তবু সেই বিনয়ী ক্লোসাই
প্রকাশ : ২২ জুন ২০১৪, ২১:১৬
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই বলেছিলেন, রেকর্ড নয় দলের সাফল্যে ভূমিকা রাখতে পারলেই খুশি তিনি। গত শনিবার রাতে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডে ভাগ বসানোর পরেও দেখা মিললো সেই পুরনো ক্লোসারই। বললেন, অসাধারণ এই রেকর্ডের অংশ হতে পেরে খুশি তিনি, তবে তার চেয়েও বেশি খুশি ম্যাচে জার্মানিকে সমতায় ফেরাতে পেরে।
‘ব্রাজিল বিশ্বকাপ কে জিততে’ টুর্নামেন্ট শুরুর আগে এই প্রশ্নের পাশাপাশি ঘুরে ফিরে আসছিল আরেকটি ব্যক্তিগত অর্জনের কথাও। সেটা হচ্ছে, আট বছর আগে রোনালদোর গড়া বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড ক্লোসা ভাঙ্গতে পারবেন কিনা। ক্লোসা টানা চতুর্থবারের মতো জার্মানির বিশ্বকাপ দলে জায়গা করে নেয়ার পর থেকেই অবশ্য এই আলোচনাটা চলছিল। কারণ, রোনালদোর রেকর্ডে ভাগ বসাতে একটি মাত্র গোলই প্রয়োজন ছিল এই লাজিও স্ট্রাইকারের।
পর্তুগালের বিরুদ্ধে জার্মানির প্রথম ম্যাচে সুযোগ না পাওয়ায় অপেক্ষাটা বাড়লো আরো কয়েক দিনের জন্য। তবে সেটা হয়তো ক্লোসার ভক্তদের জন্য বড় কোন আক্ষেপ হয়ে আসেনি। কারণ, ক্লোসার অসাধারণ সুযোগসন্ধানী মানসিকতার সঙ্গে এতদিনে নিশ্চয়ই পরিচিত হয়ে গেছেন তারা। সামান্য একটু সুযোগ পেলেই যে সেটা কাজে লাগানোর ক্ষমতা তার আছে গত তিন বিশ্বকাপে ক্লোসার ১৪টি গোলই তার প্রমাণ।
ঘানার বিরুদ্ধে জার্মানির প্রথম গোলদাতা গোয়েটজেকে পাল্টে জোয়াকিম লো যখন ক্লোসাকে নামানের সিদ্ধান্ত নেন জার্মানরা তখন ২-১ ব্যবধানে পিছিয়ে, ম্যাচের চলছে ৭১ মিনিট।
মাঠে নিজের উপস্থিতি প্রমাণে মাত্র মিনিট দুয়েক সময় নিলেন ক্লোসা। বেনেডিক্ট হোয়েডেসের বাড়ানো বলটি যখন গোলপোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যাচ্ছে ঠিক তখনই যেন উড়ে আসলেন ক্লোসা। স্লাইড করে কেবল পা ছোঁয়ালেন বলে। দিক পরিবর্তন করে বলটি আশ্রয় নিল জালে, ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেন ক্লোসা। সমতায় ফিরলো জার্মানি।
গোল উদযাপনে সেই পুরনো ভঙ্গিটাই দেখালেন ক্লোসা। ডানদিকের কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে গিয়েই লাফিয়ে উঠে গেলেন শূন্যে, পুরো এক পাক ঘুরে মাটিতে ছোঁয়ালেন পা।
তবে, ১২ বছর আগে লাফটা যেমন নিখুঁত হত তেমনটা যেন হলো না। আর একটু হলেই তাল সামলাতে না পেরে পরেই যেতেন।
ম্যাচ শেষে এক সাংবাদিক সেটা মনে করিয়ে দিতেই রসিকতা করে বললেন, ‘বোঝাই যাচ্ছে বয়স হয়ে যাচ্ছে আমার!’
