ঘটক আলীর ঘটকালি

আলীর পুরো নাম আলী আজগর তালুকদার। প্রাইমারি স্কুলজীবনের শেষদিনটি পর্যন্ত সবাই তাকে ডাকত ‘আলী আজগর’ নামে। কিন্তু হাইস্কুলে ঢুকতেই পৃথিবী ছোট হয়ে আসার মতো কিংবা পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট খেলা বিশ ওভার তথা টি-টুয়েন্টিতে নেমে আসার মতো তার ‘আলী আজগর’ নামটাও ছোট হয়ে ‘আলী’তে পরিণত হয়। নামের এই পরিণতির পেছনে অজ্ঞাত বা অলৌকিক কারণ বিদ্যমান—এমনটা বললে ডাহা চাপাবাজি করা হবে। সামান্য একটা নামের সংক্ষেপণ, এখানে আবার অলৌকিকতা! শখ কত! অলৌকিকতা গাবগাছে ধরে নাকি!

আলী আজগর নামটা আলীতে রূপান্তরিত হওয়ার কারণটা লৌকিক এবং বেদনাবিধুর। আর বেদনাবিধুরতার গভীরতা বুঝতে বা বোঝাতে চাইলে ঘটনাটা বলা ছাড়া গত্যন্তর নেই। আলী আজগর তখন ক্লাস সিক্স থেকে সেভেনে উঠি উঠি করছে। হঠাত্ করেই তখন ভূতের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল স্কুলজুড়ে। বিভিন্ন ক্লাসের একাধিক ছাত্র সাক্ষ্য দিলো তারা স্বচক্ষে ভূত দেখেছে। কবিরাজ ডাকা হলো। কবিরাজ এসে সরেজমিনে তদন্ত করে জানাল, ভূত আছে। তবে এখন পর্যন্ত স্থায়ী আস্তানা গাড়েনি। আসে যায়, যায় আসে। ছাত্ররা যদি সতর্ক না হয়, তাহলে যেকোনো একটা রুমে ভূতরা তল্পিতল্পাসহ স্থায়ী আস্তানা গেড়ে বসতে পারে। হতে পারে সেটা হেডমাস্টারের খাস রুম।

কবিরাজের কথা শুনে ভয়ে হেডমাস্টারের শরীরে পানিস্বল্পতা দেখা দিলো। মুখ-জিহ্বা-গলা শুকিয়ে তো রীতিমতো কাঠ-সামগ্রী। সামান্য দূরে দাঁড়ানো ছিল আলী আজগর। হেডমাস্টার তাকে ডাক দিলেন—আজগর, এদিকে আসো। যাও, জগটা নিয়ে গিয়ে চাপকল থেকে ঠাণ্ডা পানি নিয়ে আসো। এখানে বলে রাখা ভালো, হেডমাস্টার আলী আজগরকে অন্য সবার মতো ‘আলী আজগর’ না ডেকে ‘কেবল আজগর’ ডাকতেন। তাঁর নিজের নাম আলী হোসেন ছিল তো! শিক্ষক-ছাত্রের একই নাম হলে ছাত্র ইজ্জতের দিক থেকে শিক্ষকের সমান সমান হয়ে যায় না? তাই হয়তো তিনি ‘আলী’টা উহ্য রাখতেন।

আলী আজগর হেডমাস্টারকে পানিভর্তি জগ দিয়ে চলে যাবে, এমন সময় তিনি তাকে আবার ডাকলেন—আজগর, দপ্তরি তো আজ ছুটিতে। এক কাজ করো, ঘণ্টায় দুইটা বাড়ি দিয়ে যাও। আলী আজগর শিক্ষকের আদেশ অনুযায়ী কাজ করে চলে গেলে কবিরাজ বলল—আপনের কপালে শনি আরো আছে মাস্টার সাব। হেডমাস্টার ঢক ঢক করে ঢাউশ সাইজের গ্লাসে এক গ্লাস সুশীতল পানি পেটে চালান করে দিয়ে চোখ দুটি ক্রিকেট বলের মতো গোলগোল করে বললেন—আরো শনি! এক ভূতের যন্ত্রণায়ই তো বাঁচি না। আবার কিসের শনি?

