বাবার সঙ্গে প্রথম খেলা দেখেছি

মা-বাবা আমাদের শেখান খেলা দেখা। খেলার নিয়ম-কানুন। কিভাবে গোল আর কিভাবে অফসাইড হলে জালে বল গেলেও তা গোল না হয়ে ফ্রি-কিক হয়। কোনটাতে নো-বল কোনটাতে হোয়াইট। মা যদি দেন জীবন-যাপনের শিক্ষা, বাবা তবে দেন তার বাইরের পৃথিবীর সাথে পরিচয় ঘটিয়ে। সাধারণ জ্ঞানের অসাধারণ ভাণ্ডার বাবাই আস্তে আস্তে আমাদের কাছে উন্মুক্ত করেন। বাবার সাথে খেলা দেখা নিয়ে আমাদের বিশেষ আয়োজন— ১৯৯৪ সাল ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ। কলোম্বিয়ার সাথে আমেরিকার খেলা। কলোম্বিয়ার দুর্দান্ত ডিফেন্ডার অ্যান্দ্রেস এসকোবার স্যালডাররিয়াগা। উত্তেজনাকর খেলা। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার একসময় প্রচণ্ডগতিসম্পন্ন একটি পাস তার পা ছুঁয়ে নিজেদের গোলপোস্টে ঢুকে যায়। বাবা বললেন, এটা আত্মঘাতী গোল। নিজেরা নিজেদের গোল মানেই আত্মঘাতী। পরের খেলায় সেই খেলোয়াড়কে বাদ দেয়ার খবর বাবার কাছে থেকে পাই। আর খেলা শেষে দেশে ফিরে গেলে সেই খেলোয়াড়কে গুলি করে হত্যা করার খবরও বাবাই আমাকে দেন। যা আমার ছেলেবেলায় বাবার সাথে খেলা দেখার একটি শিহরণ জাগানো স্মৃতি। আমি কোনদিন ভুলব না। বিশ্বকাপ এলেই আমার এসকোবারের কথা মনে পড়ে। আর মনে হয় খেলা যেন খেলাই থাকে জীবননাশী না হয়। এভাবেই বাবার সাথে খেলা দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত সোনালী চীেধুরী। সোনালী বলেন, আনন্দের বিষয় যেন থাকে। সোনালীর সাথে একমত হয়ে এনজিওতে কর্মরত নাদিয়া মোস্তফা জুনায়ের বলেন, খেলা দেখা যে অন্যতম বিনোদনের বিষয় এটা আমি আমার মা-বাবার কাছ থেকেই বুঝতে পেরেছি। আমার বাবা বদলির চাকরি করতেন। তাই আমাদের যখন কোন নতুন জায়গায় যেতে হত তখন আমার বন্ধু থাকতো না। বাবা-মা আমাকে টিভিতে খেলা দেখতে অভ্যস্ত করেন। আমি ফুটবল বিশেষ করে ইউরোপিয়ান লীগ খেলায় নিয়মিত দর্শক হই। আমার বন্ধুদেরও আমি খেলা দেখতে উত্সাহিত করি। আমি যখন খেলা নিয়ে আলোচনা করতাম তখন আমার বন্ধুরা তাতে অংশ নিতে পারতো না। যা আমার ভাল লাগতো না। একটা সময় ওরাও খেলায় আনন্দ পায়। তবে নিজের বন্ধুদের খেলা দেখা নিয়ে অতিরিক্ত মাতামাতি মেনে নিতে পারেন না ইডেন কলেজের শিক্ষার্থী সোনিয়া শারমীন জেসিকা। জেসিকা বলেন, খেলা খেলাই, তা নিয়ে রাজ্যের হট্টগোল আমার ভাল লাগে না। আমরা ভুলে যেন না যাই খেলা নিয়ে বাড়াবাড়ি অন্যদের সমস্যা করতে পারে। বাবার সাথে খেলা দেখার বিষয় জেসিকা বলেন, বাবার পছন্দ ক্রিকেট। শচিন প্রিয় খেলোয়াড়। আমি নিউজিল্যান্ডের সমর্থক। বিশ্বকাপ ক্রিকেট হলেই বাবার সাথে আলোচনা হয়। তবে এর চেয়ে অনেক বেশি কিছু না। আমাদের সময় এমনভাবে খেলা দেখার সুযোগ ছিল না বলে মন্তব্য করেন ষাটোর্ধ্ব আয়শা আমিন। আয়শা বলেন, ছেলেবেলায় বাবার মুখে মোহনবাগানের নাম শুনেছিলাম। আমরা লেখাপড়া নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকতাম। পাশাপাশি কবিতা আর গান। খেলাটা সেভাবে আমাদের টানতে পারেনি। হতে পারে সেটা সামাজিক প্রেক্ষাপট। কিন্তু আমার মেয়ে-ছেলে দু’জনেই তার বাবার সাথে খেলা ছবি নিয়ে আলোচনা করে। শুধু বিশ্বকাপ নয় বিশেষ খেলাগুলো তারা দেখে। আমিও তাদের সাথে যোগ দেই। খাওয়া-দাওয়া হয় মাঝেমধ্যে। নিজেরা অনেক বিষয় ভিন্নমত প্রকাশ করে। ফলাফল নিয়ে বাজি ধরা। আজ কেউ খাওয়াবে অন্যদিন আর একজন— এমন মজাগুলো হয়। আর বাবার কাছেই খেলার আদ্যপান্ত শিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মৌনতা রায়। মৌনতা বলেন, খেলা দেখার আনন্দ বাবার সাথেই পূর্ণ হয়। কারণ আমার মনে হয় আমি যা বলি তা বাবা বুঝতে পারেন। এটা এজন্যও হতে পারে অনেকদিন আমরা এক সাথে খেলা দেখি। তবে আমার মা খেলায় খুব আগ্রহী না হওয়ায় আমরা মাকে মিস করি। মা যদি আমাদের সাথে খেলা উপভোগ করতেন তবে রাত জেগে খেলা দেখাটা তার কাছে বোরিং হতো না। বিশ্বকাপের জন্য আমরা যেমন অপেক্ষা করি। মা তেমনভাবে ভাবেন কবে বিশ্বকাপ শেষ হবে। আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবো। কৃতজ্ঞতা: ফেরদৌস বাপ্পি ও তার পরিবার। ছবি: রেজা চৌধুরী