ভিনগ্রহের ফুটবলার
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০১৪, ১৯:৩০
চার বছর পর ম্যারাডোনা জাতীয় দলের কোন খেলা দেখতে উপস্থিত ছিলেন মাঠে। গত বিশ্বকাপেও যে দলটার কৌশল ঠিক করে দিতেন যিনি তিনি ছিলেন গ্যালারিতে। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চললো। কিন্তু গোলের দেখা তো মিলে না। ইনজুরি সময়ের কথা। ম্যারাডোনা গ্যালারি ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটলো ঘটনাটা। ম্যারাডোনার প্রস্থানের সময় জ্বলে উঠলেন মেসি। ম্যাচের তখন ৯১ মিনিট। ইরানের ধুন্ধুমার রক্ষণভাগের তালা খুললো এতো সময় পর এসে।
পর পর দুই ম্যাচে গোল, দুটি গোলই অসাধারণ নান্দনিক। দুটি গোলেই জয়, ছয় পয়েন্ট। আর তাতে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে শেষ ম্যাচটি হয়ে গেল অর্থহীন। তাতে কি থেমে গেল মেসির দাপট? বিশ্বকাঁপানো তারকা কি নির্ভার হয়ে গেলেন?
মোটেই না! নির্ভার থেকেই তিনি হয়ে গেলের আরও ভয়ঙ্কর। আরেকবার হয়ে উঠলেন আর্জেন্টিনার নির্ভরতার প্রতীক। এবার করলেন দুটি গোল। তাতে তিনি যৌথভাবে চলে আসলেন এবারের বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকার শীর্ষে। সমান চারটি গোল নিয়ে তার পাশেই আছেন নেইমার। বিপক্ষ শিবিরেও তাই মেসি মেসি রব। নাইজেরিয়ান কোচ স্টিফেন কেশি বহুলচর্চিত কথাগুলোই বললেন আবার, ‘মেসি দুর্দান্ত একজন খেলোয়াড়। আর্জেন্টিনা দলে ভালো মানের অনেক খেলোয়াড় রয়েছে। তবে ও এই গ্রহের কেউ নয়, ও এসেছে বৃহস্পতি থেকে। ও বাকি সবার থেকে আলাদা। বাকি সবার চেয়ে ও ভালো। ওর কাছ থেকে কোন কিছু ছিনিয়ে নেয়া প্রায় অসম্ভব।’
গত বুধবার পোর্তো আলেগ্রের স্ট্যাডিও বেইরা রিওতে তৃতীয় মিনিটেই এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। মাসচেরানোর পাস থেকে ডি বক্সে ঢুকে জোরালো শট নিয়েছিলেন অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া। গোলরক্ষক ভিনসেন্ট এনেইমা পরাস্ত হলেও বল জালে যায়নি, বারে লেগে ফিরে আসে। ফিরতি বলে সুযোগ পান মেসি। দু’জন ডিফেন্ডার এগিয়ে এসেছিলে কিন্তু রুখতে পারেননি মেসিকে। জোরালো শটে লক্ষ্যভেদ করে দলকে এগিয়ে নেন তিনি। গোল শোধ করতে বেশি সময় নেয়নি আফ্রিকার চ্যাম্পিয়নরা। পরের মিনিটে বাঁদিক থেকে কাটিয়ে ডি বক্সে ঢুকে ডান পায়ের কোণাকুণি শটে সার্জিও রোমেরোকে পরাস্ত করেন মুসা। প্রথমার্ধের ইনজুরি সময়ে মেসিকে ফাউল করায় ফ্রি-কিক দেন রেফারি। রক্ষণ দেয়ালের ওপর দিয়ে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে দলকে দ্বিতীয়বারের মতো এগিয়ে নেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।
মেসির শটে পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়েছিলেন এনেইমা। ‘দেয়াল’-এর ওপর দিয়ে আসা বলটি দেখেন অনেক পরে। ততক্ষণে বল খুঁজে নেয় নাইজেরিয়ার জাল। মেসির টানা দ্বিতীয় গোল। মেসির নাচ, আর নাইজেরিয়ার হতাশা — সবমিলিয়ে গোটা ম্যাচের প্রতীক হয়ে উঠলো ছোট্ট এই দৃশ্যটা। অথচ এবারের বিশ্বকাপে আসার আগে টানা আট বছর বিশ্বকাপে গোল পাননি মেসি। ২০০৬ সালে জার্মানিতে সর্বশেষ পেয়েছিলেন বিশ্বকাপের গোল। এই আট বছরে মেসি হয়ে উঠেছেন আরও পরিপক্ব, আরও ভয়ঙ্কর। বার্সেলোনার হয়ে ২৭৭ ম্যাচে ২৪৩ গোল, চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ৮৬ ম্যাচে ৬৭টি, ছয়টি লা লিগার শিরোপা, তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, চারটি ব্যালন ডি’অরের সেরার মুকুট — এতো সব অর্জন তার পায়ের তলায় এসে লুটিয়ে পড়েছে। কিন্তু সর্বকালের সেরা হতে তো বিশ্বকাপ জিততে হবে। অনন্য কীর্তিগুলো তাই ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছিল বিশ্বকাপে গোল না পাওয়ার কারণে। তাই মেসি হয়ে উঠতে পারেননি ম্যারাডোনা, পেলে, রোনালদো কিংবা জিদান। হয়ে উঠতে পারেননি কিংবদন্তী।
মেসি কে? নিজেকে চেনাতে কি বিশ্বকাপ জয় করাটা খুবই জরুরি? গত ২৪ জুন ছিল মেসির ২৭তম জন্মদিন। ব্রাজিলের নেইমার ক্লাব সতীর্থ মেসিকে শুভেচ্ছা বার্তায় লিখেছেন, ‘শুভ জন্মদিন লিও। তুমিই আমার আদর্শ!’ রোনালদো - দ্য ফেনোমেনোনের ছেলে বাবাকে বলে, ‘তুমি হয়তো বিশ্বকাপ জিততে পারো, অনেক ভাল স্ট্রাইকার হতে পারে, ব্যালন ডি’অর জিততে পারো, কিন্তু তুমি বিশ্বসেরা নও, তুমি মেসি নও। মেসি আর সবার থেকে আলাদা।’
মেসিকে নিয়ে সবচেয়ে মোক্ষম কথাটি বললেন সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক গ্যারি লিনেকার। বর্তমানে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসিতে কর্মরত এই কিংবদন্তী মাঠ থেকেই দেখেছেন মেসির জাদু। তার ভাষায়, ‘১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার পর আমি আর কাউকে মাঠে এতো ভাল খেলতে দেখিনি।’ ম্যারাডোনা সেবার জিতেছিলেন বিশ্বকাপ। এরপর থেকেই আর্জেন্টিনার জন্য শুরু হয় ২৮ বছরের খরা। এবার কি তাহলে খরা কাটাবেন মেসি? সেটা হয়ে গেলে তো সর্বকালের সেরা হওয়ার পথে আর কোন বাধাই থাকবে না তার!