কবিরাজ বলল— এই যে আপনের ইশকুলে ভূত আসা-যাওয়া করতেছে, কেন করতেছে? জানেন কিছু? আলবত জানেন না। ভূতের আসা-যাওয়ার একটাই কারণ, আপনের ছাত্ররা সারাদিনই ভূত ভূত করে। যখন কেউ ভূতের নাম নেয়, ভূত মনে করে কী, জরুরি দরকারে তারে বুঝি ডাকা হইতাছে। ব্যস, সে ছুইটা আসে। তো আপনের ছাত্ররা বেবুঝ, তারা না হয় একটা ভুল কইরা ফেলছে। আপনে বুঝদার মানুষ হইয়া একই ভুল ক্যামনে করেন? এখনো সময় আছে। এখনই যদি সাবধান না হন, তাইলে এই যে কইলাম আরো শনি আছে, কথা কিন্তু সত্য।

হেডমাস্টার কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থেকে বললেন—আমার ছাত্ররা ভুল করে ভূতের নাম মুখে নিয়েছে, তাই ঝামেলা যা হওয়ার হয়েছে। কিন্তু আমি তো একবারও ভূতের নাম মুখে নিইনি। তাহলে আমার কপালে শনি থাকবে কেন? কবিরাজ বলল—খালি কি ভূতই শনি? সাপ কি শনি না? আপনে ভূতের নাম মুখে না নিলেও সাপের নাম মুখে নিছেন। সাপের নাম ধইরা ডাকছেন। সুতরাং আপনের ইশকুলে ভূত যেমন আসা-যাওয়া শুরু করছে, সাপও তেমন আসা-যাওয়া শুরু করবো। বুঝবেন ঠেলা কারে কয়।

কবিরাজের কথায় হেডমাস্টারের আকাশ থেকে পড়ার দশা—আমি সাপের নাম ধরে ডাকলাম কখন? কবিরাজ তার বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুলের নখ দিয়ে পানখাওয়া দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে বলল—এই যে একটু আগে আপনে ছেলেটার নাম ধইরা ডাকলেন। তার নামই তো একটা জাত সাপের নাম। অজগর। হেডমাস্টার মোটামুটি মাত্রার প্রতিবাদ জানালেন—ওর নাম অজগর নয়। আজগর। কবিরাজ যুক্তি দাঁড় করালো—সাপেরা কানে কম শোনে। বাংলা ভাষার উচ্চারণের ব্যাপারেও বেখেয়াল। আপনে যে ‘আজগর’ বইলা ডাক দিছেন, এইটা সাপেরা বুঝবো না। মনে করবো ‘অজগর’ বইলা ডাক দিছেন বুঝি। দেখবেন চ্যালচ্যালায়া চইলা আইছে। তখন ভূত সামলাইবেন না সাপ সামলাইবেন? কবিরাজ ডাকবেন না ওঝা ডাকবেন?

এখানে বলে রাখা উত্তম, হেডমাস্টার শুধু ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ ক্যাটাগরির ভীতুই ছিলেন না, দুরারোগ্য কুসংস্কার-ব্যাধিতেও আক্রান্ত ছিলেন। তাই কবিরাজের উদ্ভট কথাবার্তাকে শাস্ত্রের কথা মনে করে কলবে গেঁথে নিলেন। আর স্কুলজুড়ে ঘোষণা দিয়ে দিলেন ‘আজগর’ শব্দটা যেন কেউ ভুল করেও উচ্চারণ না করে। ঘোষণার ফলাফল—‘আলী আজগর তালুকদার’ নামটা থেকে থেকে ‘আজগর’ এর চিরবিদায়। রইল বাকি ‘আলী তালুকদার’। কিন্তু মানুষ কি আর ‘তালুকদার’ উচ্চারণ করতে চায়? যেখানে মানুষ ‘আমীরুদ্দিন’কে ‘আমু’, ‘করম আলী’কে ‘কমু’ ডেকে অভ্যস্ত, সেখানে ‘তালুকদার’ এর মতো বিশাল শব্দটা উচ্চারণ করে কেন বাড়তি পরিশ্রম করবে?

