কেন বিশ্বকাপ এড়িয়ে চলছেন ‘ফুটবল রাজা’?
প্রকাশ : ২৩ জুন ২০১৪, ২০:০৯
ফুটবলের ‘রাজা’, এ যাবত্কালের সেরা ফুটবলার এবং বিশ্বকাপে ব্রাজিলীয়দের সাফল্যের আইকন হলেও শেষ পর্যন্ত নিজ দেশের রাজসূয়া আসরটিতেই তাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে কেউ যেন তাকে দাওয়াত করতেই ভুলে গেছে।
সাও পাওলোতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ব্রাজিল প্রেসিডেন্ট দিলমা রউসেফ এবং সফররত বিভিন্ন দেশের ও সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু স্যান্তোসে বসবাস করে খুব কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও উপস্থিত ছিলেন না পেলে।
ফোর্তালেজায় ব্রাজিলের দ্বিতীয় ম্যাচে তিনবারের বিশ্বকাপ জয়ী এ কিংবদন্তী কেবল ম্যাচে অনুপস্থিত ছিলেন তাই নয়। সাও পাওলোর কাছে ব্রাজিলের বিখ্যাত ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়ে নিজের গাড়ির ভিতরেই ছিলেন তিনি।
ব্রাজিলের প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের কথা উল্লে¬খ করে পরে গ্লে¬াবো টেলিভিশনকে পেলে বলেন, ‘১৯৫০ সালের পর এই দ্বিতীয়বার আমি রেডিওতে বিশ্বকাপে ব্রাজিল ম্যাচের ধারাভাষ্য শুনলাম।’
ব্রাজিলে সাবেক সফল খেলোয়াড়দের সংখ্যা খুব কম নয়। কিন্তু বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রক্রিয়ায় ৭৩ বছর বয়সী পেলেকে শুভেচ্ছা দূত নিয়োগ করা হয়েছিল।
গত সপ্তাহে পোর্ট সিটি স্যান্তোসের একটি জাদুঘর তার প্রতিকৃতি উন্মোচন করেছে, যেখানে তিনি ক্লাব ফুটবল খেলেছেন। ‘ও রেই’ (রাজা) নিজে থেকেই সে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অথচ নিজ দেশে চলমান বিশ্বকাপে কেবলমাত্র বিরতির সময় সুপারমার্কেট, ফাস্ট ফুড ও শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপনে টেলিভিশনে দেখা যাচ্ছে ফুটবল রাজাকে।
এদিকে ১৩ জুলাই রিও ডি জেনেরিওতে অনুষ্ঠেয় ফাইনাল শেষে কে ট্রফি বিতরণ করবেন তা নিয়েও চলছে ব্যাপক আলোচনা। পেলের ছাড়া অন্য আর যার নাম শোনা যাচ্ছে তিনি হলেন ব্রাজিলের সুপার মডেল জিসেলে বান্ডচেন।
ফ্রান্সের ক্রীড়া ম্যাগাজিন ল্য’ইকুইপের দৃষ্টিতে ‘শতাব্দীর সেরা অ্যাথলেট’ এবং পুরো পৃথিবী জুড়ে খ্যাতিমান একজন ব্যক্তির জন্য অবশ্যই এটা বিস্ময়কর অবমূল্যায়ন। তার ভক্তদের কারো কারো কাছেও এটা বেশ বেমানান।
স্যান্তোসে নতুন উদ্বোধন হওয়া পেলে জাদুঘর পরিদর্শনে আসা ২৭ বছর বয়সী রড্রিগো আন্দ্রেদে বলেন, ‘আমি মনে করি এটা সত্যিই বিস্ময়। আমি মনে করি বিশ্বকাপ দেখতে ব্রাজিল আসা বিশ্বের সব মানুষই পেলেকে দেখতে চায়।’
বার্তা সংস্থা এএফপি’র পক্ষ থেকে চেষ্টা চালানো হলেও মন্তব্যের জন্য পেলেকে পাওয়া যায়নি। তার প্রচারণার দায়িত্বে থাকা দল থেকেও কোন ব্যাখ্যা মেলেনি।
স্যান্তোস ফুটবল ক্লাবের ‘মেমোরিয়াল ডাস ককুইসটাসের’ প্রতিষ্ঠাতা গুইলারমে গুয়ারচের ধারণা, বিশ্ব ফুটবল নিয়ামক সংস্থা ফিফার সঙ্গে পেলের একটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটা নির্ভর করে পেলে এবং ফিফার বোঝাপড়ার ওপর। তবে তাদের মধ্যে কি হয়েছে আমি জানি না, কেন তাকে দেখা যাচ্ছে না। এটা ফিফার ব্যাপার।’
