সেই ৫ আসর

বাংলাদেশের জন্য এবারের বিশ্বকাপটা অন্যরকম। কারণ, এবারই প্রথমবারের মতো শিরোপা জয়ের স্বপ্ন নিয়ে ইংল্যান্ড গেছে দলটি। এর আগে যে পাঁচটা বিশ্বকাপ খেলেছে বাংলাদেশ, তার কোনোবারই বাংলাদেশকে নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। কেমন ছিল সেই বিশ্বকাপগুলো, চলুন সেই স্মৃতিচারণা করা যাক।

১৯৯৯ (যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডস)

নবীন দল হিসেবে বাংলাদেশের কাছে সেবার এক অর্থে বড় কোনো কিছুর আশাই ছিল না। গ্রুপ পর্যায়ের প্রথম দুটি ম্যাচ ছিল একতরফা। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নিজেদের প্রথম ম্যাচেই নিউজিল্যান্ডের কাছে হেরে যায় ছয় উইকেটের ব্যবধানে। দ্বিতীয় ম্যাচে হারের ব্যবধানটা আরো বড়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মেহরাব হোসেন অপির হাফ সেঞ্চুরির পরও হারতে হয়েছিল সাত উইকেটে।

বদলে যাওয়ার সূচনা হয় ঠিক এর পরের ম্যাচেই। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে এডিনবার্গে আগে ব্যাট করে ৫০ ওভারে ৯ উইকেটে ১৮৫ রান তোলে বাংলাদেশ। মিনহাজুল আবেদীনের অপরাজিত ৬৮ রানের ইনিংসটি টেনে নেয় অত দূর। এরপর স্কটল্যান্ডকে ১৬৩ রানে অলআউট করে ২২ রানের জয় পায় বাংলাদেশ। বিশ্বকাপে প্রথম জয়।

দ্বিতীয় জয়টি আরো বিখ্যাত। গ্রুপের শেষ ম্যাচে তখনও পর্যন্ত অপরাজিত পাকিস্তানকে যে হারিয়ে দেয় বাংলাদেশ! নিজেরা ৯ উইকেট ২২৩ রান তোলার পর পাকিস্তানকে ১৬১ রানে অলআউট করে ৬২ রানের সেই ঐতিহাসিক জয়। ১০ ওভারে ৩১ রান দিয়ে তিন উইকেট নেওয়ায় ম্যাচসেরা হন খালেদ মাহমুদ সুজন। সেই বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সের সুবাদেই পরবর্তী সময় আসে টেস্ট স্ট্যাটাস।

 

২০০৩ (দক্ষিণ আফ্রিকা-জিম্বাবুয়ে-কেনিয়া)

প্রথম বিশ্বকাপটা বাংলাদেশের কাছে ছিল স্বপ্নের মতো এক অভিজ্ঞতা। অভিষেকেই পাকিস্তানের মতো দলকে হারিয়ে দেওয়া তো আর মুখের কথা নয়। কিন্তু ঠিক চার বছর বাদেই বিশ্বকাপটা বাংলাদেশের জন্য বেদনার এক স্মৃতি রেখে গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা-জিম্বাবুয়ে-কেনিয়ায় সেবার বাংলাদেশ একটি ম্যাচেও জিততে পারেনি।

ঝড়ের সূচনা হয় একদম প্রথম ম্যাচ থেকেই। দুর্বল দল কানাডার বিপক্ষে মুখোমুখি হয়েই হার। তাও আবার ৬০ রানের বিশাল ব্যবধানে। সেই পরাজয়ের পর আর মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারেনি খালেদ মাসুদ পাইলটের দল।

শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ন্যূনতম প্রতিদ্বন্দ্বিতাও গড়ে তুলতে পারেনি দলটি। লঙ্কা ও প্রোটিয়াদের বিপক্ষে ১০ উইকেটের লজ্জাজনক পরাজয়ের পর নিউজিল্যান্ডের কাছে হারতে হয়। কে জানে! ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পণ্ড ম্যাচটাও হয়তো বড় লজ্জার হাত থেকেই বাঁচিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশকে।

শেষ ম্যাচে এসে একটা লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেলেও জয় অধরাই থাকে। কেনিয়ার কাছে ৩২ রানের হারের অভিজ্ঞতা দিয়েই শেষ হয় বাংলাদেশের বিশ্বকাপ মিশন। একই সাথে মাঠের বাইরে খেলোয়াড়দের আচরণ নিয়েও ওঠে প্রশ্ন। বিশ্বকাপের পরপরই অধিনায়কত্ব হারান পাইলট।

২০০৭ (ওয়েস্ট ইন্ডিজ)

বলা হয়, এটা বাংলাদেশের সেরা বিশ্বকাপ আসরগুলোর একটি। হাবিবুল বাশার সুমনের নেতৃত্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজ যাওয়া দলটি সেবার প্রথমবারের মতো উঠে যায় দ্বিতীয় রাউন্ডে।

শুরুতে অনেকটা ঘোষণা দিয়েই তারা হারিয়ে দিয়েছিল ভারতকে। ম্যাচের আগের দিনই দেশে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান মানজারুল ইসলাম রানা। মৃত্যুশোকে কাতর বাংলাদেশ যেন তাতে হয়ে ওঠে আরো ভয়ঙ্কর। শচীন-দ্রাবিড়-সৌরভের ভারতকে বাংলাদেশ হারিয়ে দেয় পাঁচ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে।