চূড়ান্ত ফলাফল—আলী আজগর তালুকদারের ‘আজগর’ও গায়েব, ‘তালুকদার’ও গায়েব। কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে কেবল ‘আলী’। আলীর লেখাপড়ার দৌড়ের গতি ছিল পুষ্টিহীন কচ্ছপের মতো গতিহীন। যে কারণে কোনোভাবেই সেই লেখাপড়া হাইস্কুলের বাউন্ডারি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়নি। আলীর হাতেও তাই ‘টো-টো কোম্পানির এমডি’ পদে জয়েন করা ছাড়া আর কোনো অপশন থাকেনি। কিন্তু এই পদে চাকরি (!) করলে যেহেতু খেতে না পেয়ে নাড়িভুঁড়ি শুকিয়ে মরার আশঙ্কা আছে, তাই কিছুদিন পর থেকেই আলী খুঁজতে থাকে অন্য চাকরি। খুঁজলেই কি আর পাওয়া যায়? এরমধ্যে একজনের একটা মন্তব্য আলীর কলিজায় ফাটল ধরিয়ে দিলো—‘এইট পাস সার্টিফিকেট দিয়া তো মিয়া সুইপারের চাকরিও পাওন যায় না’।

আলী যখন তার ফাটা কলিজা মেরামত করার জন্য উপায় খুঁজছিল, তখনই পাড়ার বড়ভাই কেরামত মিয়া তাকে একটা অফার দেয়। বলে—খোদেজা আমাকে ভুল বুঝেছে। আমার সঙ্গে দেখাটা পর্যন্ত করতে চাচ্ছে না। অথচ দেখা হওয়াটা অতীব জরুরি। নইলে এই সুযোগে তার বাবা তাকে অন্য জায়গায় বিয়ে দিয়ে দেবে। তুই যদি খোদেজাকে সাতপাঁচ বুঝিয়ে পুকুরপাড়ে এনে আমার সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে পারিস, তাহলে আমি তোকে নগদ পাঁচশ টাকা বকশিস দেবো। আলীর কাছে তখন পাঁচশ টাকা পাঁচ লাখ টাকার সমান। তাই অফারটা সে লুফে নেয়। খোদেজাকে বাড়ি থেকে বের করে পুকুরপাড়ে আনা আর মই লাগিয়ে আকাশ থেকে চাঁদ পেড়ে আনা প্রায় সমান কষ্টের কাজ হলেও কেরামত মিয়াকে কথা দেয় কাজটা সে করবেই।

পাঁচশ টাকার লোভে শুরু হয় আলীর অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টা। এই চেষ্টায় খোদেজা শুধু কেরামত মিয়ার সঙ্গে পুকুরপাড়ে এসে দেখা করতেই সম্মত হয়নি, সম্মত হয় কেরামতের মতো একটা উড়নচণ্ডিকে বিয়ে করতেও। অবশেষে বিয়ের কাজটাও সম্পন্ন হয় আলীর মধ্যস্থতায়। আলী এবার ক্যালকুলেটর না টিপেই হিসাব করে দেখল, তার পকেটে এসেছে মোট সাড়ে তিন হাজার টাকা। এই ঘটনার পর এলাকায় ‘মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে আলীর ভালোই সুনাম ছড়িয়ে পড়ল। কেরামত মিয়ার মতো ‘কেস’ যাদের, তারা শরণাপন্ন হতে লাগল তার। আলীও কেসগুলো হাতে নিল এবং সাফল্যের সহিত শাদি মোবারকের ঘটনা ঘটিয়ে গরম করতে লাগল পকেট। এভাবেই ঘটকজীবনে রাজকীয় প্রবেশ আলীর।

