নদী বাঁচাতে আইনের সঙ্গে চাই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন

নদী বাঁচাতে আইনের পাশাপাশি নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে চলছে নদী দখল ও দূষণ। এসব অপরাধ ঠেকাতে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা ও নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। শুক্রবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘নদী দূষণ, দখলরোধ ও জলাভূমি রক্ষা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলন’ (বিএএনএ) এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। জল ও পরিবেশ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান পানি প্রকৌশলী ম.ইনামুল হক বলেন, ‘শুধু আন্দোলন করলেই হবে না, নদীগুলো মরে যাওয়ার কারণও আমাদের জানতে হবে।’ নদী বাঁচাও আন্দোলন দেশের রাজনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন আনবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। রাজনৈতিক আশ্রয়ে থেকে চোখের সামনে নদী ভরাট করে দখল করা হচ্ছে, এর জন্য আইন থাকা দরকার। লিজ নিয়ে মাটি ভরাট করে বাড়ি করলে তাদের লিজ বাতিল করতে হবে। তিনি বলেন, মানুষের জন্য খাল, নদী, হাওর উন্মুক্ত করে দিতে হবে। জাতিসংঘ পানি প্রবাহ কনভেনশন বাস্তবায়ন আন্দোলনের সমন্বয়কারী হাসনাত কাইয়ূম বলেন, বাংলাদেশে আজও কোন নদী নীতি প্রণয়ন করা হয়নি। ১৯৯৯ সালে জাতীয় পানি নীতি নামে একটি নীতিমালা তৈরি করা হয়। যা নদী রক্ষায় কার্যকর নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। জাতীয় পানি নীতি ১৯৯৯ এর ৪ এর ১ উপ-ধারায় নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনায় ‘সীমান্ত দিয়ে যে সব নদী প্রবেশে করেছে তাতে আমাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। তিনি বলেন, যে সব নদী সবার জন্য আশীর্বাদ ছিল, আজ তা অভিশাপ। একে আবার আশীর্বাদ হিসেবে ফিরে পেতে অধিকতর নজরদারি ও সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নদী দখল ও দূষণ প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। রিভাইন পিপলের সাধারণ সম্পাদক শেখ রোকন বলেন, নদীকে রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। এজন্য সরকারি পদক্ষেপ বা প্রকল্পের অপেক্ষা না করে নাগরিকদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। নদী দূষণ ও দখলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দেলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো শুধু সভা-সমাবেশ না করে নদী ও পরিবেশ রক্ষার উপায় বের করতে হবে। বিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চের আহ্বায়ক প্রকৌশলী ইমরান হাবিব বলেন, একসময় দেশে ১২শ’ নদ-নদী ছিল। এখন তা ২শ’ বা ২শ ২০ টি। এভাবে হারিয়ে যাচ্ছে নদ-নদী। যে কয়টি আছে তাও আবার ভয়াবহ দূষণের শিকার। তিনি বলেন, এই সেগুনবাগিচাতেও ৪০ বছর আগে সেগুনবাগিচা খাল নামক একটি খাল ছিল। যা আজ বিশাল বিশাল অট্টালিকায় চাপা পড়েছে। অ্যাডভোকেট কাজী আখতার হোসেন বলেন, নদী দখল বা দূষণ সব সময়ই ক্ষমতাসীন দলের পৃষ্ঠপোষকতায় হয়। এখনও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। মোক্তাদির হোসেন মন্টু বলেন, নদীমাতৃক বাংলাদেশকে বাঁচাতেই নদীগুলোকে বাঁচাতে হবে। সভায় বক্তারা বলেন, নদী বা পরিবেশ রক্ষায় শুধু সরকারকে এককভাবে দায়ী না করে নাগরিকদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। শিল্প কারখানার বর্জ্য ফেলার কারণেই প্রধাণত নদী দূষণ হচ্ছে। প্রতিদিন নদীতে ফেলা হচ্ছে প্রায় ১২ হাজার কিউবিক মিটার বর্জ্য। এবিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। অনুষ্ঠানের শুরুতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের যুগ্ম সম্পাদক ডা. বোরহান উদ্দিন অরণ্য। লিখিত বক্তব্যে নদীকে রক্ষায় তিনি ১১ দফা সুপারিশ তুলে ধরে বলেন, শিল্পকারখানায় ২৪ ঘণ্টা ইটিপি চালুর পাশাপাশি শিল্পঘন অঞ্চলের বর্জ্য পরিশোধনে সেন্ট্রাল ইটিপি স্থাপন, নদী দখলদারদেরকে উচ্ছেদ করা, নদী রক্ষায় জাতীয় নদী কমিশন গঠন, নদীবন্দরগুলো পুনর্গঠন ও সংস্কারের পদক্ষেপ, খাল-নালা ও ব্রিজগুলোতে পরিচিতিমূলক নামের ফলক লাগানো, পুন:প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নদীতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা, নদীর তীরভূমি রক্ষায় ব্যবস্থা নেয়া, প্লাবনভূমির জন্য জমি অধিগ্রহণ করা ও হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো সরিয়ে নেয়া প্রভৃতি। সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন খন্দকার হাসিবুর রহমান, অ্যাডভোকেট আনোয়ার হোসেন ও আব্দুল্লাহ আল মামুন প্রমুখ।