অল্প বৃষ্টিতেই তলিয়ে যাচ্ছে রাজধানী

বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে রাজধানীতে। বিশেষ করে রাজধানীর নিচু এলাকাগুলো সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যাচ্ছে। রাজধানীতে জলাবদ্ধতা যে ভয়াবহ রূপ নেবে, তার আভাস এখনই পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি বর্ষার আভাস মিললেও ওয়াসা রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এখনো পানি নিষ্কাশন পাম্প স্থাপন করেনি। নগরীতে ওয়াসার পানি নিষ্কাশনের যে ২৯০ কিলোমিটার ব্যবস্থা রয়েছে, তার ড্রেনেজ লাইনগুলোয় ঘণ্টায় মাত্র ১০ মিলিমিটার বৃষ্টি ধারণ করতে পারে। অথচ বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই এখন প্রতিদিন গড়ে ১০ মিলিমিটারের অধিক বৃষ্টি হচ্ছে। আর এই একটু-আধটু বৃষ্টিতে রাজধানীর অনেক স্থান জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যাচ্ছে। দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে নগরবাসীর। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, অপরিকল্পিত উপায়ে নগরায়নের ফলে এই সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে। এছাড়াও প্রতিবছর কার্পেটিং করার কারণে অধিকাংশ সড়ক স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উঁচু হচ্ছে। পক্ষান্তরে বসতিগুলো নিচু হচ্ছে। এছাড়া জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসাবে রাজধানীর অপরিকল্পিত ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজকে দায়ী করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তারা বলছেন, পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে রাজধানীবাসীর দুর্দশা আরো বাড়বে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত রাজধানীতে ৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। দুপুরের পর থেকে নগরীতে মোট ১৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। আর তাতেই ঢাকার অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। আবহাওয়া অফিসের হিসাবে প্রতিদিনই গড়ে সারা দেশে এখন ৭/৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হচ্ছে। কোথাও কোথাও ৩০ থেকে ৩৫ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হচ্ছে। রাজধানী ঢাকায় ও আশেপাশের এলাকাতে এবার যে পরিমাণ বৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে তা অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি বলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান। গতকালের ১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই পুরানো ঢাকার কাজলা, শ্যামপুর, জুরাইন, ডেমরা, পোস্তগোলা, ফরিদাবাদ, মিরপুরের রোকেয়া সরণী, আজিমপুরের নিউ পল্টন, মানিকনগরসহ নিচু এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এছাড়াও রামপুরা, বাসাবো, গোড়ান, মতিঝিল, পুরানা পল্টন, হাজারীবাগ, ঝিগাতলা, নিমতলী, আশেক লেন, আলাউদ্দিন রোড, নাজিমউদ্দিন রোড, বকশিবাজার, মিরপুর কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, শুক্রাবাদ, মোহাম্মদপুর, কল্যাণপুর, গুলশান-বারিধারা-বাড্ডা ও রায়সাহেব বাজার, মৈশুন্ডি, লক্ষ্মীবাজার, নারিন্দা, নয়াবাজার, মিটফোর্ড, লালবাগ, গেন্ডারিয়াসহ পুরানো ঢাকার বেশকিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়েছে। নগরীর এই জলাবদ্ধতা পাঁচ থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত এমনকি কোথাও কোথাও এক থেকে দুইদিনের অধিক সময় স্থায়ী হচ্ছে। এ কারণে নগরবাসী পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। মোহাম্মদপুরের এক বাসিন্দা জানান, বৃষ্টিতে আদাবর, শ্যামলী ও মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন সরু গলিগুলোতে পানি জমে ছিল। বিশেষ করে কাজলার ভাঙ্গা প্রেসের গলিপথ জলমগ্ন হলে পথচারীরা সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে পড়েন। পুরানো ঢাকার বনগ্রাম, শশীমোহন বসাক লেন, উত্তর মৈশুন্ডি, লালবাগ, সুত্রাপুর, যাত্রাবাড়ী, ধলপুর এবং হাজারীবাগের অনেক রাস্তারও ঠিক একই অবস্থা। গুলশান শাহজাদপুরের কিছু রাস্তায়ও পানি জমেছে। স্কুল-কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রীরাও বিপাকে পড়ে। অনেকে হাঁটু পানি ভেঙ্গে গন্তব্যে পৌঁছান। মানিকনগরের নিচু এলাকায় বস্তি আদলে গড়ে তোলা টিনশেড বাড়িগুলোতে পানি ঢোকে। দুর্ভোগ বাড়ে দরিদ্র মানুষের। ভুক্তভোগীরা জানান, জলাবদ্ধতার কারণে নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা দৈনন্দিন জীবনধারণে নানা দুর্দশায় পড়েছেন। জলজটের সঙ্গে রয়েছে যানজট। অতিরিক্ত বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ডুবে যাওয়ায় যান চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। এ কারণে বেড়েছে যানজট। বিভিন্ন অঞ্চলের প্রধান সড়কসহ অলিগলিও ডুবে গেছে। অপ্রতুল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে পানি নামছে না। রমজানের আগে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সংকট ঘনীভূত হবে বলে জানান তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঢাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় ওয়াসা ও ডিসিসি ছাড়াও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ (এলজিইডি) বেশ কিছু সংস্থার ভূমিকা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ডিসিসি ও ওয়াসার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ডিসিসি ও ওয়াসার কাজে বরাবরই ধীরগতি লক্ষ্য করা যায়। দুই ডিসিসি বলতে গেলে অভিভাবকহীন। এমনকি ওয়াসা রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এখনো ভালোভাবে পানি নিষ্কাশন পাম্প স্থাপন করেনি। কল্যাণপুর ও নারিন্দায় ওয়াসার স্থায়ী নিষ্কাশন কেন্দ্র রয়েছে। বর্ষা আসার আগে সব ধরনের নর্দমা ও বক্স কালভার্ট পরিষ্কার এবং খালগুলো পুরোপুরি খনন করে পানি চলাচলের ব্যবস্থা না করা হলে আরো জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে, রাজধানীর রাস্তাগুলোর দুই ধারে ডিসিসির ভূ-উপরিস্থ প্রায় আড়াই হাজার নর্দমার বেশির ভাগই দীর্ঘদিন ধরে পরিষ্কার করা হয় না। এ কারণে ওয়াসার নিষ্কাশন নালা-নর্দমাও ভরাট হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে। বেশির ভাগ এলাকার নর্দমায় পলিথিন, জালি ও অন্যান্য বর্জ্য জমছে। ডিসিসি সময়মতো সেগুলো পরিষ্কার না করায় ওয়াসার ভূগর্ভস্থ নর্দমায় গিয়ে পড়ছে। পানি বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত ইত্তেফাককে বলেন, জলাবদ্ধতা দূর করতে হলে রাজধানীর হারিয়ে যাওয়া খালগুলো উদ্ধার করতে হবে। খালগুলো সংস্কার ও সংরক্ষণের মাধ্যমে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে । এ ব্যাপারে ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ড্রেনেজ সার্কেল) জাকি মোস্তফা ইত্তেফাককে বলেন, আমরা সাধ্যমত ড্রেনেজ লাইনগুলো পরিষ্কার রাখি। তারপরও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে নগরীর নিম্নাঞ্চলে সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে ওয়াসা কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান্ট-এর কাজ হচ্ছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আশা করা হচ্ছে আগামী এক বছরের মধ্যে রাজধানীর জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব হবে। এছাড়া খাল উদ্ধার অভিযানও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। এই পরিকল্পনাও জলাবদ্ধতা নিরসনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান বলেন, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় তারা সজাগ ও তত্পর আছেন। তিনি ড্রেনগুলোতে আবর্জনা না ফেলে নির্ধারিত ডাস্টবিন ব্যবহারের জন্য নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।