আলী এখন ‘ফুলটাইম’ ঘটক। বাজারের শেষ মাথায় তার একটা অফিসও আছে। অফিসে একটা সাইনবোর্ডও আছে ‘ঘটক আলী ভাই’ লেখাসংবলিত। আলী রোজ অফিস করে। ব্যবসা-বাণিজ্য রমরমা। তবে ছোট একটা জ্বালাতনও আছে। আর জ্বালাতনটা করছে এলাকার বাঁদর ছেলেপুলেরা। তারা দু’দিন পরপরই অত্যাচার চালাচ্ছে সাইনবোর্ডটার ওপর। কী ভাবছেন? সাইনবোর্ডটা খুলে নিয়ে ডোবায় ফেলে দিচ্ছে? জি না। এতটা অসৃজনশীল কাজ করার মতো ছেলে তারা না। তারা যা করছে, তা বেশ সৃজনশীল। ছোটখাটো ক্রেস্ট পাওয়ার যোগ্য। করছে কী, ‘ঘ’ এর এ-কার, আ-কার যোগ করে দিচ্ছে চক দিয়ে। ফলে ‘ঘটক আলী ভাই’ হয়ে যাচ্ছে ‘ঘোটক আলী ভাই’।

দু’দিন পরপর নিজের নামের আগে ‘ঘোটক’ দেখে দেখে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে আলী। এই জ্বালাতন থেকে শুভমুক্তির জন্য সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সাইনবোর্ডটা মাটি থেকে কমপক্ষে একশ’ হাত উপরে ঝোলাবে, যাতে কেউ নাগাল না পায়। শুরু হলো আলীর লম্বা বাঁশ খোঁজা। কিন্তু একশ হাত লম্বা বাঁশ পাওয়া কি এত সোজা? একদিন আলী অফিসে বসে আছে। এমন সময় তিন সদস্য বিশিষ্ট একদল ডিজুস ছেলের আগমন। এই ছেলেগুলোই যে সাইনবোর্ডে লেখা ‘ঘটক আলী ভাইকে’ ‘ঘোটক আলী ভাই’ বানায়, এটা আলীর অজানা। তাই সে তাদের সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলল। এরপর তারা যখন বলল, সাইনবোর্ড ওপরে ঝোলানোর জন্য লম্বা বাঁশ খোঁজার ব্যাপারে তারা আলীকে সার্বিক সহায়তা করবে, তখন আলী মোমের মতো গলে গেল। চায়ের ব্যবস্থা তো করলই, ‘টা’ও চলে এল অটোমেটিক। ছেলেগুলো এই মর্মে ওয়াদা করে বিদায় নিল—তিনদিনের মধ্যে তারা বাঁশের ব্যবস্থা করবে।

পরদিন সকালে আলীর ঘুম ভাঙলো প্রতিবেশীর ডাকাডাকিতে। সে চোখ কচলাতে কচলাতে বাইরে এসে দেখে একপাল প্রতিবেশীর নেতা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তার মোকাব্বর চাচা। আলী কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই চাচা বলতে লাগলেন—তুই কি আমাগোর মানইজ্জত সব ডোবাবি? তোর বাঁশ দরকার, এইটা আমারে কইলেই পারতি। দরকার হইলে আমি সুন্দরবনের জঙ্গল থেইকা বাঁশ আইনা দিতাম। তুই এইভাবে নিজের ইজ্জত নিজে ডোবাবি... ছি ছি ছি। চাচার ‘ছি ছি’র সঙ্গে কণ্ঠ মেলাল পালের সবাই। কোরাস কণ্ঠে ‘ছি ছি’ শুনে ভড়কে গেল আলী। সে তোতলাতে তোতলাতে জিজ্ঞেস করল—কী করছি আমি?

— কী করছস জানস না?

— না তো।

— নিজে আকাম কইরা নিজেই জানস না। বিটলামি করস আমাগো লগে? চাচা নৃত্যশিল্পীদের মতো কোমরে দু হাত রেখে দাঁড়ালেন।

— খোদার কসম চাচা, আমি কিছুই জানি না।

— জানস না! চাচা ভেঙচি কাটেন। না জানলে এইটা ছাপাইছে কেডা?

