দোষ স্বীকার তারেক সাঈদের

নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অবশেষে স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন র্যাব-১১ এর সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্টে কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ। ছয় দফায় ৩২ দিন রিমান্ড শেষে গতকাল নারায়ণগঞ্জ আদালতে তিনি জবানবন্দি দেন। জবানবন্দি শেষে গতকালই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এর আগে কয়েক দফায় রিমান্ড শেষে গত ৪ জুন সাবেক র্যাব কর্মকর্তা আরিফ হোসেন ও পরদিন এমএম রানাও একই আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। এছাড়া গত ১৪ জুন জবানবন্দি দিয়েছেন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের দেহরক্ষী চার্চিল। গতকাল সকাল আটটার দিকে জেলা পুলিশ লাইন থেকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে তারেক সাঈদকে আনা হয় আদালতে। সেখানে তাকে জবানবন্দি দেয়ার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করার জন্য তিন ঘন্টা সময় দেয়া হয়। এরপর ১১টা থেকে বেলা সাড়ে তিনটা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কে এম মহিউদ্দিনের খাস কামরায় সাত খুনের ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলায় জবানবন্দি দেন তিনি। সূত্র জানায়, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তারেক সাঈদ জানান, সাতজনকে অপহরণের বিষয়টি তিনি জানলেও হত্যার বিষয়টি তাকে জানানো হয়নি। অপহরণের পর তাদেরকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ছেড়ে দেয়া হবে তেমনটাই তাকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু সাতজনকে হত্যার পর বিষয়টি তাকে জানানো হয়। আর এ কাজ করেন মেজর আরিফ ও নূর হোসেনসহ র্যাবের কিছু সদস্য। তবে সাতজনকে হত্যার পর বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার জন্য লাশ নদীতে ফেলে দেয়ার কথা বলেন মেজর আরিফকে। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, পুলিশের কাছে ১৬১ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে তারেক সাঈদ জানান, কাউন্সিলর নজরুল ইসলামকে তুলে আনার বিষয় তিনি জানতেন। ঐ সময় তিনি তার অফিসেই অবস্থান করছিলেন। এসময় মোবাইল ফোনে যোগাযোগ রক্ষা করছিলেন আরিফ ও রানা। সাতজনকে অপহরণের পর তাদের বহনকৃত মাইক্রোবাসটি নরসিংদী নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানে নেয়ার পথে হত্যার পরিকল্পনা করে আরিফ ও রানা । এরপর নারায়ণগঞ্জ ফেরার পথে তাদেরকে হত্যা করা হয়। রাতে লাশ নিয়ে আসা হয় শীতলক্ষ্যার পশ্চিম তীরে কাঁচপুর ব্রিজের জনশূন্য স্থানে। আর তখনই হত্যার কথা জানতে পারেন তারেক সাঈদ। ৭ জনের লাশ দেখে তিনি আঁতকে ওঠেন। হত্যা করার জন্য বকাঝকা করেন আরিফ ও রানাকে । কিন্তু তখন তার কিছুই করার ছিল না। এ অবস্থায় গোটা বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার জন্য ইঞ্জিন চালিত নৌকায় করে লাশ ডোবানো হয় শীতলক্ষ্যার চর ধলেশ্বরী এলাকায়। তবে লাশ ডোবানের সময় তারেক সাঈদও অংশ নিয়েছিলেন। সাত খুনের ঘটনায় ফতুল্লা থানায় দুটি মামলা দায়ের হয়। কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ ৫ জনের ঘটনায় মামলা করেন নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি। আর আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়ি চালক হত্যা ঘটনায় মামলা করেন চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় পাল। আদালত সূত্র জানায়, তারেক সাঈদ প্রথমে জবানবন্দি দেন সেলিনা ইসলাম বিউটির দায়ের করা মামলায়। এরপর জবানবন্দি দেন বিজয় পালের দায়ের করা মামলায়। নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের খাসখামরায় তারেক সাঈদের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। এতে তিনি বেশ কিছু তথ্য প্রদান করেছেন। ২৭ এপ্রিল সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার এবং তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক ইব্রাহিম অপহূত হন। পরদিন থানায় মামলা করেন নজরুল ইসলামের স্ত্রী। ৩০ এপ্রিল বিকেলে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৬ জন এবং ১ মে সকালে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত সবারই হাত-পা বাঁধা ছিল। পেটে ছিল আঘাতের চিহ্ন। প্রতিটি লাশ ইটভর্তি দু’টি করে বস্তায় বেঁধে ডুবিয়ে দেয়া হয়। সাতজনকে অপহরণের পর ২৯ এপ্রিল রাতে সে সময়ের জেলা প্রশাসক মনোজ কান্তি বড়াল, পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, র্যাব-১১ এর সিইও তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ, ক্রাইম প্রিভেনশনাল স্পেশাল কোম্পানির কমান্ডার লে. কমান্ডার এমএম রানা, ফতুল্লা থানার ওসি আক্তার হোসেন, সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি আব্দুল মতিনকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে তারেক সাঈদ, আরিফ হোসেন ও এম এম রানাকে র্যাব থেকে চাকরিচ্যুত এবং পরে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীও তাদের অকালীন অবসরে পাঠায়। সাত খুনের ঘটনায় এ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ ২৮ জনকে গ্রেফতার করে। এদের মধ্যে র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ১৪ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয় হত্যা মামলায়। অপরদিকে ১৪ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয় ৫৪ ধারায়। মামলার প্রধান আসামি গত শনিবার দুইসহযোগীসহ গ্রেফতার হয় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের হাতে। তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে সরকার।