বাস্তবায়ন দক্ষতার মাপে বড় চাহিদার তুলনায় ছোট
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০১৪, ২২:১৭
বাস্তবায়ন সক্ষমতার বিচেনায় বড় হলেও প্রস্তাবিত বাজেট উন্নয়ন চাহিদার তুলনায় ছোট। গতকাল বুধবার ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট সম্পর্কে বিশ্বব্যাংক তরফে এই মন্তব্য করে বলা হয়েছে, এ বাজেট সম্ভাবনাময়। কিছু উন্নয়ন কর্মসূচি রয়েছে, যা বাস্তবায়নযোগ্য। দারিদ্র্যবিমোচন ও প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধির জন্য যে বাধা রয়েছে তা অপসারণের সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা রয়েছে। তবে বাজেট বাস্তবায়নের জন্য কী পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে সেটি স্পষ্ট নয়।
গতকাল বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে বাজেট বিষয়ে মূল আলোচনা করেন ঢাকা অফিসের লিড অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। সূচনা বক্তব্যে কান্ট্রি ডিরেক্টর ইয়োহানেস জাট প্রস্তাবিত বাজেটের পাঁচটি বিষয় উল্লেখ করে একে স্বাগত জানান। তিনি যে বিষয়গুলোর উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে -কর বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ, পাঁচটি অর্থনৈতিক জোন স্থাপন, দক্ষতা উন্নয়ন, ভূমি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে নেয়া উদ্যোগ এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার পদক্ষেপ।
প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে ড. জাহিদ বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে- তা চ্যালেঞ্জিং। তবে প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে অর্জন অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশ যে অবস্থায় আছে তাতে যদি আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশও হয়, সেটা উল্লেখযোগ্য অর্জন হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণের আগে চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের বড় অংশ জুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। রফতানি. রেমিটেন্সেও দুর্বলতা ছিল। গত জানুয়ারি মাসে নির্বাচনের পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। প্রবৃদ্ধির তথ্য নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশ হোক বা তার নিচে হোক, তা সন্তোষজনক। তবে প্রবৃদ্ধি এখনও ঝুকিপূর্ণ। কেননা রফতানির গতি কমে এসেছে। ব্যক্তিখাতে ঋণ প্রবাহের কিছুটা উন্নতি হলেও এটি এখনও দুর্বল। এ দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা যায়নি। ফলে আত্মতুষ্টির কারণ নেই। অন্যদিকে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধিতে যে কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে তা বাস্তবায়নযোগ্য। তবে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা চ্যালেঞ্জিং।
তিনি আরো বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট সম্ভাবনাময়। অর্থমন্ত্রী বাজেট উপস্থাপনের পর গত তিন সপ্তাহে এর আকার নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। অনেকেই বলেছেন বিশাল বাজেট। কেউ বলেছেন, উচ্চাভিলাষী এই বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বিশাল বাজেট নিয়ে আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশে গ্যাস-বিদ্যুতসহ অবকাঠামো খাতে প্রচুর বিনিয়োগের প্রয়োজন। সে বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় প্রস্তাবিত বাজেট বিশাল নয়। তবে বাস্তবায়নের সক্ষমতার দিক বিবেচনা করে যারা এটিকে বিশাল বাজেট বলে সমালোচনা করছেন তারাও সঠিক। বাংলাদেশের যে সক্ষমতা রয়েছে তাতে ২০২১ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, বিদ্যুত্ খাতের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। তবে এ উন্নতি স্বল্পমেয়াদী। সঞ্চালন লাইনেরও উন্নতি করতে হবে। ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশিদারিত্ব (পিপিপি) উদ্যোগের তেমন সাড়া নেই। এর জন্য পিপিপি অফিসের অদক্ষ জনবল এবং আইনী কাঠামোর দুর্বলতাকে দায়ী করেন তিনি।
তিনি উল্লেখ করেন, বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পিপিপিকে গতিশীল করার পাশপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কার, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য জমি সমস্যার সমাধান এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ খুবই জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশের পরেও বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙ্গে না দেয়ার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুধু বোর্ড পুনর্গঠন করে বেসিক ব্যাংকের পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব নয়। তিনি বিষ্ময় প্রকাশ করে বলেন, সোনালী ব্যাংকের একটি শাখা থেকে একজন ব্যক্তিকে এত টাকা ঋণ দেয়া হলো আর পরিচালনা পরিষদ কিছুই জানলো না! ঋণ খেলাপি হয়ে পার পাওয়া যায়, এমন ধারণা না ভাঙ্গলে এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য সঠিক সংকেত বহন করবে না। সরকারি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি মেটাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু সমস্যার উত্তোরণে কোন সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সুশাসনের সমস্যা কাটানোর তাগিদ দেন তিনি।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এটা ঠিক যে কালো টাকার মালিকরা অনেক শক্তিশালী। বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী এ সুযোগ রহিত করার কথা বলেছেন। কিন্তু এর জন্য অর্থ বিলে যে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন যে উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তাছাড়া সব সরকারের সময়কালে এ বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
সামাজিক নিরাপত্তাবলয় নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে স্কুলে ভর্তির হার বেড়েছে কিন্তু এখনও ৫০ লাখ শিশু প্রাথমিক শিক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় ৬০ শতাংশ উপকারভোগী প্রকৃত দরিদ্র্য নয়। এরকম বিষয়গুলোর প্রতি আরো গুরুত্ব দেয়ার তাগিদ দেন তিনি।