তবে বয়স হয়ে গেলেও গোল করায় দক্ষতা যে এতটুকু কমেনি সেটার প্রমাণ তো মাঠেই দিলেন। বিশ্বকাপে খেলতে আসার ঠিক আগেই অবশ্য আরেকটি ব্যক্তিগত রেকর্ডের মালিক হয়েছিলেন। আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে প্রীতি ম্যাচে একটি গোল করে জার্ড মুলারকে টপকে জার্মানির পক্ষে সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক গোলের মালিক হয়েছিলেন। এবার বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকা থেকেও এই কিংবদন্তিকে দুই থেকে তিনে ঠেলে দিলেন ক্লোসা। যদিও মুলারের ১৪ গোল এসেছিল দুই বিশ্বকাপে। সেখানে ক্লোসার লাগলো চারটি বিশ্বকাপ।
কোরিয়া-জাপানে নিজের প্রথম বিশ্বকাপে পাঁচ গোল করে শুরু, এরপর জার্মানিতে পরবর্তী বিশ্বকাপে পাঁচ গোল করে হয়ে গেলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। আর দক্ষিণ আফ্রিকায় গত বিশ্বকাপে এলো আরো চারটি গোল। সবমিলে ১৩৩ ম্যাচে ক্লোসার গোলসংখ্যা গিয়ে দাঁড়াল ৭০।
জার্মানির পক্ষে সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার রেকর্ডও হাতছানি দিচ্ছে ক্লোসাকে। ১৫০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে সেই রেকর্ডটি এখন কিংবদন্তি লোথার ম্যাথুসের দখলে।
তবে এত সব অর্জনও যে তার বিনয়ী রূপকে এতটুকু ম্লান করতে পারেনি ম্যাচ শেষে ক্লোসা প্রমাণ করলেন সেটাই। বললেন, ‘দল যখন জয়ী হয় তখন তাতে সকলের অবদানই থাকে। ঘানার মত দল যদি এগিয়ে যায় তবে অবশ্যই সেটা কঠিন হয়ে পড়ে। পর্তুগালের ম্যাচের তুলনায় অবশ্যই এই ম্যাচটি কঠিন ছিল। ম্যাচের শুরু থেকেই খেলতে পারছি নাকি বদলি বেঞ্চে থেকে উঠে এসেছি সেটা বড় কোন কথা নয়। সব ম্যাচই গুরুত্বপূর্ণ। আর ২০টি বিশ্বকাপ ম্যাচে ১৫ গোল খুব একটা খারাপ নয়। অবশ্যই এটা (রেকর্ড) আমার জন্য বিশেষ কিছু। কোন সন্দেহ নেই তাতে। তবে এর চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমি দলকে সাহায্য করতে পেরেছি।
রেকর্ড গড়ার রাতে কোচের প্রশংসায়ও সিক্ত হয়েছেন ক্লোসা। তাকে অভিনন্দন জানিয়ে জোয়াকিম লো বলেন, ‘আমি সত্যিই তার জন্য অত্যন্ত আনন্দিত। তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে এটি আরেকটি মাইলফলক। গত মৌসুমটা তার জন্য মোটেই সহজ ছিল না। কিন্তু সে আবারো নিজেকে সেরা প্রমাণ করেছে এবং টুর্নামেন্টে নিজেকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একজন কোচ হিসেবে তার মত খেলোয়াড়কে বদলি বেঞ্চে পাওয়া সত্যিই সৌভাগ্যের।’
১৫ রোনালদো (ব্রাজিল), মিরোস্লাভ ক্লোসা (জার্মানী)
১৪ গার্ড মুলার (জার্মানী)
১৩ জাঁ ফতে (ফ্রান্স)
১২ পেলে (ব্রাজিল)
১১ সান্দোর ককসিস (হাঙ্গেরী), জার্গেন ক্লিন্সম্যান (জার্মানী)