সৌন্দর্যের মাঝখানে

গ্যারিঞ্চা স্টেডিয়াম

বাংলাদেশের ফুটবল দর্শকদের কাছে ব্রাজিলের সাও পাওলো এবং রিও ডি জেনেরিও যতটা বিখ্যাত ঠিক ততটা পরিচিত নয় ব্রাসিলিয়া শহরটি। অথচ ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়া। এই শহরেরই মান গ্যারিঞ্চা স্টেডিয়ামে গতকাল সোমবার রাতে হয়ে গেলো ২০১৪ বিশ্বকাপ ফুটবলের ‘এ’ গ্রুপের ব্রাজিল ক্যামেরুনের ম্যাচটি। স্টেডিয়ামটিতে নান্দনিকতার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উপকরণে সাজানো। ব্রাজিলের এক একটি শহর সৌন্দর্যে কারো চাইতে কম না। এই শহরের সৌন্দর্যের মাঝখানে স্টেডিয়ামটি অবস্থিত। স্টেডিয়ামের চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ছুটে যাওয়ার বড় বড় পথ। ব্রাসিলিয়ার স্টেডিয়ামটি সত্তুর দশকের বিখ্যাত ফুটবলার গ্যারিঞ্চার নামে। যার পুরো নাম মানুয়েল ফ্রান্সিসকো দ্য স্যান্টোস। বন্ধুর দেয়া ওয়ার্ন শব্দটি যোগ হয়েছিল গ্যারিঞ্চার ডাকনামের সাথে। বাংলাদেশের ফুটবলে প্রবীণ দর্শকের কাছে এখনও গ্যারিঞ্চা দারুণ জনপ্রিয়। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ব্রাজিলের জার্সি গায়ে খেলেছেন এই উইংগার। ১৯৫৮ সালে সুইজারল্যান্ড এবং ১৯৬২ চিলি বিশ্বকাপ ফুটবলে চ্য্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে গ্যারিঞ্চার ছিল বড় অবদান। চিলি বিশ্বকাপ ফুটবলে পেলে ইনজুরি হওয়ায় দলকে নেতৃত্ব দিয়ে গ্যারিঞ্চা পেয়েছিলেন গোল্ডেন বল। আরো পেয়েছিলেন গোল্ডেন বুট। পেলে ছাড়াও ব্রাজিলকে চ্যাম্পিয়ন করার মতো খেলোয়াড় দলে ছিলেন। সেটা ভালোভাবেই প্রমাণ করে ব্রাজিল ফুটবলে তিনি হয়েছেন কিংবদন্তী। ব্রাজিলে গ্যারিঞ্চাকে বলা হয় দ্বিতীয় পেলে। কারণ পেলের পরই তার অবস্থান। গ্যারিঞ্চা জাতীয় দলের হয়ে ৫০টা ম্যাচ খেলেছেন, গোল করেছেন ১২টা। পেলের সাথে গ্যারিঞ্চার জুটি মানেই ফুটবল মাঠে শিল্প সৌন্দর্যের সুঘ্রাণ। গ্যারিঞ্চা-পেলে জুটি মাঠে নামলে ফুটবলের অন্যরকম স্বাদ পেতেন দর্শকরা। তার খেলা দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়তেন। ক্লাব ফুটবলেও গ্যারিঞ্চাকে দেখতে গ্যালারিতে জায়গা দেয়া সম্ভব হতো না। বোটাফেগো, ক্যারিন্থিয়ান্স, অ্যাটলেটিকো জুনিয়র, ফ্ল্যামিঙ্গোর হয়ে যখন মাঠে নামতেন তাতেই মাঠ কেঁপে উঠতো। গ্যারিঞ্চা ব্রাজিলের মাঠে খেলতেন আর সেই খবর পৌঁছে যেতো হাজার হাজার মাইল দূরে বাংলাদেশে। গ্যারিঞ্চার কারণে ফ্ল্যামিঙ্গো ক্লাবের নামটি বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায় কতোবার ছাপা হয়েছে, তা বলা কঠিন। অনেক ব্রাজিলীয়ান মনে করেন পেলের চেয়ে বড় ফুটবলার ছিলেন গ্যারিঞ্চা। বাংলাদেশে এখনও অনেকে যেমনটা বলেন কাজী সালাহউদ্দিনের চেয়ে এনায়েত আরো ভালোমানের খেলোয়াড় ছিলেন। তেমনি পেলে গ্যারিঞ্চাকে নিয়ে ব্রাজিলের প্রবীণ ফুটবল দর্শকদের অবস্থানটা দু’রকম। তবে কিংবদন্তী গ্যারিঞ্চা নিজেই নিজের অবস্থানটা ধরে রাখতে পারেননি। একসময় শিক্ষকতা করতেন ব্রাজিলীয়ান এডসন। তিনি গ্যারিঞ্চার সমর্থক। এই এডসন বলেন, ‘মদ্যপান আর নারী প্রীতি গ্যারিঞ্চাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে গিয়েছে। জাতীয় দল থেকে কয়বার বাদ পড়লো ছেলেটি। শুধুমাত্র এসব কারণে। আমি তার খেলা দেখার জন্য মাঠে যেতাম। খেলা দেখলে চোখে লেগে থাকতো।’ পর্তুগীজ ভাষায় বললেন- এঁও নাও ভৌ তেঁ এসকোসে (আমি তাকে এখনো ভুলতে পারি না)। রিও ডি জেনেরিওতে জন্ম নেয়া এই ফুটবলার ১৯৮৩ সালে ৪৯ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। ফুটবল কিংবদন্তী গ্যারিঞ্চার প্রতি সম্মান দেখিয়ে ব্রাসিলিয়ার স্টেডিয়ামটি তার নামে রাখা হয়েছে। গ্যারিঞ্চা নেই। আছে তার প্রতি শ্রদ্ধা, যেসব সাংবাদিক বিশ্বকাপ ফুটবল কাভার করতে ব্রাজিলের ব্রাসিলিয়ায় এসেছেন, তারা নতুন করে নির্মিত স্টেডিয়ামটি ঘুরে দেখছেন। গ্যারিঞ্চার কথা স্মরণ করেছেন। জানার চেষ্টা করছেন গ্যারিঞ্চা সম্পর্কে আরো নতুন কিছু। কেউ স্মৃতি ধরে রাখতে ছবিও তুলছেন ৪৫ হাজার দর্শকের স্টেডিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে। ভারতীয় সাংবাদিকদের দেখা গেলো নেইমারদের বহনকারী বাস সামনে রেখে স্টেডিয়ামের ছবি তুলছেন। গ্যারিঞ্চার নামফলক সোনার হরফে লিখে রাখতে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে এই স্টেডিয়ামের উদ্বোধন করা হয়েছিল। বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচ এখন এই ভেন্যুতে হচ্ছে। ১৯৭৪ সালে নির্মিত গ্যারিঞ্চার নামের স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ৮টি ম্যাচ হবে।