গ্রুপ শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে আর্জেন্টিনা-নাইজেরিয়া

আগেই নক-আউট পর্ব নিশ্চিত করে ফেলেছে আর্জেন্টিনা; নাইজেরিয়ার শেষ ষোলও প্রায় নিশ্চিত। তাই বলে সেটা দু’দলের মধ্যকার আজ বুধবারের লড়াইয়ের উত্তেজনা সামান্যতমও কমছে না। ব্রাজিলের পোর্তো আলেগ্রের বেইরা রিও স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠেয় এই লড়াইয়েও সবার নজর থাকছে লিওনেল মেসির দিকে। যে কি-না আগের দুই ম্যাচেই আর্জেন্টিনার জয়ের নায়ক ছিলেন। আফ্রিকান প্রতিনিধিদের বিপক্ষেও বার্সেলোনার এই স্ট্রাইকারেই ভরসা রাখতে হচ্ছে দু’বারের চ্যাম্পিয়নদের। যদিও নির্দিষ্ট কোন খেলোয়াড়ের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দলের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন আর্জেন্টিনার সাবেক মিডফিল্ডার আন্দ্রেস ডি আলেসান্দ্রো। ‘এফ’ গ্রুপের শিরোপা প্রত্যাশী আর্জেন্টিনা আগের দুই ম্যাচে বসনিয়া-হার্জেগোবিনা এবং ইরানের বিপক্ষে জয় পেয়ে পরবর্তী রাউন্ড নিশ্চিত করলেও আশানুরূপ পারফরম্যান্স দেখাতে পারেনি। দুটি লড়াইয়েই জয় পেতে রীতিমত বেগ পেতে হয়েছে তাদের। প্রথমটিতে বসনিয়া একটি আত্মঘাতী গোল না করলে ২-১ গোলের জয়ের পরিবর্তে ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়তে হতো আলেসান্দ্রো সাবেলার শীষ্যদের। পরের ম্যাচে এশিয়ার প্রতিনিধি ইরানের বিপক্ষে ১-০ গোলের কষ্টের জয় পেয়েছে তারা! অতিরিক্ত সময়ে মেসি ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ না হলে এবারও ড্র নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হতো সাদা ও আকাশী নীলদের। ইরানের বিপক্ষে দলের পারফরম্যান্সে নাখোশ হয়েছিলেন খোদ মেসিই, ‘অবশ্যই আমাদের ভুলগুলো সংশোধন করতে হবে। আমরা যে আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী খেলতে পারছি না এটা উপলব্ধি করতে পারছি।’ প্রথম দুই ম্যাচে চিরপরিচিত আক্রমণাত্মক আর্জেন্টিনাকে দেখতে না পেয়ে স্বভাবতই অখুশি আর্জেন্টিনা সমর্থকরা। তাছাড়া তাদের অতিরিক্ত মেসি নির্ভরতার বিষয়টিও স্পষ্ট। নিশ্চিতভাবেই বলা চলে, মেসি না থাকলে সাবেলার দলের গ্রুপ পর্ব পেরোনোই সমস্যা হয়ে দাঁড়াতো। এখন পর্যন্ত তারা যে তিনটি গোল পেয়েছে এর দুটিই এসেছে মেসির পা থেকে। আর্জেন্টিনার এই অতিরিক্ত মেসি নির্ভরতা তুলনামূলক বিচারে দুর্বল দলগুলোর বিরুদ্ধে কাজে আসলেও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করেন ডি আলেসান্দ্রো। মেসির উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা মেসির স্বাভাবিক খেলার উপরেও প্রভাব ফেলবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মেসি বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়। এই বিষয়টা এমনিতেই তাকে চাপে রাখে। সে জানে দেশের কাছে তার মূল্যটা কেমন। প্রথম ম্যাচে সে গোল পেয়েছে। আর দ্বিতীয় ম্যাচে তার গোলটাই পার্থক্য সৃষ্টিকারী। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হচ্ছে তার উপরে অতিরিক্ত নির্ভর না করা। কারণ, একটা দল যখন কোন খেলোয়াড়ের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হবে তখন শেষ ষোলয় সেটা তাদের জন্য ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।’ দলে বেশ কিছু জায়গায় উন্নতির সুযোগও দেখছেন ৩৩ বছর বয়সী এই ইন্টার মিলান খেলোয়াড়, ‘আমার বিশ্বাস আগের দুই ম্যাচের চেয়ে তৃতীয় ম্যাচে (আজ) আর্জেন্টিনা আরো ভাল খেলবে। আর উন্নতির সেই ধারাটা শেষ ষোলোতে অব্যাহত থাকবে। নক আউট পর্বটা হবে অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। কারণ সেখানে তাদের আরো কঠিন দলের মোকাবিলা করতে হবে।’ আক্রমণভাগের সাফল্যহীনতায় সমালোচনা হচ্ছে কোচ সাবেলার কৌশল নিয়েও। তবে নক-আউট পর্ব থেকে আর্জেন্টিনা নিজেদের খেলাটা খেলতে চায়। মিডফিল্ডার অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া অন্তত এমন আভাসই দিলেন, ‘শেষ ষোলতে আমরা প্রতিপক্ষদের বিপক্ষে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলবো, যেটা আমাদের কাছে মানানসই। এটা সবাই জানে যে, আর্জেন্টিনা যখন আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে তখন অনেক ভাল করে।’ গ্রুপ পর্বে প্রথম দুই লড়াইয়ে প্রতিপক্ষের অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক কৌশলের কারণেই আর্জেন্টিনা ভাল করতে পারিনি বলে জানান ডি মারিয়া, ‘প্রতিপক্ষরা যখন রক্ষণভাগেই বসে থাকে এবং অতিরিক্ত ডিফেন্ডার নিয়ে খেলে তখন ভাল করাটা খুবই কঠিন।’ এদিকে, ইরানের বিপক্ষে অপ্রত্যাশিত ড্র দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করলেও পরের ম্যাচেই বসনিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় নাইজেরিয়া। চার পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের দ্বিতীয় দল হিসেবে নক-আউট পর্বের একেবারে দ্বারপ্রান্তে তারা। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে না হারলেই হলো। বসনিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখানোয় রোমাঞ্চিত নাইজেরিয়ার কোচ স্টিফেন কেসি, ‘বসনিয়ার বিপক্ষে আমরা লড়াকু ফুটবল খেলেছি। শেষ ষোলতে খেলার ব্যাপারে আমরা আত্মবিশ্বাসী। আমরা শেষ ষোলতে খেলবো না, এটা আমার চিন্তার বাইরে। কেননা আমাদের দলে ভাল মানের খেলোয়াড় আছে।’ আর্জেন্টিনা শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হলেও নাইজেরিয়া ভয় পাচ্ছে না বলে জানালেন মিডফিল্ডার ওজেনি ওনাজি। প্রতিপক্ষ দলের তারকা স্ট্রাইকার মেসিকে নিয়েও ভাবছেন তিনি, ‘মেসি তো সাধারণ একজন মানুষের মতোই। অন্য দশজনের মতোই সেও একজন ফুটবলার। অবশ্যই আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আমাদের ভাল পরিকল্পনা আছে।’ দু’দলের লড়াইয়ে অতীতই এগিয়ে রাখছে আর্জেন্টিনাকে। এর আগে বিশ্বকাপে দল দুটি তিনবার মুখোমুখি হয়েছে। তিনবারই জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত দল দুটি ছয়টি ম্যাচ খেলেছে। এর মধ্যে সুপার ঈগলদের জয় একটিতে, আর্জেন্টিনার পাঁচটিতে! ্ড্র হয়েছে একটি ম্যাচ। আজকের ম্যাচে নাইজেরিয়ার জন্য বিপদের কারণ হয়ে আবির্ভূত হতে পারেন স্ট্রাইকার মেসি। কেননা দারুণ ফর্মে আছেন তিনি। জাতীয় দলের সর্বশেষ সাত ম্যাচে আটটি গোল করেছেন এই বার্সা তারকা! তবে মেসিকে আটকে দেয়ার মতো শক্তিশালী রক্ষণভাগও রয়েছে নাইজেরিয়ার। সর্বশেষ ২২১ মিনিটের খেলায় কোনো গোল হজম করিনি তারা।