দক্ষিণা সুন্দরী

নিবিড় প্রাণের অনুসন্ধান

‘দক্ষিণা সুন্দরী’ আখ্যানটি অন্য যেকোনো মঞ্চ উপস্থাপনা থেকে আলাদা করা যায় এর বিষয়বস্তু উপস্থাপনার ঢংয়ে। যদিও স্যুভেনিয়রে উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে, এটি একটি সর্বপ্রাণবাদী পাঁচালি, কিন্তু এখানে সর্বপ্রাণবাদ বা প্যানথিজমের চেয়ে দক্ষিণা সুন্দরীর পৌরাণিক বা মিথলজিক্যাল বিষয়টি বিশেষ অর্থবহ ও গুরুত্বপূর্ণ। আখ্যানের নামকরণে লোকপুরাণের কোনো এক ভাবনক্ষণে বাঘকে উল্লেখ করা হয়েছিল দক্ষিণা সুন্দরী নামে। অথাত্ দক্ষিণে সুন্দরবন আর বাঘ এই বনের সৌন্দর্য। কাহিনির বিস্তার না থাকলেও ব্যাপকতার উপস্থিতি আছে যে দুজন নর-নারীকে নিয়ে, তারা হলেন বনা ও চন্দ্রে। আবারও উল্লেখ্য, এই সুন্দরবনকে প্রাচীন লোককাহিনিতে চন্দ্রবন নামে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এখানে যাদের বাস ছিল তাদের পরিচয় পাওয়া যায় চন্দ্রবন্দে বা চন্দ্রভণ্ড গোষ্ঠী নামে। আর বনের হিতকর যোদ্ধা বনা প্রতিনিয়ত নিজের মধ্যে লালন করেছেন বাঘ শিকারী পৌরাণিক চরিত্র গাজীকে। সুতরাং বনা ও চন্দ্রের জৈবিক-লৌকিক বনবাসের কাহিনি নিয়ে সৃষ্ট আখ্যান দক্ষিণা সুন্দরী, যে তারা বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম নানা শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং বাঁচিয়ে রাখার জন্য লড়ে। প্রাকৃতিক শক্তি হলো ঝড়, খরা, বন্যা আর কৃত্রিম শক্তি হলো ‘কথিত’ সভ্যজগতের মানুষ, পুঁজিবাদ, করপোরেট দুনিয়া। কৃত্রিম শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য প্রতিনিয়ত আঘাত হানছে প্রকৃতির ওপর। ফলে বিদ্যমান বাস্তু ব্যবস্থার কিছু-না-কিছুর বিনাশ ঘটছে প্রতিনিয়তই যা প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে অনিবার্য করছে। এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণা সুন্দরী একটি সরব প্রতিবাদ। যেখানে প্রাণের সন্ধান করা হয়েছে নিরবধি ও প্রতিনিয়ত। প্রাণের উপস্থিতি সর্বত্র এবং সবকিছুতেই। দক্ষিণা সুন্দরীর উপস্থাপনারীতিতে হাজার বছরের বাংলা নাট্যের যে রীতি তা অনুসরণ করা হয়েছে। নৃত্য-গীত-রসের মাধ্যমে কাহিনিকে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে উপস্থাপনায় ছিল আধুনিকতার ছোঁয়া, যা বোদ্ধাদের মনে কোনো প্রশ্নের জন্ম দেবে কি না তা অমীমাংসিত। তবে শাহমান মৈশান রচিত ও সময়ের জনপ্রিয় নির্দেশক সুদীপ চক্রবর্তীর নির্দেশিত দক্ষিণা সুন্দরী আখ্যানটি যে ভিন্নমাত্রার শিল্পাপস্থাপনা তাতে সন্দেহ নেই। কমনওয়েলথ গেমস-২০১৪-এর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান টিন ফরেস্ট নাট্যোত্সবে মঞ্চায়নের জন্য নির্মিত এই আখ্যানটির গবেষণা উপদেষ্টা ছিলেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, পরিকল্পনা তত্ত্ববধায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন ওয়াহীদা মল্লিক জলি। আখ্যানটি মঞ্চে এনেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত নাটকের দল ‘থিয়েট্রেক্স বাংলাদেশ’।