এরপর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১৯৮ রানের বড় ব্যবধানে হারলেও প্রথম রাউন্ড পার করতে অসুবিধা হয়নি। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে বারমুডাকে পাঁচ উইকেটে হারিয়েই ইতিহাস গড়েন মুশফিক-সাকিব-তামিমরা। দ্বিতীয় রাউন্ডের প্রথম দুই ম্যাচে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হারতে হয় যথাক্রমে দশ ও নয় উইকেটে। এরপরই আসে অসাধারণ ম্যাচ।

প্রতাপশালী দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয় আসে ৬৭ রানের ব্যবধানে। বাংলাদেশের স্পিনত্রয়ী মোহাম্মদ রফিক, আব্দুর রাজ্জাক ও সাকিব আল হাসান তখন বিশ্বের যেকোনো ব্যাটিং আক্রমণের সামনেই ভয়ের কারণ। ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের জয়ের গল্পটা সেখানেই শেষ। এরপর আরো তিনটি ম্যাচ খেললেও কোনোটাতেই জেতা হয়নি। বরং আয়ারল্যান্ডের মতো দলের কাছেও হারতে হয় ৭৪ রানের ব্যবধানে।

২০১১ (বাংলাদেশ-ভারত-শ্রীলঙ্কা)

মনোরম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে পর্দা ওঠে বিশ্বকাপের। উদ্বোধনী ম্যাচে মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশকে ৮৭ রানে হারিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করে ভারত। টুর্নামেন্টের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একইভাবে দাপট দেখিয়ে যায় ভারত। শেষ পর্যন্ত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর এবার ওয়ানডে বিশ্বকাপও জিতে নেয় ভারত।

অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য টুর্নামেন্টটা হয়ে আছে হতাশার এক ইতিহাস হয়ে। দেশের মাটিতে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ছয়টি ম্যাচের মধ্যে তিনটিতে জিতেছিল সাকিব আল হাসানের দল। সমান ম্যাচ জিতেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজও। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে যথাক্রমে ৫৮ ও ৭৮ রানে অল আউট হওয়ার স্মৃতি।

নেট রান রেটে এগিয়ে থেকে শেষ আটে চলে যায় ক্যারিবীয়রা। দেশের মাটিতে পারফরম্যান্স বিবেচনা করলে এটা মোটেও সন্তোষজনক ছিল না। তার ওপর অধিনায়ক সাকিবকে নিয়েও ওঠে প্রশ্ন। যদিও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) তাকেই অধিনায়ক রেখে পাঠায় জিম্বাবুয়েতে। অবশ্য সেখানে দল নাকানি-চুবানি খাওয়ার পর পদ হারাতে হয় সাকিবকে। এরপর অধিনায়ক করা হয় মুশফিকুর রহিমকে।

২০১৫ (অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড)

আগের বারের বিশ্বকাপটা বাংলাদেশের জন্য স্মরণীয় হয়নি। এমনকি ২০১৫ বিশ্বকাপের আগেও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দেশের মাটিতে সফরের আগে বাংলাদেশের ছিল যাচ্ছেতাই অবস্থা। এমনকি দেশের মাটিতে আফগানিস্তান ও হংকয়ের মতো দলের বিপক্ষেও হারতে হয়েছিল।

যদিও, বিশ্বকাপ শুরু হতে না হতেই নতুন এক বাংলাদেশকে দেখে ক্রিকেট বিশ্ব। অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা প্রথমবারের মত বড় মঞ্চে নেতৃত্ব পেয়েই বাজিমাত্ করেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে স্মরণীয় এক জয় নিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল চলে যায় বাংলাদেশ। এটাই এখন অবধি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের স্মরণীয় সাফল্য। যদিও, শেষ আটে ভারতের বিপক্ষে বিতর্কিত এক ম্যাচ হেরে শেষ হয় বাংলাদেশের বিশ্বকাপ।

বিশ্বকাপে রেকর্ডবুকেও নাম লেখায় বাংলাদেশ। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৪ উইকেটে ৩২২ রান করে বাংলাদেশ। এটিই বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ স্কোর। ম্যাচে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ৪টি ক্যাচ নিয়েছেন সৌম্য সরকার। এটাই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ। ২০১৫ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৪টি ডিসমিসাল করেছিলেন উইকেটরক্ষক মুশফিকুর রহিম। এটাও নতুন রেকর্ড।

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের করা অপরাজিত ১২৮ রান এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ইনিংস। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হয়ে মাত্র ২টি সেঞ্চুরি হয়েছে, যার দুটিই করেছেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। দুটিই ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে।

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ সূচি

 

তারিখ প্রতিপক্ষ   ভেন্যু

২ জুন  দক্ষিণ আফ্রিকা ওভাল

৫ জুন  নিউজিল্যান্ড  ওভাল (দিবা-রাত্রি)

৮ জুন  ইংল্যান্ড     কার্ডিফ

১১ জুন শ্রীলঙ্কা      ব্রিস্টল

১৭ জুন ওয়েস্ট ইন্ডিজ টন্টন

২০ জুন অস্ট্রেলিয়া   নটিংহ্যাম

২৪ জুন আফগানিস্তান  সাউদাম্পটন

২ জুলাই ভারত      বার্মিংহ্যাম

৫ জুলাই পাকিস্তান    লর্ডস