মেসি ম্যাজিক!

বার্সেলোনার হয়ে ২৭৭ ম্যাচে ২৪৩ গোল, চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ৮৬ ম্যাচে ৬৭ টি। ছয়টি লা লিগার শিরোপা, তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, চারটি ব্যালন ডি’অরের সেরার মুকুট — এই সকল কিছু ব্যর্থ হয়ে যায় যখন আসে বিশ্বকাপ। যে কারণে এতো অর্জনের পরও লিওনেল মেসি আজও হয়ে উঠতে পারেননি ম্যারাডোনা, পেলে, রোনালদো কিংবা জিদান। হয়ে উঠতে পারেননি কিংবদন্তী। কারণ একটা বিশ্বকাপ শিরোপা! আর্জেন্টিনার ২৪ বছরের ক্ষরা কি এবার কাটাতে পারবেন মেসি? প্রশ্নের উত্তর সময়মতই পাওয়া যাবে, কিন্তু বিশ্বকাপে পর পর দুই ম্যাচেই দেখা গেল মেসির ম্যাজিক। আর তাই দিয়েই বিশ্বকাপে আর্জেন্টাইনদের স্বপ্নটা আরও বড় হয়ে উঠলো। পুরো ৯০ মিনিট লিওনেল মেসিকে ঠেকিয়ে রেখেছিল ইরান। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হয়নি। ইনজুরি সময়ে এই মহাতারকার অসাধারণ এক গোলে হার মানতে হলো এশিয়ার দলটিকে। একমাত্র গোলের এই জয়ে ‘এফ’ গ্রুপ থেকে সবার আগে দ্বিতীয় রাউন্ড নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা। জাতীয় দলের হয়ে ৬৮ তম ম্যাচে মেসির এটি ৪০ তম গোল। শুরুর একাদশে ‘ফ্যান্টাস্টিক ফোর’ অর্থাত্ মেসি, আনেহল দি মারিয়া, সের্হিও আগুয়েরো ও গনসালো হিগুয়াইনকে রেখেছিলেন আলেহান্দ্রো সাবেইয়া। আর শুরু থেকে পুরো সময়ে তাদেরকে কড়া মার্কিংয়ে রেখেছিলেন ইরানের খেলোয়াড়রা। যখন মনে হচ্ছিল খেলা গোলশূন্য ড্র হতে যাচ্ছে ঠিক সেই সময়ে নিজের জাত চেনালেন মেসি। ডি বক্সের বাইরে বল পেয়ে সামনের দিক একটু এগিয়ে বাঁ পায়ের ‘ট্রেডমার্ক’ শটে লক্ষ্যভেদ করেন এই ফুটবল জাদুকর। শনিবার বেলো হরিজন্তের স্তাদিও মিনেইরাও শুরু থেকেই ভীষণ রক্ষণাত্মক ছিল ইরান। বেশির ভাগ সময় নিজেদের অর্ধেই এগারো জন খেলোয়াড় নিয়ে খেলছিল তারা। ১৫তম মিনিটে প্রথম ভালো সুযোগটি পায় আর্জেন্টিনা। ফের্নান্দো গাগো বল পাঠিয়েছিলেন ডি বক্সে কিন্তু গনসালো হিগুয়াইন পরাস্ত করতে পারেননি ইরানের গোলরক্ষক হাগিগিকে। ২২তম মিনিটে হিগুয়াইনের পাস থেকে আগুয়েরোর শট ফিরিয়ে দিয়ে আবারও ত্রাতা হাগিগি। পরের মিনিটে মেসির কর্নার থেকে মার্কোস রোহোর হেড অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ৩৬তম মিনিটে মেসির ফ্রি কিক থেকে এসেকিয়েল গারায়ের হেড অল্পের জন্য লক্ষ্যে থাকেনি। প্রথমার্ধে খেলার ধারার বিপরীতে দুটি সুযোগ পেয়েছিল ইরানও। ৩৪তম মিনিটে ইরানের দারুণ একটি প্রতি-আক্রমণ ব্যর্থ করে দেন পাবলো সাবালেতা। আর ৪২তম মিনিটে কর্নার থেকে জালাল হুসাইনি হেড লক্ষ্যে রাখতে পারেননি। দ্বিতীয়ার্ধে আরো আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে আর্জেন্টিনা। ৫০তম মিনিটে মেসির পাস থেকে গোলের সুযোগ পেয়ে যায় দলটি। কিন্তু সাবালেতা বল বাইরে মেরে দলকে হতাশ করেন। কিছুক্ষণ পর গোললাইনের ঠিক সামনে রোহার ক্রসে মাথা ছোঁয়াতে পারেননি আগুয়েরো। প্রথমার্ধে নিজেদের একদমই গুটিয়ে রাখলেও দ্বিতীয়ার্ধে সুযোগ পেলেই পাল্টা আক্রমণে যাচ্ছিল ইরান। এমন একটি আক্রমণ থেকে ৫৩তম মিনিটে গোল প্রায় পেয়েই যাচ্ছিলেন ফরোয়ার্ড রেজা ঘুচানেজাদ। তার হেড থেকে দলকে রক্ষা করেন রোমেরো। ৬৭তম মিনিটে আবারো আর্জেন্টিনার ত্রাতা রোমেরো। আশকান দোজাঘানের হেড লাফিয়ে কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন রোমেরো। ৭৫তম মিনিটে সরাসরি হাগিগির দিকে শট নিয়ে সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করেন দি মারিয়া। ৮৬তম মিনিটে প্রতি আক্রমণ থেকে দারুণ একটি সুযোগ পেয়েছিল ইরান। আলিরেজার পাস থেকে ঘুচানেজাদের জোরালো শট ঝাঁপিয়ে রক্ষা করেন রোমেরো। এরপর যোগ করা সময়ে মেসির দুর্দান্ত ওই গোলে উল্লাসে ভাসে আর্জেন্টিনা সমর্থকরা। এই জয়ে এক ম্যাচ বাকি থাকতেই ‘এফ’ গ্রুপ থেকে নকআউট রাউন্ডে উঠলো দুই বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। সর্বশেষ আর্জেন্টিনা দলটি বিশ্বকাপ জিতেছিল ১৯৮৬ সালে। সেবার ত্রাতা ছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। গত শনিবারের ম্যাচে তিনিও উপস্থিত ছিলেন মাঠে। আর তার উপস্থিতিতেই অনন্য কীর্তিটি গড়লেন মেসি। আর্জেন্টাইন সমর্থকরা এমন একটা দিনের জন্যই অপেক্ষা করছিল। এই ‘সুসময়’ এবার বিশ্বকাপের শেষ পর্যন্ত চললেই হয়!