তবে সাংবাদিক ও ঐতিহাসিক সার্কোস গুটারম্যান বলেন, ‘ব্রাজিলে পেলের ভাবমূর্তি ক্রমান্বয়ে ফিকে হয়ে আসছে। তিনি বলেন, ‘বিদেশীরা তাকে যেভাবে বিচার করে, স্থানীয়রা তা করে না। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের একটা স্বর্ণ যুগের প্রতীক পেলে। তবে তিনি এখন অতীত।’
গুটারম্যান আরো বলেন, ‘এখানে পেলের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ অনেক ফুটবলার রয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে সক্রেটিসের। আমাদের কাছে তার মতামতের গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। কারণ তিনি ব্রাজিলের রাজনীতিতে অনেক বেশি জড়িত ছিলেন। কিন্তু পেলে তা করেন না। তিনি সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল, সেটা যে সরকারই হোক। তিনি সরকারের পক্ষে কথা বলেন, এমনকি স্বৈরতান্ত্রিকদেরসহ। সে জন্য আমরা তার রাজনৈতিক মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করি না।’
গত বছর কনফেডারেশন কাপের সময় সামাজিক সমতা ও মৌলিক সুবিধার ঘাটতির প্রতিবাদ জানানো বিক্ষোভকারীদের অবস্থানকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন পেলে। গুটারম্যান বলেন, ‘এটা ছিল খুবই বিব্রতকর... সেই অভিমতের জন্য তিনি খুবই অজনপ্রিয় হয়ে যান এবং অবশ্যই জনগণ সেটা ভুলে যাননি। পেলে মানেই অতীতের স্মৃতিচারণা। তিনি এখন আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নন।’
ব্রাজিলের গণমাধ্যম ও প্রগতিশীলদের কাছে পেলে বর্তমানে অজনপ্রিয় বলে মত দেন সাও পাওলোর পন্টিফিক্যাল ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটির নৃতত্ত্ববিদ ও ফুটবল বিশেষজ্ঞ হোসে পাওলো ফ্লোরেঞ্জানো। তারপরও বিশ্বকাপে পেলের মাঠে না থাকার ঘটনায় তিনি কিছুটা বিস্মিত। পাওলো এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ব্রাজিল দল টুর্নামেন্টে ভাল করলে একটা সময় পেলে মাঠে আসবেন। তবে আমার কাছে তার যে ধারণা সেটি বদলাবে না।’ তিনি বলেন, ফিফার পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৩৬৩ ম্যাচে ১২৮১ গোল করা এবং ১৯৪০ সালে জন্মগ্রহণকারী পেলে সম্পর্কে ব্রাজিলে অনেকেরই বিপরীত মত রয়েছে।
এ যাবত্কালের সেরা ফুটবলার কে- জানতে চাইলে ব্রাজিলীয়রা প্রায়শই বলবে গারিঞ্চার নাম। ‘জয় অব দ্য পিপল’ খ্যাত গারিঞ্চার ড্রিবলিং এবং গোল দক্ষতা অনেকের মনের মধ্যেই গাঁথা আছে।
১৯৫০ সালে ব্রাজিল প্রথমবারের মত বিশ্বকাপ আয়োজন করে এবং নয় বছর বয়সে সে সময় তিনি গাড়িতে বসে নিজ দেশের ম্যাচের ধারাভাষ্য শুনেছিলেন। ৬৪ বছর আগের চেয়ে ব্রাজিল এখন আরো অনেক বেশি ভাল খেলবে এমনটাই আশা পেলের। পাশাপাশি অনেকেই দেখতে চাইবেন চলমান টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার আগেই পেলে আবারো পাদপ্রদীপের আলোয় কতটা উঠে আসেন। বাসস/এএফপি