পাশের জনের হাত থেকে ভাঁজ করা একটা কাগজ নিয়ে আলীর হাতে দিলেন চাচা। বললেন— এলাকার এমন কোনো ওয়াল নাই, যেইখানে এই পোস্টার লাগে নাই। ছি ছি ছি। আলী একটানে ভাঁজ খুলে ফেলল কাগজটার। দেখে তাতে বড় বড় অক্ষরে লেখা—

                             জরুরি ভিত্তিতে আমাকে ‘বাঁশ’ দিন।

                             নিবেদক—

                             ঘোটক আলী ভাই।

 আলী লেখাগুলো কয়েকবার পড়ল। বিশেষ করে ‘জরুরি ভিত্তিতে আমাকে বাঁশ দিন’ কথাটা। তার বুঝতে বাকি রইল না কাজটা কাদের দ্বারা সম্পাদিত। এতদিন ধরে যে এই ছেলেগুলোই ‘ঘটক’কে ‘ঘোটক’ বানিয়ে আসছে, এটাও সে বুঝে ফেলল দামি ডিটারজেন্ট পাউডারে ধোয়া পরিষ্কার কাপড়ের মতো পরিষ্কারভাবে। কিন্তু ছেলেগুলোর বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যাওয়ার সাহস তার নেই। কারণ, তারা সবাই প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান। আত্মসান্ত্বনার জন্য যদি টুকটাক অ্যাকশনে যেতেও চায়, সেটা হতে হবে গোপনে, কৌশলে। এরা টের পেয়ে গেলে সাড়ে সর্বনাশ। আমও যাবে, ছালাও যাবে, ছালার মুখ বাঁধার কাজে ব্যবহূত চিকন যে দড়িটা থাকে, সেটাও যাবে।

আলী কৌশল অবলম্বনের নিয়তে ছেলেগুলোকে খুঁজতে লাগল। তার পরিকল্পনা—ছেলেগুলোর সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে হাসিমুখে কথা বলবে এবং শতভাগ আন্তরিকতার সঙ্গে চা খাওয়ার দাওয়াত দেবে। মূলকথা হচ্ছে, তাদের পোস্টারিংয়ের কারণে আলী যে রাগান্বিত কিংবা বিরক্ত নয়—অবশ্যই এটা বোঝাবে। যাতে তারা তার সঙ্গে আগের মতো ‘ফ্রি’ হয়ে যায়। আলী টানা তিনদিন ছেলেগুলোকে খুঁজেও যখন পেলো না, তখন একজনের মাধ্যমে গোপনে খবর সংগ্রহ করল। খবরের সারমর্ম এমন— সামনেই ছেলেগুলোর ইন্টার পরীক্ষা। তাই এরা পড়াশোনায় মগ্ন। বাড়ির বাইরে বের হয় না বললেই চলে।

আলীর ধামাচাপা দেওয়া রাগটা মুহূর্তেই গুইসাপের মতো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সে কিড়মিড় করতে করতে দাঁতের একাংশ ক্ষয় করে বলে—আমার লগে ফাউলগিরি কইরা এখন লেহাপড়ায় মনোযোগ দিছো! দেও মনোযোগ। মনে রাইখো, পাপ কিন্তু বাপেরেও ছাড়ে না। যেই আকাম তোমরা করছো, তার সাজা অবশ্যই পাইবা। সেইটা দুই দিন আগে আর পরে। এর কিছুক্ষণ পরেই আলীর রাগটা কমে যায়। কারণ, তার মাথায় এই বিষয়টা খেলে—পরীক্ষার কারণে ছেলেগুলো আগামী মাস দুয়েক আর জ্বালাতন করবে না। অতএব নিশ্চিন্তে কাজ-কর্ম করা যাবে।

