নায়কোচিত প্রত্যাবর্তন
প্রকাশ : ২০ জুন ২০১৪, ১৯:৩৫
নাটক, আনন্দ, আবেগ কি-না ছিল ইংল্যান্ড-উরুগুয়ের ম্যাচে! নিঃসন্দেহে এটা এবারের বিশ্বকাপের সেরা লড়াইগুলোর একটি। দুর্দান্ত এই লড়াইয়ে ভক্তরা দেখল লিভারপুল স্ট্রাইকার লুইজ সুয়ারেজের আসল চেহারা। বিশ্বকাপের ঠিক আগে হাঁটুতে অস্ত্রোপচারের কারণে যার বিশ্বকাপই মিস হতে যাচ্ছিল, তার হাত ধরেই ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে উরুগুয়ে এখন নক-আউট পর্বের খেলার স্বপ্ন দেখছে। দুর্দান্ত দু’টি গোল করেছেন সুয়ারেজ। গোল দু’টি নিয়ে সুয়ারেজ নিজেই বলেছেন, ‘এমন গোলগুলোরই স্বপ্ন দেখছিলাম আমি।’
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সুয়ারেজ নামবেন কি-না এ নিয়ে অনেকের মধ্যে শঙ্কা ছিল। তবে সদ্য ইনজুরি কাটিয়ে উঠলেও খেলার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয়ী ছিলেন ২৭ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার। খেলার জন্য দাবি করেছিলেন পুরো ফিটনেসেরও, ‘আমি শতভাগ ফিট। যদিও কিছুটা ছন্দের অভাব রয়েছে আমার মধ্যে। এটা থাকা স্বাভাবিক। কেননা অনুশীলন বা খেলায় ছিলাম না।’ প্রথম ম্যাচে কোস্টারিকার কাছে উরুগুয়ে ৩-১ গোলে হারলেও গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ইংলিশদের হারানোর ব্যাপারেও আত্মবিশ্বাসী ছিলেন তিনি, ‘আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখুন। আমরা আরও উন্নতি করতে চাই, কেননা আমরাই সেরা।’
কথা রাখলেন সুয়ারেজ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দলের পুরো দায়িত্ব একাই কাঁধে নিলেন। খেলার ৩৯ মিনিটে দলকে এগিয়ে জানান দেন ইনজুরির পরও ফুরিয়ে যাননি তিনি। খেলার ৭৫ মিনিটে ইংল্যান্ড তারকা খেলায় সমতা ফেলাও দারুণ ম্যাচটির রোমাঞ্চ ঢের বেড়ে যায়। দশমিনিট পরেই আরও একটি দুর্দান্ত গোল উপহার দিয়ে দলকে স্মরণকালের সেরা এক জয় এনে দেন সুয়ারেজ। তিনি নিজেই বললেন- এটা তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ম্যাচ, ‘আমি এমন একটি ম্যাচ খেলেছি যেটা আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ম্যাচ। এটা আমার জন্য দারুণ একটি মুহূর্ত। কিছুদিন আগেও এমনটি আশা করতে পারতাম না।’
এই জয় নিজের সমালোচকদের যথার্থ জবাব বলে মনে করছেন এই স্ট্রাইকার, ‘গত কয়েক বছর ধরে ইংল্যান্ডের অনেকে আমার মনোভাব নিয়ে অনেক হাসি-ঠাট্টা করেছে। তাদেরকে জবাব দেয়ার জন্য এটাই উপযুক্ত সময় ছিল। দেখি, তারা এখন কী চিন্তা করে।’ এই জয়কে দলের সমালোচকদেরও উচিত জবাব বলে জানালেন সুয়ারেজ,‘টুর্নামেন্টের শুরুতেই আমরা অনেক ভুগেছি। এখন আমরা জয়ে ফিরেছি। চ্যালেঞ্জ নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবো। আমাদের দৃষ্টি এখন ইতালি ম্যাচের দিকে। এটা দলের জন্য আরও একটি কঠিন ম্যাচ। যারা আমাদের দলের সমালোচনা করছিল তাদের জন্যই আমাদের এই জয়।’
