কবেকার এক ছোট্ট গাছ উঠোনের এক পাশে অবহেলায় ডালপালায় বেড়ে হয়েছে আগাছা। আগাছাই বটে। অসময়ে তাও আবার পত্রপুষ্পে ভরে।
ফুলফোটা মেয়ে ঘরে রাখা দায়। অতএব সত্পাত্রে কন্যাদান। দু’চোখে অঝর ধারা ভেতরে ভাটার টান।
কন্যা চলে যায় দূর গ্রামে, চূড়োবেঁধে সংসার ধর্মে। ঘিঞ্জি গলিতে ভাড়াবাড়ি। দু’খানা ঘর, টানাটানির সংসার। বেকার নেশাখোর স্বামী, বংশ মর্যাদায় বনেদি ।
অশনি সংকেত। মেঘে ঢাকা বাঁকা চাঁদ ঘোলা করে দেয় ধীরে ধীরে লোভ আর হিংসার ফাঁদে—মায়া চাঁদ। দু’একদিন নেশার ঘোরে ঝড় উঠলেও নগদ পাওনা যৌতুকের কথা ভোলে না তারা। আর ভোলে না বলেই রাত গহ্বরের মধ্যেই ঠেসে রাখে মুখ। কোনো মেঘ এসে মাথার ওপর দেয় না ছায়া। তবু মুক্তির আশায় কেবলই অঙ্কুুর উদগমন হতে থাকে আত্মহননের নেশা। মনে মনে ভাবে তাতেই বা কে কবে পেয়েছে মুক্তি? নিরুপায় আত্মহনন, সেখানেও ধিক্কার। কটু বাক্যবাণের প্রহর।
তাই কন্যা হাতে তুলে নেয় দড়ি কলসি, ভাসায় নদীর জলে। তারা ভেসে যায় কচুরিপানার সঙ্গে। ভেসে যায় বেগুনি রং কচুরিপানা ফুল। ফিরে যায় একলা জীবনের কাছে। যদিও সন্তাপে প্রাণ যায় পুড়ে, তবু ফিরে যায় ঘুণপোকাদের পরাজিত করে। কেননা জীবনের প্রতি ছিল তার অগাধ ভালোবাসা।
ফিরতি পথের কান্না শোনেনি কেউ। শুধু পথের চাপা গোঙানির শব্দ ঘুরপাক খেতে খেতে উঠেছে নৈঃশব্দের দিকে। স্বপ্ন ভাঙা যখন আশীর্বাদ তখন তো ভয় পাওয়া চলে না। সব আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে আগুন ছড়ায় ঘোরলাগা অমাবস্যায়। আঁচলের গিট, নাকে নাকছাবি আলগোছে খুলে রাখে রুবী। এই তো ভারি সাড়ে তিন হাত জীবন। সেই জীবনের দিন যায়, রাত যায় অজানা ভয়ে। যায় সব স্মৃতি পুড়িয়ে।
প্রখর রাত্রির কোনো পিছুটান নেই। কন্যা পা রাখে পথে বোঝাপড়া করে নিজের সঙ্গে। তিন দিন না খেতে পেয়ে বিক্রি হওয়ার ভয়ে ছাড়ে ঘর, ছাড়ে আপন পর। তারও চেয়ে ভয় বেওয়ারিশ লাশ মর্গে পচে মরার। বহুদিন পর পালিয়ে কন্যা ফেরে বাপের বাড়ি।
দোর খুলে দাঁড়ায় স্নেহময়ী মা।
—এতোদিনে মনে পড়ল ঘর?
—রাগ কোরো না মা। তুমিই তো কন্যাদান করে নিজেরে করেছ পর। এবার থেকে থাকব তোমার সঙ্গে। ফিরব না স্বামীর ঘর। ভয় পেয়ো না, ভারী পাথরটা সরে গেছে। যা ছিল রুদ্ধশ্বাস, চাপা পড়া নিঃশ্বাস তার সবটুকু আজ মুক্ত। আকাশের তলায় ভয়হীন, বন্ধনহীন, নির্ভার আমি। তুমিও তো জীবনে পাওনি কিছুই। তোমার কপালের সঙ্গে নিয়েছি কপাল মুছে। ভাগ্যকে দোষ দেব না । কাজ নিয়েছি খুঁজে। যা পাব দিনান্তে মায়ে আর মেয়েতে নুন-ভাত খাব শান্তিতে। আমাদের ছাপোষা জীবনে মন খারাপের বিলাসিতা? রাখ তো দূরে ঠেলে। তোমায় নিয়ে স্বাধীন জীবন, যতদূর ইচ্ছে যাব চলে