তারাবী নামাজের উদ্দেশ্য, তাত্পর্য ও ফজিলত

রমযান মাসেই সালাতুল তারাবী নামায আদায় করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী ২০ (বিশ) রাকাত নামাযের মাধ্যমে প্রথম সাতদিনে দেড় পারা এবং পরবর্তী বিশ দিনে একপারা করে সাতাশ দিনে পুরো ৩০ (ত্রিশ) পারা কোরআন শরীফ পাঠ করা হয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য, তাত্পর্য ও ফজিলত সম্পর্কে আল্ল¬াহতায়ালার ঘোষনা হচ্ছে ” রমযান মাস হচ্ছে সে মাস যে মাসে নাযিল হয়েছে কোরআন। যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্য পথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্য বিধানকারী” সূরা বাক্কারা, আয়াত ১৮৫। উল্লে¬খিত আয়াতদ্বারা সুষ্পষ্টভাবে প্রমানিত হয় যে, ৩০ পারা কুরআনে মানবজাতির কল্যান নিহিত। কোরআনে সমগ্র মানবজাতির জীবন ব্যবস্থা কি হওয়া উচিত তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ননা করা হয়েছে। বর্ণনা করা হয়েছে কি কি গ্রহণীয়, কি কি বর্জনীয়। কি ন্যায় কি অন্যায়। কোন কোন কাজ করা হারাম এবং মানুষের জন্য কি কি হালাল। কোন কোন কাজের জন্য সে কি কি শাস্তি ভোগ করবে এবং আমল ভাল হলে সে কি কি পুরষ্কার পাবে। এ ছাড়া সকল কাজের হিসাব তিনি মহা বিচারক হিসেবে আখেরাতের দিবসে গ্রহণ করবেন। কাজেই সমগ্র বিষয়াবলীই যেন মানুষ জ্ঞাত হয়ে ভাল মন্দের পার্থক্য অনুধাবন করে জীবন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে সেজন্যই ৩০ পারা কোরআন পাঠের মাধ্যমে সালাতুল তারাবী নামায আদায় হয়ে থাকে। কাজেই মানুষ জাতিকে সচেতন করাই্ হচ্ছে তারাবী নামাযের প্রকৃত উদ্দেশ্য। এক রমযানের পর আরেক রমযানে এসে আবারও মানুষকে সচেতন করা হয়ে থাকে। সে কি কি ভুলে গিয়েছিল ঐগুলো যাতে সংশোধন করতে পারে। পরীক্ষার সময় প্রতিটি ছাত্র যেমন তার প্রশ্নের উত্তরগুলো রিভিশন দেয় তেমনি করে তারাবীর মাধ্যমে মানুষের মনে প্রতি বছর জাগ্রত করে দেয়া হয় আল্ল¬াহর বিধানাবলী। এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের কি করা উচিত আর আমরা কি করছি। আমাদের সকলেরই জানা যে, প্রতিদিন তিন ওয়াক্তের ফরজ নামাযে কোরআনের আয়াত (নামাযী এককভাবে হোক অথবা জামাতে ইমাম সাহেব) উচ্চস্বরে পাঠ করে থাকেন। যা সুষ্পষ্ট এবং আরবী আয়াতগুলোর প্রতিটি বাক্য সকলেই বুঝতে পারেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের কোন সুন্নত নামায, জামাতে এবং তার আয়াতগুলো উচ্চস্বরে পাঠ করা হয়না। অথচ তারাবীর এই সুন্নত নামায জামাতে এবং প্রতি রাকাতের আয়াতগুলো উচ্চ স্বরে পাঠ করা হয়ে থাকে। পার্থক্য হচ্ছে আমাদের দেশে ফরজ নামাযের আয়াত সুষ্পষ্টভাবে শোনা যায় কিন্তু তারাবী নামাযের আয়াতগুলো যিনি পড়েন এবং পেছনে যদি আরেকজন হাফেজ বা অভিজ্ঞ কোরআন পাঠক থাকেন তিনি ব্যতীত আর কেহই বুঝতে পারেন না হাফেজ সাহেব কি পড়ছেন। ফরজ নামাযের আয়াত যেভাবে পাঠ করা হয় তারাবী নামাযের আয়াত সেভাবেই পাঠ করা উচিত নয় কি ? তাই যদি না হয় তাহলে আল¬াহর ঘর বেষ্টিত মসজিদুল হারাম এবং বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ (স.) এঁর রওজা বেষ্টিত মসজিদে নব্বীতে দু’ ঘন্টা সময় নিয়ে তারাবীর নামায আদায় হয় কেন? আমরা যারা রমযান মাসে ওখানে যাচ্ছি তারা সকলেই এ দীর্ঘ সময় ধরে ইমামের পেছনে নামায আদায় করেছি তা কারো অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রথম প্রথম যারা গিয়েছি তাদের সবার মধ্যেই ভীতি ও শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছিল এতো দীর্ঘ সময় ধরে নামায পড়তে পারবো কিনা? কিন্তু সালাতুল তারাবী যখন শুরু হলো তখন প্রথম রাকাতের আয়াত পাঠ শেষে ইমাম যখন রূকুতে যাচ্ছে তখন ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হলো যেন তাড়াতাড়ী রূকুতে গেলেন, আরও কিছু আয়াত পড়লো না কেন? এমনিভাবে ২০ রাকাত যখন শেষ হলো তখন মনে হয়নি যে ২ ঘন্টা ধরে নামায পড়েছি। এতে করে আমাদের কারো কোন কষ্ট বা পায়ে ব্যথা অনুভব হয়নি। দীর্ঘ সময় নামায পড়ায় কষ্ট না অনুভূত হওয়ার কারণ হচ্ছে ইমাম সাহেবদের সুরেলা কণ্ঠে উচ্চারিত কোরআনের প্রতিটি শব্দ/আয়াত যা ছিল পরিষ্কার এবং প্রতিটি মুসলমান নর নারীর বোঝার উপযোগী। তাঁদের কণ্ঠ যেমন আমাদের আকৃষ্ট করেছে তেমনি যেখানে যেখানে ভয়ের / আযাবের আয়াত পাঠ করেছে সেখানে তাদের কণ্ঠের ক্রন্দনভাব আমাদের আবেগে আপ্লুত করেছে। অনুরূপভাবে যেখানে ছিল রহমতের / আল্ল¬াহর পথে চলার আহ্বান সেখানে তাদের কণ্ঠের অনুরূপ ভঙ্গি আমাদের আন্দোলিত করেছে। আরবী ভাষাভাষীর মানুষ না হয়েও মনে হয়েছে যেন আমরা বুঝতে পারছি তিনি আল্ল¬াহর কি বানী পড়ছেন। তাঁদের কণ্ঠের মাধুর্যতা, উচ্চারনের তাল ও লয় যেন এক অপরূপ মহিমায় সমগ্র নামাযীকে আকৃষ্ট ও ধন্য করেছে। ঐ তেলাওয়াত যেমন ছিল হূদয়স্পর্শী তেমনি যখন তাদের কণ্ঠে আবেগপ্রবন আয়াত উচ্চারিত হয়েছিল তখন অন্তর হয়েছিল ভীত সন্ত্রস্ত্র, আবার কখন কখন হয়েছিল হেদায়েতের পথে চলার শক্তি পাবার প্রেরণা। সর্বোপরি অধিকাংশ আয়াতের অর্থ বুঝিনি সত্য তবে কোরআন তাঁদের কণ্ঠে শুনে কোরআন পড়েছি বলা যায়। আল্লাহর ঘর বেষ্টিত মসজিদুল হারাম এবং বিশ্ব নবীর রওজা বেষ্টিত মসজিদে নববীকে আমরা সকলেই মুসলিম বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে জানি এবং মানি। তাই যদি হয় তাহলে ঐ প্রাণকেন্দ্রদ্বয়ে যদি তারাবীর নামায দু’ ঘন্টা পনের মিনিট ব্যাপী পড়া হয় এবং তাদের ইমামের পড়া কুরআনের প্রতিটি আয়াত যখন নামাযরত প্রতিটি মুসলিম নর নারীর বোধগম্য হয় তাহলে আমাদের দেশের নামাযে এত অষ্পষ্টতা কেন এবং কেনই বা কোরআন পড়ায় এত তাড়াহুড়া। এ নামায যদি তাড়াহুড়ার নামায হতো তাহলে ওখানে কেন আমাদের দেশের মত পড়া হয়না। (সংক্ষেপিত) লেখক :পরিচালক, রাজউক