নেইমার...নেইমার
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০১৪, ১৯:৩০
গোল করছেন, কখনও বল বানিয়ে দিচ্ছে আরেকজনকে, রক্ষণভাগে নেমে বল কেড়ে নিচ্ছেন প্রতিপক্ষের ফরোয়ার্ডদের কাছ থেকে। মাঠের প্রায় প্রতিটি জায়গায় তাকে দেখা যায়। আর বলাইবাহুল্য, প্রায় প্রতিটি কাজেই তিনি বেশ সফল। অথচ, নেইমার দ্য সিলভা স্যান্তোস জুনিয়রের বয়স মাত্র ২২!
ক্ষুদে সেই তারকাই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় তারকা, কোচ কিংবা সতীর্থরাও মানছেন, হেক্সা মিশনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়ার মতই ক্ষমতা আছে নেইমারের। হেক্সা মিশন আদৌ সফল হবে কি না সেটা সময়ই বলে দেবে, কিন্তু ম্যাচের পর ম্যাচ যেভাবে আগ্রাসী হতে চলেছেন তাতে যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মত কেউ অবশিষ্ট নেই বরং নেইমারেই নতজানু হচ্ছে ফুটবল বিশ্ব। নতুন এক গ্রেটের আবির্ভাব হয়তো এভাবেই হয়!
ক্যামেরুনের বিপক্ষে ম্যাচে জয় চাওয়াটা ব্রাজিলের জন্য স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু, মেক্সিকোর বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের পর আকাশসমান চাপ ভর করেছিল সেলেচাওদের উপর। কিন্তু চাপ ব্যাপারটা খুব সম্ভবত নেইমারের অভিধানে নেই। ১৭ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে লুইস গুস্তাভোর ক্রস থেকে অনায়াসে বল গড়িয়ে দিলেন জালে। উচ্ছ্বাস প্রকাশেও নেই কোন বাড়াবাড়ি। স্বপ্নটা যে আরও বড় — বিশ্বকাপ জয়!
নেইমারের করা গোলটি ছিল এবারের বিশ্বকাপের শততম গোল। আর কাকতালীয়ভাবে বিশ্বকাপে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদেরও শততম ম্যাচ ছিল। ঐতিহাসিক ম্যাচটিতে নেইমারের গোলে পেল বাড়তি মাত্রা। কিন্তু নেইমারের রং যে তখনও অনেক বাকি!
তিন মিনিট পর আরেকবার নেইমারের কল্যাণেই ব্যবধান দিগুণ করার উপক্রম করেছিল ব্রাজিল। কিন্তু দারুণ এক দূরপাল্লার ভলি অসামান্য দক্ষতায় আটকে দেন ক্যামেরুনের গোলরক্ষক শাল ইতানজে।
এরপরই প্রতিপক্ষের ওপর ভীষণ চাপ তৈরি করে ক্যামেরুন। ২৫তম মিনিটে জোয়েল মাতিপের কর্নার ক্রসবারে লেগে ফিরলে হতাশায় পুড়তে হয় আফ্রিকার দলটির। পরের মিনিটেই গোল করে সমতা ফেরান মাতিপ। বাঁদিক থেকে অ্যালান নাইয়োমের প্রথম ক্রসটি ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন ড্যানি আলভেজ। দ্বিতীয়টি আর পারেননি। গোললাইনের ঠিক সামনে দাঁড়ানো মাতিপের শুধু একটা টোকা দরকার ছিল। শালকে জিরো ফোরের মিডফিল্ডার সেটি দিতে ভুল করেননি তাহলে কি আফ্রিকান দেশটির কাছে স্বপ্নের মৃত্যু ঘটতে যাচ্ছে ব্রাজিলের। নেইমার তখন কি ভাবছিলেন জানা নেই তবে, নির্ঘাত তিনি নিজেকে আরো একবার শানিয়ে নিচ্ছিলেন, আরও আগুন নিয়ে জ্বলে ওঠার অপেক্ষায় ছিলেন।
