বড় অবদান রেখেছেন। এর মধ্যে তিনবার চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল খেলেছেন; একবার ট্রফিটাও ঘরে তুলেছেন। সবমিলিয়ে স্বর্ণসময়টা এখন মুলারেরই যাচ্ছে। কিংবা কে জানে, মুলারের সময়টা হয়তো আসছে! বিশ্বকাপে ৮ ম্যাচে এখন পর্যন্ত গোল ৮টি। এবার বিশ্বকাপে এখনও নিশ্চিত ৩টি ম্যাচ আছে হাতে, সেটা বেড়ে অনেকদূর যেতে পারে। বয়স মাত্র ২৪। ফলে মুলারের এখন সময় কিংবদন্তী হয়ে ওঠার পথে চলা শুরু করার। কে জানে, তাহলে আমরা যাদের নিয়ে আলোচনা করি, সেই তারকারা হয়তো মুলারের কাছে ম্লানই হয়ে গেলেন! তখন মুলার আরেকবার নিশ্চয়ই বলবেন, ‘আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, আমি কে!’
বি শ্ব কা পে র ৪ ৯ টি হ্যা ট ট্রি ক
খেলোয়াড় দেশ প্রতিপক্ষ বিশ্বকাপ
বার্ট প্যাটেনাউডি যুক্তরাষ্ট্র প্যারাগুয়ে ১৯৩০
গুইলেরমো স্ট্যাবিলে আর্জেন্টিনা মেক্সিকো ১৯৩০
পেদো সিয়া উরুগুয়ে যুগোস্লাভিয়া ১৯৩০
অ্যাঞ্জেলো শিয়াভিয়ো ইতালি যুক্তরাষ্ট্র ১৯৩৪
এডমুন্ড কোনেন জার্মানি বেলজিয়াম ১৯৩৪
ওল্ডরিড নেজেদলি চেকোস্লাভিয়া জার্মানি ১৯৩৪
আর্নেস্ট উইলোমোস্কি পোল্যান্ড ব্রাজিল ১৯৩৮
লিওনিদাস দ্য সিলভা ব্রাজিল পোল্যান্ড ১৯৩৮
গুস্তাভ ওয়েটেরস্ট্রম সুইডেন কিউবা ১৯৩৮
হ্যারি অ্যান্ডারসন সুইডেন কিউবা ১৯৩৮
অস্কার মিগুয়েজ উরুগুয়ে বলিভিয়া ১৯৫০
আদেমির ব্রাজিল সুইডেন ১৯৫০
স্যান্দোর কোচিস হাঙ্গেরি দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৫৪
এরিচ প্রোবস্ট হাঙ্গেরি চেকোস্লাভিয়া ১৯৫৪
কার্লোস বোর্গেস উরুগুয়ে স্কটল্যান্ড ১৯৫৪
স্যান্দোর কেচিস হাঙ্গেরি পশ্চিম জার্মানি ১৯৫৪
বুরহান সারগিন তুরস্ক দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৫৪
ম্যাক্স মোরলক পশ্চিম জার্মানি তুরস্ক ১৯৫৪
থিওডর ওয়াগনার অস্ট্রিয়া সুইজারল্যান্ড ১৯৫৪
জোসেফ হুগি সুইজারল্যান্ড অস্ট্রিয়া ১৯৫৪
জাস্ট ফন্টেইন ফ্রান্স প্যারাগুয়ে ১৯৫৮
পেলে ব্রাজিল ফ্রান্স ১৯৫৮
জাস্ট ফন্টেইন ফ্রান্স পশ্চিম জার্মানি ১৯৫৮
ফ্লোরিয়ান অ্যালবার্ট হাঙ্গেরি বুলগেরিয়া ১৯৬২
ইউসেবিও পর্তুগাল উত্তর কোরিয়া ১৯৬৬
জিওফ হার্স্ট ইংল্যান্ড পশ্চিম জার্মানি ১৯৬৬
জার্ড মুলার পশ্চিম জার্মানি বুলগেরিয়া ১৯৭০
জার্ড মুলার পশ্চিম জার্মানি পেরু ১৯৭০
ডুসান ব্যাজেভিচ যুগোস্লাভিয়া জায়ার ১৯৭৪
আন্দ্রেজেজ সাজারম্যাচ পোল্যান্ড হাইতি ১৯৭৪
রব রেনসেনব্রিঙ্ক নেদারল্যান্ডস ইরান ১৯৭৮
টিওফিলো কিউবিলাস পেরু ইরান ১৯৭৮
ল্যাজলো কিস হাঙ্গেরি এল স্যালভ্যাদর ১৯৮২
কার্ল-হেইঞ্জ রুমিনিগে পশ্চিম জার্মানি চিলি ১৯৮২
জেবিগ্নিউ বোনিয়েক পোল্যান্ড বেলজিয়াম ১৯৮২
পাওলো রসি ইতালি ব্রাজিল ১৯৮২
প্রেবেন এল্কজায়ের লারসেন ডেনমার্ক উরুগুয়ে ১৯৮৬
গ্যারি লিনেকার ইংল্যান্ড পোল্যান্ড ১৯৮৬
ইগোর বেলানোভ সোভিয়েত ইউনিয়ন বেলজিয়াম ১৯৮৬
এমিলিও বুট্রাগুয়েনো স্পেন ডেনমার্ক ১৯৮৬
মিচেল স্পেন দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৯০
টমাস স্কুহরেভি চেকোস্লাভিয়া কোস্টারিকা ১৯৯০
গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা আর্জেন্টিনা গ্রিস ১৯৯৪
ওলেগ স্যালেঙ্কো রাশিয়া ক্যামেরুন ১৯৯৪
গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা আর্জেন্টিনা জ্যামাইকা ১৯৯৪
মিরোস্লাভ ক্লোসা জার্মানি সৌদি আরব ২০০২
পাওলেতা পর্তুগাল পোল্যান্ড ২০০২
গঞ্জালো হিগুয়েন আর্জেন্টিনা দক্ষিণ কোরিয়া ২০১০
থমাস মুলার জার্মানি পর্তুগাল ২০১৪