ফরমালিন পরীক্ষা প্রক্রিয়া নিয়েই উঠেছে প্রশ্ন
প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৪, ২৩:০২
মাছ, ফলসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী মুনাফা লাভের আশায় ফরমালিন মেশাচ্ছে। এর বিরুদ্ধে সরকারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ অভিযানও পরিচালনা করছে। ফলের মৌসুমে আম ও লিচুতে ফরমালিন পাওয়ায় বিভিন্ন স্থানে প্রচুর পরিমাণে আম ও লিচু ধ্বংস করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফরমালিন পরীক্ষার প্রক্রিয়া নিয়ে ফল ব্যবসায়ী, ফল চাষি ও সাধারণ মানুষের মাঝে একটি বিভ্রান্তি পরিলক্ষিত হচ্ছে, তারা নানা প্রশ্ন তুলেছেন। এগুলো দূর করতে হবে। অর্থাত্ ফরমালিন পরীক্ষায় যেন দেশে একটি সর্বজনস্বীকৃত পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। একেক প্রতিষ্ঠান যেন একেক রকম ভাবে ফরমালিন পরীক্ষায় না নামে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ফল পাকলে ফলের নিজস্ব জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় একটি পরিবর্তন হয়। ফল নিজের শরীরেই একটি পচনরোধক ফরমালিন উত্পাদন করে। পরীক্ষার ফলেও বলা হচ্ছে ফরমালিন পাওয়া গেছে, কিন্তু এটি মেশানো না ফলের নিজস্ব তা বলা হচ্ছে না। তাই ফল পরীক্ষার প্রক্রিয়া যেন সর্বজনস্বীকৃত হয় এবং একই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
পচনরোধে খাদ্যদ্রব্যে দীর্ঘদিন ফরমালিন ব্যবহার চিকিত্সা বিজ্ঞানে নিষিদ্ধ। ফরমালিন মিশ্রিত ফল, শাক-সবজি, দুধ, মাছসহ যে কোন ধরনের খাদ্যসামগ্রী মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতি। যুক্তরাষ্ট্রের ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষও ফরমালিন ব্যবহারে সতর্ক করে দিয়েছে।
ফরমালিন ব্যবহারকারীদের কঠোর শাস্তি অর্থাত্ মৃত্যুদণ্ড দেয়া উচিত বলে কেমিক্যাল বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। তাদের মতে, ফরমালিন মানবদেহে যাওয়ার পর ক্যান্সার, কিডনি নষ্ট ও লিভার নষ্টসহ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে ধ্বংস করে ফেলে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পায়। মরণব্যাধি ছাড়াও ডায়াবেটিস, হূদরোগ, বুদ্ধি হ্রাসসহ অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক জটিলতা বাসা বাঁধে শরীরে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবম ফারুক বলেন, আম ও লিচুতে শুরু থেকে পাকা পর্যন্ত চার ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ফল বাগান মালিক নয়, ঢাকার কিংবা স্থানীয় আড়ত মালিকরা বছরের জন্য ফলের বাগান ক্রয় করে থাকেন। তারাই অধিক মুনাফার লোভে ফলে চার ধরনের বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার করেন। যারমধ্যে ফরমালিনও রয়েছে। তিনি জানান, সরেজমিনে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ গিয়ে আম বাগানে চার ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করতে দেখেছেন। তবে তিনি বলেন, ফলের প্রাকৃতিক ফরমালিন ভ্রাম্যমাণ আদালতের পরীক্ষায় ধরা পড়বে না। মুনাফা লোভীদের ব্যবহারকারী ফরমালিন ঐ পরীক্ষায় ধরা পড়বে।
ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধি সমপ্রতি লেবাননে যান। রাজধানী বৈরুত ও আশপাশের এলাকার ফল চাষীদের ফরমালিন সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তারা বলেন, এগুলো তারা ব্যবহার করেন না। কারণ ধরা পড়লে রয়েছে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠিন শাস্তি। ফল রপ্তানিকারকরা যুক্তরাষ্টের এফডিএ যে মান নির্ধারণ করেছে সে ভাবেই ফল সংরক্ষণ করে থাকেন।
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সহকারী প্রধান রিয়াল এডমিরাল এএমএমএম আরঙ্গজেব চৌধুরীর সঙ্গে লেবাননে যায় একটি মিডিয়া দল, যেখানে ছিলেন এ প্রতিনিধি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. নিলুফার নাহার বলেন, ফলে ফরমালিন পরীক্ষার পদ্ধতি যেন সর্বজনস্বীকৃত হয়। একেক জন একেক ধরনের পরীক্ষা করলে ফলাফল ভিন্ন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের অর্থাত্ যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ কিংবা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইন অনুযায়ী একই পদ্ধতিতে যেন ফরমালিন শনাক্ত করার পরীক্ষাটি হয়।
তিনি বলেন, ফলে ফরমালিন দিলে তা উড়ে যায় এবং আশপাশে উপস্থিত মানুষের ক্ষতির আশংকা থাকে বেশি। একারণে ফল কিংবা খাদ্যে ফরমালিন পাওয়া গেলে কঠোর শাস্তি প্রদান করা জরুরি। শাস্তি প্রদান নিশ্চিত করা হলে ফরমালিনসহ বিষাক্ত কেমিক্যাল ফল ও খাদ্যসামগ্রীতে ব্যবহার হবে না বলে তিনি জানান।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রসায়নবিদ ড. নিলুফার আরো বলেন, মাছ চাষে ফরমালিন ব্যবহারে এফডিএর অনুমোদন রয়েছে। তবে পুকুরে ফরমালিন কিংবা ফরমালিনযুক্ত মত্স্য খাবার দেয়া যাবে না। শুধুমাত্র নার্সারি ও হ্যাচারিতে পরিমাণমত ফরমালিন ব্যবহার করা যাবে। সরকারের নিরাপদ খাদ্য আইনসহ ভেজাল খাদ্যসামগ্রী প্রতিরোধে আইন প্রণয়নসহ বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম প্রশংসার দাবিদার ।
গতকাল শনিবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ ফ্রুটস কনজুমারস এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠিত “ফলে ফরমালিনের সত্য-মিথ্যা” শীর্ষক সেমিনারে বিশেষজ্ঞগণ বিস্তারিত তুলে ধরেন। এসোসিয়েশনের আহবায়ক ড. আবদুল ওয়াদুদের সভাপতিত্বে উক্ত সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
ফল আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি হাজী মো. সেলিম এমপি বলেন, সৌদি আরব যে দেশ থেকে ফল আমদানি করে, বাংলাদেশও এই দেশ থেকে ফল আমদানি করে। তারা ফল খেতে পারলে আমরা কেন খেতে পারবো না। আমদানিকারকরা ফলে ফরমালিনসহ কোন কেমিক্যাল দেয় না। আমদানিকারকদের নিজস্ব কোল্ড স্টোরেজ আছে। তারা সেখানেই ফল রেখে ফল বাজারজাত করে।