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চোখ ধাঁধানো নৈপুণ্য দেখালেও সুয়ারেজের কথা শুনে বুঝা গেল পুরো সুস্থতা নিয়ে খেলেননি এই স্ট্রাইকার, ‘দ্বিতীয় গোলটির দশ মিনিট আগে থেকে পায়ে কিছুটা টান অনুভব করছিলাম। এরপরও আমি খেলা চালিয়ে গেছি। কেউ যেন বলছিল, আমার মাঠ ছাড়া উচিত হবে না। যখন আমি প্রথম গোলটি উদযাপন করছিলাম তখন আমি ফিজিওর কাছে ছুটে গিয়েছি; তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছি। কেননা তিনি না থাকলে হয়তো আমার বিশ্বকাপ খেলাই হতো না।’
সুয়ারেজের এই চমক নতুন কিছু নয়। সদ্যসমাপ্ত মৌসুমে দেখানো পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতারই ফসল এটা। ইংলিশ লিগে সর্বশেষ মৌসুমে দুর্দান্ত খেলেছেন তিনি। ৩৩টি ম্যাচ খেলে গোল করেছেন ৩১টি। তার নৈপুণ্যেই মৌসুমের শেষ পর্যন্ত শিরোপার দৌড় জমিয়ে রেখেছিল দ্যা রেডরা। উরুগুয়ে লড়াইয়ে হারায় অপ্রাপ্তি নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে ইংল্যান্ড দলের অধিনায়ক স্টিভেন জেরার্ডকে। লিভারপুলের এই সতীর্থকে সান্ত্বনার বাণীই শুনালেন জয়ের নায়ক সুয়ারেজ, ‘এটা তার জন্য খুবই বাজে একটি মুহূর্ত। সে এমন ধরনের আঘাত পাক এমনটা আমার পছন্দনীয় নয়। আমি তাকে বলেছি, এই ম্যাচ ভুলে সামনে এগিয়ে যাও। তুমি সেরাদের একজন। সত্যি এখন পর্যন্ত আমি যাদের সঙ্গে খেলেছি তাদের মধ্যে সেই সেরা।’
উরুগুয়ের দুর্দান্ত জয়ে উচ্ছ্বসিত কোচ অস্কার তেবারেজ। ম্যাচ শেষে এমনই ছিল তার প্রতিক্রিয়া, ‘সিনেমার স্ক্রিপ্টও এর চেয়ে সুন্দর করে লেখা যাবে না। এই ম্যাচটাকে বিভিন্ন প্রতীকের প্যাকেট বলবো আমি। এর মধ্যদিয়ে আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি যে, আমরা মরে যাইনি। এই জয় আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকার বায়ু এনে দিয়েছে। আমাদের মধ্যে শান্তি এনে দিয়েছে। আমরা আমাদের নিজেদের সম্মান তুলে ধরতে পেরেছি।’
সুয়ারেজেরে ভূয়সী প্রশংসা করে তেবারেজ বলেন, ‘সুয়ারেজকে তার সতীর্থরা অনেক ভালবাসে। তাকে আমরা সবাই ভালবাসি। ব্যক্তি হিসেবে সে দারুণ। একই সঙ্গে সে দলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। আমরা একটি ইউরোপীয়ান দলকে হারিয়েছি। ম্যাচটিতে দু’টি গোলই একজন খেলোয়াড়ই করেছে; যে বিশ্বকাপ খেলতে পারবে কি-না তা এক সপ্তাহ আগেও নিশ্চিত ছিল না। অবশ্যই আমরা তার প্রশংসা করছি। আমরা তাকে অনেক ভালবাসি। আমি মনে করি সেও আমাদের সবাইকে ভালবাসে।’