আঁধার ঘরে চাঁদের আলো
বদরগঞ্জ (রংপুর) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১৮ জুন ২০১৪, ২১:২৬
দারিদ্র্যতার কষাঘাতে ওরা ৬ জন। ওরা দু’বেলা ঠিকমত খাবার পায়নি। কারও বাড়িতে বিদ্যুত্ নেই, নেই চেয়ার-টেবিল। কারও থাকার বসতভিটাও নেই, অন্যের জমিতে বসবাস করে আসছে। শত বাধা-বিপত্তির মধ্যেও ওরা এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়েছে।
মৌসুমীর ইচ্ছা ভালো
শিক্ষক হওয়ার
উপজেলার শংকরপুর ঝাড়পাড়া গ্রামের অদম্য মেধাবী মৌসুমী আক্তার পার্বতীপুরের নুরুলহুদা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে জিপিএ- ৫ পেয়েছে। বাবা মফিজুল ইসলাম পেশায় দিনমজুর। মা অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। কোন জমিজমা নেই। দিনমজুর নানা মমিনুল হকের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করেছে মৌসুমী আক্তার। সেখানে চেয়ার-টেবিল না থাকায় বিছানায় বসে কুপির আলোয় পড়ত সে। তার ইচ্ছা গ্রামের কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভালো শিক্ষক হওয়ার।
মানুষের বাড়িতে কাজ করে
জিপিএ-৫ পেয়েছে আক্তারা
মানুষের বাড়িতে কাজ করে অদম্য মেধাবী আক্তারা বানু পেয়েছে জিপিএ-৫। তার বাড়ি উপজেলার মোস্তফাপুর বারবিঘা গ্রামে। সে আফতাফগঞ্জ দ্বিমুখী দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ- ৫ অর্জন করে। তার বাবা সেকেন্দার আলী রিকশাচালক ও মা বিলকিস বেগম গৃহিণী। আক্তারার স্বপ্ন লেখাপড়া শিখে ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু দরিদ্রতার কষাঘাতে তার সেই স্বপ্ন কি পূরণ হবে?
ভালো চিকিত্সক হওয়ার
স্বপ্ন দেখেন রুমি
মেধাবী রুমি আখতারের বাড়ি উপজেলার কুতুবপুর সর্দারপাড়া গ্রামে। সে কুতুবপুর অরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেন জিপি-এ ৫ পায়। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ রুমির বাবা লোকমান হোসেন। মা দিনমজুরির কাজ করে সংসার চালান। বসতভিটা ছাড়া আর কোন জমি নেই। তিন কিলোমিটার হেঁটে সে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতো। রুমি আখতার জানায়, খাতা-কলম ঠিকভাবে কিনতে পারিনি। দিনের আলোয় পড়াশোনা করেছি। খিদের যন্ত্রণায় প্রতিবেশীদের নিকট থেকে ভাত চেয়ে খেয়েছি। স্যারেরা ক্লাসে যা বুঝাতো তা মনোযোগ সহকারে শুনতাম। আমি এখন সরকারি কলেজে ভর্তি হতে চাই। কিন্তু টাকা পাবো কোথায়? ভালো চিকিত্সক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন রুমি।
রিকশাভ্যান চালিয়ে জিপিএ-৫
পেয়েছে ফরহাদ
রিকশাভ্যান চালিয়ে পরিবারের তিন ছেলে-মেয়ের লেখাপড়াসহ পাঁচ সদস্যের সংসার চালান আব্দুর রাজ্জাক। এরমধ্যে দ্বিতীয় ছেলে ফরহাদ হোসেন এবার উপজেলার খিয়ারপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পেয়েছে জিপিএ- ৫। ফরহাদ জানায়, সে নিজেও বাবার সাথে প্রায় দিন রিকশাভ্যান চালিয়েছে। তাদের আবাদি কোন জমি নেই। মা ফরিদা বেগম বলেন, ছইলটা মানুষের দেয়া একটা বুড়া (পুরানা) শার্ট গাওত দিয়া পরীক্কা দিছে। এ্যালা ফির কওচে কলেজোত ভত্তি হইবে। মুই অতো টাকা কোনটে পাও?
মায়ের সাথে ঝিয়ের কাজ
করে নাজমীনের সফলতা
বাবা নজরুল ইসলাম ইটভাটার মৌসুমী শ্রমিক। সংসারে অনটনের কারণে মা শ্যামলী বেগমের সাথে মেধাবী নাজমীন বানু অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে বিজ্ঞান বিভাগে সব বিষয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছে। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতেও বৃত্তি পেয়েছিল নাজমীন। কুতুবপুর অরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়ের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ব্রজেন্দ্র সিংহ রায় বলেন, নাজমীন প্রতিশ্রুতিশীল শিক্ষার্থী। তার প্রখর মেধা রয়েছে। কিন্তু দারিদ্র্যতাই তার শিক্ষার প্রধান প্রতিবন্ধকতা।
দিনমজুরি করেও মেধার স্বাক্ষর
রেখেছে রিপন রায়
দিনমজুরি করে পড়াশোনা করেছে রিপন রায়। বাবা অনিল রায় অসুস্থ। মা রাজবালা রায় অন্যের বাড়িতে ঝি এর কাজ করেন। অন্যের জমিতে খড়ের ঘর তুলে বসবাস করেন তারা। পড়াশোনার খরচতো দূরের কথা দুই বেলা ভাতও জুটেনি রিপনের। এভাবে শত কষ্টের মাঝেও উপজেলার কুতুবপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে সব বিষয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছে সে। তার বাড়ি উপজেলার নাগেরহাট কচুয়া মণ্ডলপাড়া গ্রামে।