আর হলও তাই! ম্যাচের তখন ৩৪ মিনিটের খেলা চলছে। মার্সেলোর কাছ থেকে ডি বক্সের ঠিক বাইরে বল পেয়েছিলেন নেইমার। একটু ড্রিবল, সামনে থাকা ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিয়ে বক্সে ঢুকে ডান পায়ে লক্ষ্যভেদ করেন। শট নেয়ার আগে তার আগে ডজে বিভ্রান্ত হয়েছিলেন গোলরক্ষক শাল ইনতাজে।
ব্রাসিলিয়ার মানে গারিঞ্চা ন্যাসিওনাল স্টেডিয়াম তখন উচ্ছ্বাসে ভাসছে। ধারাভাষ্যকাররা এক বাক্যে মেনে নিলেন নেইমারের শ্রেষ্ঠত্ব, ‘হি ইজ আ বয় অব পিওর ক্লাস!’ পরে আরও দু’বার গোলের দেখা পেয়েছে ব্রাজিল। ক্রমশ ফুঁসতে থাকা ক্যামেরুনকে বিষধর ছোবলে শেষ করে দিয়েছেন নেইমার।
ব্রাজিলও ‘এ’ গ্রুপ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়েই উঠে গেল দ্বিতীয় রাউন্ডে। নেইমারের জন্য অর্জনের খাতাটা আরো বেশ খানিকটা সমৃদ্ধ। স্যান্তোস থেকে গত মৌসুমে বার্সেলোনায় পাড়ি জমানো এই ফরোয়ার্ড ৫২ ম্যাচে নিজের গোল সংখ্যা নিয়ে গেলেন ৩৫-এ। অর্থাত্ প্রতি তিন ম্যাচে দুটি করে গোল আসে তার কাছ থেকে। যেকোন ফরোয়ার্ডের জীবনবৃত্তান্তকে সমৃদ্ধ করতে এই টুকরো তথ্যটিই যথেষ্ট।
এই বয়সেই ব্রাজিলের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন ষষ্ঠ অবস্থানে। ক্যামেরুনের বিপক্ষে গত সোমবারের ম্যাচ দিয়ে তিনি ছাড়িয়ে গেলেন রিভালদোকে। সামনে আছেন কেবল — পেলে, জিকো, রোনালদো, রোমারিও ও বেবেতো। এর মধ্যে কেবল এক জিকো বাদে বাকি সবারই বিশ্বকাপ জিতেছেন ব্রাজিলের হয়ে। যেভাবে এগোচ্ছেন তাতে নেইমারের পক্ষেও বিশ্বকাপ জয় করাটা খুবই সম্ভব।
নেইমারের তুলনা করা হচ্ছে কিংবদন্তী ফুটবলার পেলের সাথে। ৭৪ বছর বয়সী পেলের কাছেও নেইমার তাই অমূল্য এক রত্ন। বিশ্বকাপ শুরু হবার আগে থেকেই তিনি নেইমারের উপর চাপ কমানোর কথা বলছেন। কিন্তু ক্রয়েশিয়ার বিপক্ষে যে প্রতাপ নিয়ে তিনি দু’গোল করলেন তাতে মনে হয়নি চাপ তার জন্য বড় কোন বাধা হতে পারে। তৃতীয় ম্যাচেও আবারও সেই একই দৃশ্যের পুনর্মঞ্চায়ন। চার গোল করে চলমান বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোলটা এখন লেখা আছে নেইমারের নামের পাশেই। গোল্ডেন বুট জয়ের লড়াইয়ে তিনিই তাই আছেন সবচেয়ে এগিয়ে।
জাতীয় সংগীত গাইতে গিয়ে তিনি কেঁদে ফেলেন, তার পায়ে বল গেলে গর্জে ওঠে গোটা স্টেডিয়াম, প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ বাড়িয়ে দেয় সতর্কতা, সেই নেইমার কি ভাবছেন। ম্যাচ শেষে যে কথাগুলো বললেন তাতে চোখে পানি চলে আসার কথা যেকোন ব্রাজিল সমর্থকের চোখে, ‘আমি কখনোই চাপ অনুভব করি না। সব সময় বলেছি, যখন স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে নামবেন, তখন কোনো চাপ থাকতে পারে না। ছোটবেলা থেকে এ স্বপ্নটিই দেখছি। ম্যাচে যেভাবে খেলেছি, সারা জীবন এভাবেই খেলার স্বপ্ন দেখে আসছি।’ স্বপ্নটার ব্যাপারে তো আর নতুন করে বলে দেবার কিছু নেই!
ব্রাজিলের সর্বোচ্চ গোলদাতারা
খেলোয়াড় ম্যাচ গোল
পেলে ৯২ ৭৭
জিকো ৮৮ ৬৬
রোনালদো ৯৮ ৬২
রোমারিও ৭০ ৫৫
বেবেতো ৭৫ ৩৯
নেইমার ৫২ ৩৫