মানিক মিয়ার লেখনী ভিন্ন মাত্রা যোগ করে ইতিহাসে

প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক বলেছেন, মানিক মিয়া লেখনীর মাধ্যমে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্রের যোগান দেন। যুদ্ধের আবহ তৈরি করেন। ফলে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে যুদ্ধ করা সম্ভব হয়। মানিক মিয়া তার সাহসী লেখনীর মাধ্যমে এদেশের ইতিহাস বিনির্মাণে ভিন্নমাত্রা যোগ করেন। এমন ইতিহাস নায়কদের আমাদের যোগ্য সম্মান দিতে হবে, পরের প্রজন্মের কাছে পরিচিত করতে হবে। গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ কথা বলেন। ‘তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তা’ শীর্ষক স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মানিক মিয়া রিসার্চ একাডেমী। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিডিআরবির চেয়ারম্যান ড. মীজানূর রহমান শেলী, সভাপতিত্ব করেন একাডেমীর উপদেষ্টা ও সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবি। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক শরীফ উদ্দিন আহম্মদ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান প্রমুখ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন একাডেমীর পরিচালক দেলওয়ার হাসান। ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক বলেন, মানিক মিয়ার কাজে সহযোগিতা করেছেন এ’কে ব্রোহি, ড.কামাল হোসেন, আজিজুল হক নান্না মিয়া। আমরা আজ আর তাদের মনে রাখিনি। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না তাদের অবদানের জন্য আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশে বাস করছি। তিনি বলেন, মানিক মিয়া এতই সাহসী ছিলেন যে,যখন পশ্চিমা পেশীশক্তি ক্রমান্বয়ে তার লেখা নিয়ন্ত্রণ করতে চায় তখন তিনি সাদা ইত্তেফাক প্রকাশ করে তার প্রতিবাদ জানান। ড. মীজানূর রহমান শেলী বলেন, মানিক মিয়া ছিলেন যথার্থই বিশ শতকের পূর্ব বাংলার উঠতি মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতিভূ। তার বোধ ও বিশ্বাসের বিপুলায়তন ক্যানভাসে প্রতিবিম্ব ছিল সদ্য বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনমুক্ত পশ্চাদপদ ও পরিবর্তনমুখী সমাজ। চল্লিশের দশকের শুরুতে সমাজ রাজনীতির বৈরী বাস্তবতায় মানিক মিয়ার মানসগঠন প্রক্রিয়া পরিপুষ্টি লাভ করে। ১৯৬৪ সালে নির্বাচনের প্রাক্কালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত হন তিনি। পরে ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকার সাথে যুক্ত হয়ে সাংবাদিকতার সাথে সম্পৃক্ত হন। দাঙ্গা ও দুর্ভিক্ষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তার মানবিক বোধের উন্মেষ ঘটায়। পাকিস্তানের রাজনীতির হঠকারিতা, বৈষম্য ও ভাষার আগ্রাসন তিনি শুরু থেকেই আঁচ করতে পেরে তার পত্রিকায় ‘রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি’ শীর্ষক কলাম লিখতে শুরু করেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়কে তিনি অবিচ্ছেদ্য মনে করতেন। মানিক মিয়া সংবাদপত্রকে একটি ইনস্টিটিউশন মনে করতেন। ড. শেলী বলেন, সংবাদপত্রের সামাজিক দায়বদ্ধতার স্থানটি মানিক মিয়ার কাছে আরও স্পষ্ট ছিল। সংবাদপত্র পরিচালনায় তার একটি রাষ্ট্রদর্শন ও সমাজচিন্তক আদর্শ বোধ ছিল। যা সহজাতভাবে উদার, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে তাড়িত ছিল। তিনি রাজনীতি নিষিদ্ধ পরিবেশে সাংবাদিকতা দিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলনের সমান্তরালে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে প্রেরণাদানকারী চালিকা শক্তির ভূমিকা পালন করেন। তিনি বলেন, বাংলার প্রতিটি আন্দোলনে তার সম্পাদিত ইত্তেফাক নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে। তিনি আব্রাহাম লিংকনের মতো বিশ্বাস করতেন ‘গভর্নমেন্ট অফ দ্যা পিপল, বাই দ্যা পিপল এন্ড ফর দ্যা পিপল, শ্যাল নট পেরিস পেরিস ফ্রম দি আর্থ ’। মীর মোস্তাক আহমেদ রবি তার বক্তব্যে দেশের স্বাধীনতার আন্দোলনে মানিক মিয়াকে বঙ্গবন্ধুর সহযোদ্ধা হিসাবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমাদের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের চেতনা বিনির্মাণে মানিক মিয়ার অবদান অপরিসীম। এক্ষেত্রে তিনি শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধুর মতো মানিক মিয়াকে জাতীয় বীর হিসাবে উল্লেখ করেন। অধ্যাপক শরীফ উদ্দিন আহম্মদ মানিক মিয়ার নামে আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। তিনি মানিক মিয়াকে শুধুমাত্র একজন সাংবাদিক হিসাবে নয়, একজন রাষ্ট্র চিন্তক ও ইতিহাসের নায়ক হিসাবে দেখার উপর গুরুত্ব দেন। অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান তার বক্তব্যে স্বাধীনতা সংগ্রামে মানিক মিয়ার মতো আরও যাদের অবদান আছে তাদের সকলকে মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি দানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, দেশের ইতিহাস পাঁচ বছর পর পর বদলে যাওয়া ঠিক নয়। তিনি বলেন, সঠিক ইতিহাস প্রকাশে ভূমিকা রাখতে হবে।