আলী আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে ঘটকালি নিয়ে। দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাস যায়। কিন্তু দিন, সপ্তাহ, মাস কি আর এমনি এমনি যায়? যায় জ্বালাতনের মধ্য দিয়ে। ছেলেগুলো পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকলে কী হবে, এলাকায় তো আর ‘আজাইরা’ মানুষের ঘাটতি নেই! তারা আলীকে দেখলেই জিজ্ঞেস করে—কী মিয়া, ‘জরুরি ভিত্তিতে আমাকে বাঁশ দিন’ বইলা যে পোস্টারিং করলা, কেউ কি বাঁশ দিছে? দিয়া থাকলে বাঁশ পাওয়ার পর তোমার অনুভূতি কী? পাবলিকের প্রশ্নে আলীর গায়ে এমনভাবে আগুন লাগে, যেন এই আগুন দিয়ে সিগারেট ধরানো যাবে। তবু আলী সহ্য করে। কারণ, কবি বলেছেন—যে সহে, সে ঘটকালিতে রহে।

এক বছর পরের কথা। আলী ঢাকায় এসেছে বিশেষ একটা কাজে। উঠেছে দূরসম্পর্কের মামার বাসায়। দূরসম্পর্কের হোক আর গুড়সম্পর্কের হোক, মামার বাড়ি তো মামার বাড়িই। সুতরাং এখানে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ আবদার চলতেই পারে। প্রচলিত আইনে যে আবদারকে বলা হয়—মামাবাড়ির আবদার। আলীও তাই সাহস করে একটা আবদার করেই বসল। সে সপ্তাহখানেক থাকতে চায় এবং ঢাকা শহরটা ঘুরে দেখতে চায়। আলীর আবদার শুনে মামীর মুখটা কার্টুনের মতো হয়ে গেলেও মামার মুখটা মানুষের মুখের মতোই থাকল। তিনি মেনে নিলেন আবদারটা। আলীর হাতে কিছু টাকাও ধরিয়ে দিলেন ঢাকা শহরে ঘোরার খরচাবাবদ। শুরু হলো ঘোরাঘুরি।

একদিন বিকেলে আলী ঘুরতে গেছে রমনা পার্কে। দেখে জুটি আর জুটি। আফসোসে আলীর বুকটা ‘ফাইট্টা’ যেতে থাকে। আহারে, কেন গ্রামে চেম্বার খুলতে গেলাম! কেন শহরে চেম্বার খুললাম না! এখানে এত এত জুটি, রোজই তো বিশটা ত্রিশটা করে বিয়ের ঘটকালি করা যেত। দৈনিক বিশ-ত্রিশটা বিয়ের ঘটকালি করলে মাসে কত টাকা পকেটে ঢুকতে পারত, এটা ভাবতেই মৃদু চক্কর দিয়ে ওঠে আলীর মাথা। সে চক্কর সামাল দিতে গিয়ে বসে পড়ে পার্কেরই একটা বেঞ্চে। যে বেঞ্চের অন্য মাথায় ফুসুরফাসুর করছে এক জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা।

কিছুক্ষণ বসে থাকার পর মাথার চক্কর নিয়ন্ত্রণে চলে এলে উঠে দাঁড়াতে চায় আলী। এমন সময় তার চোখ পড়ে ফুসুরফাসুরে ব্যস্ত যুগলের প্রেমিকটার ফেঞ্চকাট দাড়ি-বিশিষ্ট মুখের ওপর। আরে, মুখটা তো পরিচিত। আলী বাম দিকে ঝুঁকে কচ্ছপের মতো গলা লম্বা করে তাকায়। আরে এটা তো শফিকুল। আর শফিকুল হচ্ছে ফাজিলদের দলপতি। অর্থাত্ যে ছেলেগুলো তার সঙ্গে দেখা করতে অফিসে গিয়েছিল, তাদের লিডারের ভূমিকায় ছিল এই শফিকুল। তার মানে ন্যাক্কারজনক পোস্টারিংসহ অন্যান্য অপকর্মের নেতৃত্বও দিয়েছিল সে-ই।

