চট্টগ্রাম বন্দরে কবে চালু হবে নিউমুরিং টার্মিনাল?

চট্টগ্রাম বন্দরের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) চালু আবার অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ২০০৭ সালে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এনসিটি’র কাজ শেষ হলেও মহলবিশেষের সুবিধা-অসুবিধা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এখনও তা পুনর্মাত্রায় চালু করা সম্ভব হয়নি। এনসিটি’র ৫টি বার্থের মধ্যে দু’টি বার্থ সাইফ পাওয়ার টেক নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিচালিত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অপর ৩টি বার্থেও বিভিন্ন সময় জাহাজ ভিড়লেও তার হ্যান্ডলিং বিল বন্দরের কোষাগারে জমা হয় না। অবশ্য বন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে তা অস্বীকার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি কোন পদ্ধতি এবং কারা পরিচালনা করবে তা নিয়ে বর্তমানে ব্যবসায়ী, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সংসদীয় কমিটির মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। এনসিটি দ্রুত চালুর জন্য বন্দর সংশ্লিষ্ট সকল ব্যবসায়ী সংগঠনের পর থেকে বার বার তাগাদা ও দাবি জানানোর পরও এ নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রথমদিক থেকেই চলে আসছে। ফলে এর পরিচালনার সিদ্ধান্তহীনতার গ্যাঁড়াকলে পড়ে এনসিটি পরিচালনা কখন হবে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। এনসিটি নির্মাণের পূর্ব থেকে এর পরিচালনা বেসরকারি পর্যায়ে ছেড়ে দেয়ার জন্য ব্যবসায়ীরা দাবি জানিয়ে আসছে। এমনকি সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের প্রতি সে সময় একাত্মতা প্রকাশ করা হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এনসিটি পরিচালনার ক্ষেত্রে দু’টি ভিন্নমত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ী ও বন্দরের একটি অংশ মনে করে বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব তহবিল থেকে এনসিটি পরিচালনার জন্য ইকুইপমেন্ট ক্রয় করা হউক। পরবর্তীতে বন্দরের ইকুইপমেন্ট ব্যবহারের মাধ্যমে এনসিটি পরিচালনার জন্য বেসরকারি অপারেটর নিয়োগ করা হউক। অপর পক্ষে বলা হচ্ছে বন্দরের বিশাল অংকের টাকা ব্যয়ে ইকুইপমেন্ট ক্রয় না করে যে বেসরকারি অপারেটর নিয়োগ করা হবে তাকেই নিজ অর্থে ইকুইপমেন্ট ক্রয় করার জন্য বলা হউক। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কয়েক বছর পূর্বে ইকুইপমেন্টসহ অপারেটর নিয়োগের জন্য টেন্ডার আহবান করলে ৪টি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে যোগ্য বিবেচনা করে তালিকাভুক্ত করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে টেন্ডারের শিথিল করে দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করলে উচ্চ আদালতে মামলা হওয়ায় তা আটকে যায়। এরপর চবক ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ করে নিজস্ব লোকবল দিয়ে এনসিটি পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু এক্ষেত্রে বিপুল লোকবলসহ অর্থের বিবেচনায় তা লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা না দেখে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় তাও বাতিল করে দেয়। এরপর আবার সিদ্ধান্ত হয়, চবক ইকুইপমেন্ট ক্রয় করবে এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অপারেটর হিসেবে কাজ করবে। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এ সিদ্ধান্ত হলেও অজ্ঞাত কারণে তা বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। বর্তমান সরকার আবার ক্ষমতায় আসার পর নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির প্রথম বৈঠকে চবকের বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠে। একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে অন্য একটি সংস্থা কর্তৃক প্রায় অনুরূপ ৫ কোটি টাকার ইকুইপমেন্ট চবক কর্তৃক ২০ কোটি টাকায় ক্রয়ের বিষয়টি তদন্তের জন্য সংসদীয় তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। সংসদীয় কমিটির একাধিক সদস্য প্রকাশ্যে চবকের কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতির ব্যাপারে অভিযোগ করেছেন। তাছাড়া বন্দরের কন্টেইনার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিটিএমএস) প্রকল্পের কাজ ঘোষণা করেও টাকা প্রদানে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি ইতিমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে। তাছাড়া আরো বেশ কয়েকটি প্রকল্পের অর্থ ব্যয় নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। বিশাল অংকের অর্থ ব্যয়ে কয়েকটি জাহাজ ও ইকুইপমেন্ট ক্রয় করা হলেও এগুলো কর্মহীন হয়ে পড়ে আছে। নৌ-পরিবহন সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি বন্দরের কেনাকাটার অভিযোগের প্রেক্ষিতে আবার বিশাল অংকের অর্থ ব্যয়ে এনসিটি’র ইকুইপমেন্ট কেনার বিরোধিতা করে। সংসদীয় কমিটির মতে যেহেতু বেসরকারি অপারেটর নিয়োগ করা হবে তাই তারাই যেন ইকুইপমেন্ট নিয়ে আসে। কিন্তু চবক তার অবস্থানে অনড় থাকে এবং পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত মাসে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৩৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬টি গ্যান্ট্রি ক্রেন ক্রয়ের টেন্ডার আহবান করে। পর্যায়ক্রমে আরো সরঞ্জামাদিসহ তা প্রায় ১২শ’ কোটি টাকায় দাঁড়াবে বলে জানা যায়। টেন্ডার আহবানের কিছুদিনের মধ্যেই অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিশাল অংকের অর্থ ব্যয়ে ইকুইপমেন্ট ক্রয় বন্ধ রাখার জন্য পত্র দেন। এর প্রেক্ষিতে চবক ওই টেন্ডার স্থগিত রাখে। আবার চবকের এনসিটির পরিচালনার ব্যাপারে সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীও এক পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি চবকের ইকুইপমেন্ট ক্রয় করার পক্ষে মতামত দিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। এনসিটি পরিচালনা নিয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, সংসদীয় কমিটি, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের এই বিভিন্ন মুখী অবস্থানের কারণে কবে নাগাদ এটি চালু হবে তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।