গল্প-কথায় পদার্থবিজ্ঞান
প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৪, ২০:২৫
মাধব রায়
সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিদ্যা)
ব্লু-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট
রাতদিন
পর্ব— ১১
আজকে মর্নিংওয়াকে যাবার সময় রেখা গান ধরলো— ওঠো ওঠোরে, বিফলে প্রভাত বহে যায় যে।
গান শেষ হলে অণু বললো আরেকটা গান গাও না রেখাদি। রেখা বললো— কী গান গাইবো ?
তোমার যা ইচ্ছা, বললো অণু।
তাহলে সবাই ধর, একটা পরিচিত এবং সবার জানা গান গাইছি। এদিন আজি কোন ঘরে গো খুলে দিলো দ্বার, আজি প্রাতে সূর্য উঠা সফল হলো কার।
গান থামলে আকাশ বললো— মামা, সূর্য তো ভীষণ তাপ ছড়িয়ে আকাশে উঠে যাচ্ছে।
নীলকান্তবাবু বললেন— হ্যাঁ। গতকাল তো গেলো ২১ জুন, দিন সবচেয়ে বড় ছিলো।
দিন বড় ছিলো মানে ? রাতদিন সমান নয় ?
না, বললেন নীলকান্তবাবু। মাত্র কয়েকটা দিন রাত সমান হয়। বাকিগুলো হয় দিন বড়, না হয় রাত বড়।
দিন বড় ছোট কীভাবে হয় মামা ? বললো চন্দ্রা।
পৃথিবীর দুটি গতি— আহ্নিকগতি আর বার্ষিকগতি, তোরা তো জানিস।
বিন্দু সেটি জানে না, সে বললো— আবার বলো বাবা।
পৃথিবী নিজ অক্ষকে কেন্দ্র করে চব্বিশ ঘণ্টায় একবার পশ্চিম থেকে পূবে পাক খায়। এই আবর্তন বেগটা নিরক্ষরেখায় ঘণ্টায় 1700 কি.মি, ঢাকায় 1600 কি.মি. ফলে সূর্য পূবে উঠে, পশ্চিমে অস্ত যায় বলে মনে হয়। আর চব্বিশ ঘণ্টায় হয় এক দিন। তিনশপয়ষট্টি দিন ছয় ঘণ্টায় একবার পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে আসে। ফলে তিনশপয়ষট্টি দিনে এক বছর।
আর ছয় ঘণ্টা কোথায় গেলো ? বললো রেখা।
আকাশ বললো— আমি জানি। প্রতি চার বছর পরপর ছয় ঘণ্টা যোগ করে ফেব্রুয়ারি মাস ঊনত্রিশ দিনে হয়, এই বছরটাকে লিপইয়ার বলে।
হ্যাঁ,—বললেন নীলকান্তবাবু। এক দিনের গতি আহ্নিকগতি, আর এক বছরের গতিকে বলি বার্ষিকগতি।
তা তো বুঝলাম। কিন্তু দিন বড় ছোট কীভাবে সেটা তো বলছো না। বললো কণিকা।
বলছি, শোন। এখন হলো জৈষ্ঠ্যমাস, বেশ গরম। আবার পৌষ মাঘে বেশ ঠাণ্ডা পড়ে। এটি কেন হয়? নিরুত্তর থাকলো সবাই। জানে না।
পৃথিবী সূর্যের চারপাশের কক্ষপথের সাথে প্রায় 66 ডিগ্রিকোণে হেলে থেকে প্রদক্ষিণ করে। বিভিন্ন সময় হেলানো অবস্থা একটু পরিবর্তন করে। তাই পৃথিবীর একটা নির্দিষ্ট অংশ নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে। তখন সেই অংশটি বেশিক্ষণ ধরে এবং খাড়াভাবে সূর্যের তাপ পায়। সেই অংশে তখন গ্রীষ্মকাল।
বিন্দু বললো— আমাদের গ্লোবটাতে অনেকগুলো রেখা টানা দেখলাম। এগুলো কী ?
নীলকান্তবাবু বললেন— পৃথিবীর কেন্দ্র বরাবর উত্তর দক্ষিণ মেরুগামী একটি কল্পিত রেখাকে বলা হয় অক্ষরেখা বা মেরুরেখা। এর উত্তর প্রান্তকে বলে উত্তরমেরু বা সুমেরু এবং দক্ষিণ প্রান্তকে বলা হয় দক্ষিণমেরু বা কুমেরু। আর পূর্বপশ্চিমে পরিধি বরাবর যে রেখা টানা হয়েছে সেটি বিষুবরেখা বা নিরক্ষরেখা। বিষুবরেখার উত্তর পার্শ্বে উত্তরগোলার্ধ, আর দক্ষিণ পার্শ্বে দক্ষিণগোলার্ধ।
তুমি কোন রেখা? রেখাকে জিজ্ঞাস করলো বিন্দু। হাসলো সবাই। রেখা বললো আমি নিরপেক্ষ রেখা।
আমরা কোন অংশে মামা ? বললো চন্দ্রা।
আমরা উত্তরগোলার্ধে —বললেন নীলকান্তবাবু। আর উত্তরগোলার্ধের এই অংশটা মানে বাংলাদেশসহ কয়টি দেশ ২১ জুন সূর্যের খুব কাছাকাছি চলে আসে। তাই গত ২১ জুন দিনটা খুব বড় ছিলো আর রাত ছিলো ছোট। ২১ জুনের দেড় মাস আগে-পরে মোট তিন মাস উত্তরগোলার্ধে উত্তাপ বেশি থাকে। কারণ তখন উত্তরগোলার্ধের অর্ধেকেরও বেশি অংশে সূর্যকিরণ পায়। ফলে তখন আমাদের এখানে গ্রীষ্মকাল, গরম বেশি থাকে।
তাহলে পৃথিবীর উল্টো দিকে যারা থাকে,তাঁদের তো তখন দিন ছোট হবে। বললো সীমা।
ঠিক বলেছিস। বললেন নীলকান্তবাবু। তখন দক্ষিণগোলার্ধে সূর্যের আলো তীর্যকভাবে পতিত হয়। ফলে দিন ছোট ও রাত বড় হয়। দক্ষিণগোলার্ধে তাপের পরিমাণ কম থাকে, ফলে তখন সেখানে শীতকাল। যেমন অস্ট্রেলিয়া, জুন জুলাই আগস্ট, অস্ট্রেলিয়ায় শীতকাল। তখন সূর্য থেকে দূরে অবস্থান করে দক্ষিণগোলার্ধ।
হ্যাঁ মামা, বললো চন্দ্রা। মাহতাব চাচা অস্ট্রেলিয়া থেকে বাবাকে ফোন করে বলেছেন, ওখানে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা।
কিন্তু এভাবে কয়দিন থাকে? বললো আকাশ।
নীলকান্তবাবু বললেন— পৃথিবী ২১ জুনের পরে হেলানো অবস্থা পরিবর্তন করতে থাকে। বাংলাদেশসহ উত্তরগোলার্ধ দূরে সরতে থাকে আর অস্ট্রেলিয়াসহ দক্ষিণগোলার্ধ সূর্যের কাছে আসতে থাকে। এভাবে ২৩ সেপ্টেম্বর, আশ্বিন মাসে পৃথিবীর বিষুবঅঞ্চল সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে এবং উত্তর ও দক্ষিণমেরু ঐ সময় সূর্য থেকে সমান দূরে থাকে। ফলে ২৩ সেপ্টেম্বর উত্তর ও দক্ষিণগোলার্ধে দিন রাত সমান হয়। বিষুবীয় অঞ্চলে তখন সূর্য মাথার উপরে থাকে এবং বেশ গরম পড়ে। আমাদের বাংলাদেশে তখন দিনরাত প্রায় সমান থাকে। তখন শীতও নয়, আবার গরমও নয়। ২৩ সেপ্টেম্বরের দেড় মাস আগে-পরে মোট তিন মাস উত্তাপ মধ্যম ধরনের থাকে। তখন উত্তরগোলার্ধে, মানে আমাদের এখানে শরত্কাল, আর দক্ষিণগোলার্ধে বসন্তকাল। এভাবে ২১ ডিসেম্বর এলে দক্ষিণগোলার্ধের একটি অংশ সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে, আর বাংলাদেশ সূর্য থেকে দূরে থাকে। ফলে আমাদের দিন ছোট, আর রাত বড় হয়। ২১ ডিসেম্বরের দেড় মাস আগে-পরে উত্তরগোলোর্ধে শীতকাল, দক্ষিণগোলার্ধে গ্রীষ্মকাল।
দিনরাত সমান কি শুধু ২৩ সেপ্টেম্বর ? বললো বিন্দু।
না —বললেন নীলকান্তবাবু। ২১ মার্চও দিন রাত্রি উভয় গোলার্ধে সমান থাকে। ২১ মার্চেরও দেড় মাস আগে-পরে উত্তরগোলার্ধে বসন্তকাল আর দক্ষিণগোলার্ধে শরত্কাল। ২১ মার্চের পরে পৃথিবী আবার ঘুরতে ঘুরতে ২১ জুন তারিখে আগের বছরের অবস্থানে ফিরে আসে।
কণিকা বললো— সবটাই দেখি দেড় মাসের খেলা। এমনি করেই সারা বছরটা শেষ হয়ে যায়। আচ্ছা পৃথিবীটা যদি সূর্যের চারদিকে না ঘুরতো, তাহলে কী হতো বাবা ?
সবাই হাসলো। অণু বললো তাহলে তো ভালোই হতো।
নীলকান্তবাবু বললেন— না, ভালো হতো না। পৃথিবীটা সূর্যের চারপাশে হেলেদুলে না ঘুরলে কোনো একটি জায়গায় সবসময় একই ঋতু থাকতো। তখন বাংলাদেশে সবসময় গরম থাকতো, শীত আসতো না। অথবা সবসময় শীত থাকতো, গরম আসতো না।
তাহলে অসুবিধা কী ? বিন্দু বললো।
তাহলে বিভিন্ন ধরনের ফসল ফলতো না। আমরা আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, কমলা, জাম্বুরা, তরমুজ, লটকন, কামরাঙ্গা, চালতা, তেতুল, বাঙ্গি, খিরা, শশা এগুলো পেতাম না। আউশ, আমন বোরোধান পেতাম না।
তাহলে তো মজা হতো না —বললো বিন্দু। তরমুজের কথা শুনে জিভে জল এসে গেছে। তাড়াতাড়ি চলো বাবা।
অণু বললো— তুমি যেদিন তরমুজ মডেলের কথা বলছিলে বাবা, বিন্দু সেদিনও তরমুজ খাবার কথা বলেছিলো।
কই আমাকে তো বলেনি— বললেন নীলকান্তবাবু। ঠিক আছে, আজই তোদেরকে তরমুজ এনে খাওয়াবো। এখন বাসায় চল।
রেখা বললো— এজন্যই নজরুল গেয়েছেন, চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়।