আলী গলাখাঁকারি দেয়। যুগল তার দিকে ফিরেও তাকায় না। কারণ, তারা প্রেম লেনদেনের মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত। দুনিয়াবি কোনোকিছুর প্রতিই খেয়াল নেই। আলী এবার শফিকুলের নাম ধরে ডাক দেয়। শফিকুল চোখের সামনে থেকে প্রেমিকার চুল সরিয়ে বেঞ্চের শেষ মাথার দিকে তাকিয়ে আলীকে দেখে ঝেড়ে দৌড় দিতে চায়। নিতান্তই প্রেমিকা তার হাত শক্ত করে ধরে রাখার কারণে সে দৌড় দিতে পারে না। শফিকুলের ভীত-সন্ত্রস্ত মুখ দেখে আলীর ঠেলে হাসি এলেও সে হাসিটাকে আত্মপ্রকাশের সুযোগ না দিয়ে বলে—কী খবরাদি শফিকুল? আছো কেমন?

— জি, ভালো। শফিকুলের শুকনো গলা দিয়ে স্বর বের হতে চায় না।

— ঢাকায় তোমরা কী করো না করো, এই বিষয়ে একটু খোঁজ-খবর নেওয়ার লাইগা আইলাম আরকি। অবস্থা যা দেখলাম, তাতে তো ভালো আছো বইলাই মনে হইল।

— জি।

— শোনো, পোলা-মাইয়া ভালো থাকলে মা-বাপে খুশি হয়। এই কারণেই তুমি যে ভালো আছো, মৌজ-মাস্তি কইরা সময় কাটাইতাছো, এই খবরটা তোমার বাপেরে দিতে চাই। আশা করা যায় তোমার বাপে বিরাট খুশি হইবো।

— আলী ভাই, দয়া করেন। মেয়েটাকে বিদায় দিয়ে ছুটে এসে আলীর হাত ধরে শফিকুল।

— দয়া! কিসের দয়ার কথা বলতেছো?

— আমি যে প্রেম করছি, এটা আব্বাকে বলবেন না। আব্বা শুনলে কেয়ামত ঘটিয়ে দেবে।

— আমি যদি তোমার আব্বারে রাজি করাইতে পারি?

— তাহলে তো খুবই ভালো হয়।

— আর যদি ঘটকালি কইরা দুই জনের বিয়ার ব্যবস্থা করতে পারি।

— তাহলে তো আরো ভালো। ভালোর ওপরে ভালো।

খুশিতে গদগদ হয়ে আলীকে জড়িয়ে ধরে শফিকুল। এরপর শুরু হয় আলীর ঘটকালি। বরাবরের মতোই সে সফল হয়। শফিকুলের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় মেয়েটার। তিন দিন পর। আলী অফিসে বসে আছে। এমন সময় তার অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু তরিকুলের আগমন। তরিকুল চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলল—তুই কোন জিনিস দিয়া তৈয়ার, বুঝলাম না। শফিকুইল্যা তোর সাথে এত বাঁদরামি করল, আর তুই তার জীবনে শুভ ঘটনাটা ঘটায়া দিলি? খুব তো কইছিলি কৌশলে প্রতিশোধ নিবি।

— তুই যেইটারে শুভ ঘটনা বলতাছস, এইটাই আমার প্রতিশোধ। পুরুষমানুষের জীবনে বিবাহের চেয়ে বড় সাজা আর কী হইতে পারে? রবীন্দ্রনাথ কি এমনি এমনি কইছেন—‘পুরুষ মানুষ দুই প্রকার জীবিত বিবাহিত।’

বলেই বিতিকিচ্ছিরি সুরে গানটা গাইতে শুরু করে আলী। তরিকুল তাকে থামাতে চায়। বলতে চায়, গানটা রবীন্দ্রনাথের না। নচিকেতার। কিন্তু থামাতে পারে না। বরং সে নিজেই থেমে যায় এই ভেবে— রবীন্দ্রনাথ লিখুক আর নচিকেতা লিখুক, কথা তো সত্য। অতএব চলুক। এবার তরিকুল কণ্ঠ মেলায় আলীর সঙ্গে। দ্বৈতকণ্ঠে চলতে থাকে ভরপুর গান—

 ‘পুরুষ মানুষ দুই প্রকার জীবিত বিবাহিত গো...’।