নিজামীর রায় হয়নি আবার অপেক্ষমাণ

জামায়াতে ইসলামীর আমীর মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় গতকাল মঙ্গলবার ঘোষিত হয়নি। রায়ের জন্য এই দিন ধার্য থাকলেও অসুস্থতার কারণে নিজামীকে আদালতে হাজির করতে না পারায় রায় ঘোষণা করেনি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। মামলাটি আবার রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছে ট্রাইব্যুনাল। এর আগে রায় ঘোষণা তিন মাস অপেক্ষমাণ ছিলো। গতকাল কারা কর্তৃপক্ষ ট্রাইব্যুনালে একটি প্রতিবেদন দাখিল করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, নিজামী হঠাত্ ‘অসুস্থ’ হয়ে পড়েছেন। তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা সম্ভব নয়। এ পর্যায়ে রায় ঘোষণার সময় আদালতে আসামির উপস্থিতি থাকা আবশ্যক কিনা সেই বিষয়ে শুনানি গ্রহণ করে ট্রাইব্যুনাল। রাষ্ট্র ও আসামি পক্ষের শুনানি শেষে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল তৃতীয়বারের মতো রায় অপেক্ষমাণ রাখে। ট্রাইব্যুনালের আদেশে বলা হয়, মতিউর রহমান নিজামীর শারীরিক অসুস্থতার বিষয়ে জেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আমরা একটি প্রতিবেদন পেয়েছি। ঐ প্রতিবেদন অনুসারে নিজামী অসুস্থ। প্রতিবেদনটি রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দেখেছেন এবং শুনানি করেছেন। শুনানি শেষে আইন পর্যালোচনা করে আসামির অনুপস্থিতিতে রায় দেয়াটা আমরা যুক্তিসঙ্গত মনে করছি না। তবে যত দ্রুত সম্ভব জেল কর্তৃপক্ষকে নিজামীর শারীরিক অবস্থার উপর একটি প্রতিবেদন দেয়ার জন্য বলছি। এ অবস্থায় রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখা হচ্ছে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, লুট, ধর্ষণ, উস্কানি ও সহায়তা, পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার মতো ১৬টি অভিযোগে নিজামীর বিরুদ্ধে বিচার কাজ শেষ হয়েছে। গতকাল রায় ঘোষণার দিন ধার্য থাকায় রাজধানীসহ সারা দেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। সারা দেশে গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়। রায় ঘোষণার সকল প্রস্তুতি ঠিকঠাক থাকলেও সকাল ১০টার দিকে ট্রাইব্যুনালে কারা কর্তৃপক্ষের চিঠি আসার পর রায় নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। পরে বেলা ১১টার দিকে এজলাসে ওঠেন ট্রাইব্যুনাল-১ এর তিন বিচারপতি। এরপর শুনানি শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মোহাম্মদ আলী বলেন, আসামির অনুপস্থিতিতে রায় ঘোষণার বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার। ট্রাইব্যুনাল তার অন্তর্নিহিত ক্ষমতাবলে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতে পারে। অন্যদিকে, মতিউর রহমান নিজামীর পক্ষে শুনানি করেন এডভোকেট মিজানুল ইসলাম। তিনি বলেন, নিজামী এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে একদিনও অনুপস্থিত থাকেননি। সুতরাং তার অনুপস্থিতিতে রায় হওয়ার কোন সুযোগ নেই। চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুও বলেন, আসামির উপস্থিতিতে রায় ঘোষণা একটি রীতি বলা চলে। সংক্ষিপ্ত শুনানি শেষে মামলাটির রায় অপেক্ষমাণ রাখার সিদ্ধান্ত জানায় ট্রাইব্যুনাল। এর মাধ্যমে দুই ট্রাইব্যুনালে আবারো চারটি মামলার রায় অপেক্ষমাণ থাকলো। নিজামীকে চিকিত্সকের পরামর্শে কারাগারে মেডিক্যাল সুবিধায় পূর্ণ বিশ্রামে রাখা হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সুপার ফরমান আলী। তিনি জানান, সোমবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে গুরুত্বর অসুস্থ হয়ে পড়েন নিজামী। তিনি মারাত্মক উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। এ অবস্থায় রাতেই নিজামীকে জেল কর্তৃপক্ষের নিজস্ব চিকিত্সক ডেকে পরীক্ষা ও চিকিত্সা দেয়া হয়। অবস্থার উন্নতি না হলে সকাল ৮টায় তাকে আরও একবার চিকিত্সক দেখেন এবং পূর্ণ বিশ্রামে রাখার পরামর্শ দেন। চিকিত্সকের পরামর্শেই মতিউর রহমান নিজামীকে ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়নি বলে জানান তিনি। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত নয়টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে তিনটি ও ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে ছয়টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। নিজামী বাদে দুই ট্রাইব্যুনালে তিনটি মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রয়েছে। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১ এ আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা মোবারক হোসেন ও ফরিদপুর বিএনপির নেতা পলাতক জাহিদ হোসেনের মামলার রায়। ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণার অপেক্ষায় আছে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলীর মামলা। এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানি শেষে রায়ের অপেক্ষায় আছে জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলা। এখন পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার।