নেত্রকোনার হাওর দ্বীপের
স্কুল চলে কি চলে না
প্রকাশ : ২০ জুন ২০১৪, ২২:১১
শিক্ষকরা ব্যস্ত বাণিজ্য-গৃহস্থালীতে, ‘সময় পেলে’ স্কুলে যান
শিক্ষার্থী উপস্থিতিও তেমনি,
তদারকি নেই
পিছিয়েপড়া জনপদ আরো
পিছিয়ে পড়ছে
নেত্রকোনার হাওরদ্বীপ খালিয়াজুরীতে ৫৬টি স্কুল। স্কুলগুলোতে পদ অনুযায়ী শিক্ষক আছেন, শিক্ষার্থীও আছে। কিন্তু উপস্থিতি হাতেগোনা। অধিকাংশ স্কুলেই শিক্ষকরা নিয়মিত আসেন না। তাই শিক্ষার্থীরাও আসে না। শিক্ষক উপস্থিত না থাকায় স্কুলে আগেভাগেই ছুটি হয়ে যায়, শিক্ষকরাও আগেভাগে বাড়ি চলে যান। চলছে স্বাধীন, ইচ্ছেমত, কোনো নজরদারি নেই। পিছিয়ে পড়া গ্রাম-জনপদ শিক্ষায় আরো পিছিয়ে পড়ছে।
সকাল সোয়া নয়টার মধ্যে শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে উপস্থিত হওয়া ও বিকেল সোয়া চারটা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি থাকার নিয়ম থাকলেও প্রায় সব শিক্ষকই এ নিয়ম উপেক্ষা করছেন। তারা প্রতিনিয়ত বিদ্যালয়ে হাজির হন বিলম্বে এবং আগেই ক্লাস ছুটি দিয়ে চলে যান। আবার উপস্থিত না থেকে হাজিরা খাতায় উপস্থিতি দেখানো, নিয়ম অনুযায়ী ক্লাস না করানো এখন এখানকার স্কুলে সাধারণ বিষয়।
কোনো কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা পালাক্রমে দিনের পর দিন গড়হাজির থেকেও কাগজে-কলমে উপস্থিত দেখানো হচ্ছে। স্থানীয় শিক্ষা অফিস তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। অভিভাবকরা বলেছেন, বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি শতভাগ নিশ্চিত করা ও ঝরেপড়া রোধে নিয়মিত বাড়ি বাড়ি পরিদর্শন করার গুরুত্বপূর্ণ কাজ শিক্ষকদের হলেও তারা সে দায়িত্ব পালন করছেন না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে না এসে স্থানীয় রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা কৃষি কাজে দিনের পুরোভাগ সময় ব্যয় করছেন। ‘সুযোগ পেলে’ স্কুলে উপস্থিত হন। উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের বয়রা গ্রামের দুলাল মিয়া জানান, শিক্ষক উপস্থিত না থাকার কারণে বয়রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি মাসের অধিকাংশ সময়ই বন্ধ থাকে। এ বিদ্যালয়ে ৩ জন শিক্ষককে নিয়োগ দেয়া হলেও দিনের পর দিন তারা বিদ্যালয়ে আসেন না। উপজেলার মেন্দিপুর ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. রোকন উদ্দিন জানান, আসাদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধিকাংশ শিক্ষকই সপ্তাহে দু’একদিন এসে খাতায় প্রতিদিনের হাজিরা দেখান। খালিয়াজুরী সদর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম আবু ইছাক এবং খালিয়াজুরীর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে ১শ’ গজ দূরে খালিয়াজুরী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও প্রায় একই ঘটনা ঘটছে।
সমপ্রতি বল্লভপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, ৩য় শ্রেণীর শ্রেণীকক্ষে সঞ্জিনা সরকার নামে একজন মাত্র শিক্ষার্থী উপস্থিত রয়েছে। ৪র্থ শ্রেণীতে ৪ জন এবং ৫ম শ্রেণীতে রয়েছে ৮ জন শিক্ষার্থী। এমন কম উপস্থিতির ব্যাপারে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা শম্পা চৌধুরী জানান, এখানকার হাওরপারের শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক বেশিরভাগই অসচেতন বলে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কম থাকে। উপস্থিতির এধরনের চিত্র উপজেলার অধিকাংশ বিদ্যালয়ে দেখা গেলেও বিদ্যালয় শিক্ষকরা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে পার পেয়ে যান।
সারাদেশে জিপিএ-৫-এর ছড়াছড়ি থাকলেও এ উপজেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণীর বার্ষিক সমাপনী পরীক্ষায় বিগত তিন বছরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করলেও জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৪২ জন। এদের কয়েকজনকে আবার জেলা শহরের নামকরা বিদ্যালয় থেকে এনে অনিয়মের মাধ্যমে ভর্তি দেখিয়ে এ উপজেলার পরীক্ষার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করানো হয়েছে। এখানকার শিক্ষার্থীদের কাগজে-কলমে নামেমাত্র পাস করাতে পারলেই স্থানীয় শিক্ষক ও শিক্ষা অফিস দায়মুক্ত হয়ে যান। এখানে কোনো শিক্ষার্থী যদি ভাল ফলাফল করতে পারে তবে কৃতিত্ব তার।
উপজেলা ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বললেন, খালিয়াজুরীর প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম, অবহেলা ও দুর্নীতি নেই। শিক্ষকরা স্কুলে নিয়মিত এবং নিয়ম অনুযায়ীই পাঠদান করছেন। তবে শিক্ষকশূন্যতা এবং শ্রেণীকক্ষ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর উন্নত যোগাযোগের অভাবসহ অধিকাংশ অভিভাবকের অসচেতনতায় এখানে লেখাপড়া পিছিয়ে রয়েছে। তিনি বলেন, উপজেলায় ৫৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও উল্লেখযোগ্য লক্ষ্মীপুর, রসুলপুর, কিষ্টুপুর, মজিবনগর, লেপসিয়া শিবিরসহ ১৮টি গ্রামে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। বিদ্যালয়বিহীন এসব গ্রামের শিক্ষার্থীরা পার্শ্ববর্তী গ্রামের বিদ্যালয়ে গিয়ে ভর্তি হলেও তারা দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে সহজে যাতায়াত করতে পারে না। ফলে এখানে ঝরেপড়ার হার বেশি।
স্থানীয় উপজেলা শিক্ষা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সামছুজ্জামান তালুকদার সুয়েব জানান, সমপ্রতি তিনি পশ্চিম জগন্নাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে দেখেন, এখানকার শিক্ষক হাজিরা খাতায় ৩ জন শিক্ষকের হাজিরা থাকলেও শিক্ষক উপস্থিত রয়েছেন মাত্র ১ জন। তাছাড়া তিনি চাঁনপুর, আমানিপুর, দুর্লভপুরসহ আরো কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখেন বিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-ছাত্রী আছে, শিক্ষক নেই। আবার কোথাও শিক্ষক আছে তো ছাত্র-ছাত্রী নেই। তিনি জানান, এ উপজেলায় শিক্ষা বিভাগের কর্তাদের নজরদারির অভাবে পাঠদানের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা রয়েছে এবং শিক্ষকরা তাদের অনিয়মগুলোকেই এখন নিয়মে পরিণত করেছেন।