প্রবাসীদের ৮৪ শতাংশ অর্থ অলাভজনক খাতে ব্যয়
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০১৪, ২২:৪৪
বিদেশে কর্মরত ৮৬ লাখ শ্রমশক্তির প্রেরিত অর্থের মাত্র ১৬ ভাগ সঞ্চয় করছে তাদের পরিবার। এর বড় অংশ অর্থাত্ ৮৪ শতাংশ অর্থই ব্যয় হচ্ছে অনুত্পাদনশীল বা অলাভজনক খাতে। সামগ্রিকভাবে প্রবাসীরা যে অর্থ দেশে পাঠাচ্ছে তার বড় অংশ বাড়িঘর নির্মাণে ব্যবহূত হচ্ছে। প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থের ব্যবহার নিয়ে করা পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তির একটি হলো তৈরি পোশাক শিল্প, অন্যটি প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স। এর আগে প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থের ব্যবহার নিয়ে কোন সঠিক তথ্য না থাকায় অনেক কিছুই নির্ভর করতে হয়েছে অনুমানের ভিত্তিতে। জরিপে প্রাপ্ত তথ্যে অনেক বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেছে। জরিপের তথ্যে দেখা গেছে- প্রবাস আয় গ্রহণকারী পরিবারগুলোর ব্যয়ের মধ্যে খাদ্যদ্রব্য ক্রয়ে ৩৯% এবং খাদ্যদ্রব্য ব্যতীত অন্যান্য সামগ্রী ক্রয়ে ৩৯% অর্থ ব্যয় করছে। বাকি ২২% টাকা গৃহের ব্যবহার্য টেকসই জিনিসপত্র বা এ জাতীয় উপাদান ক্রয়ে ব্যয় করছে। খাদ্য ছাড়া অন্যান্য ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ৭৮ শতাংশ অর্থ জমি ক্রয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। বরিশাল, ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে জমি ক্রয়ে ব্যয় হচ্ছে ৮০ শতাংশ অর্থ। তবে সঞ্চয়ের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে বরিশাল বিভাগ। এ বিভাগে প্রবাসীদের পরিবারগণ ৬৪ শতাংশ সঞ্চয় করে থাকেন।
প্রবাস আয় গ্রহণকারী পরিবারগুলোর (খানা) মধ্যে মাত্র এক-চতুর্থাংশ বিভিন্ন খাতে যেমন, দোকান-পাট, শিল্প-কারখানাসহ বাণিজ্যিক খাতে বিনিয়োগ করছে। গতকাল সন্ধ্যায় বিবিএস ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাস আয়ের ব্যবহার সম্পর্কিত জরিপ ২০১৩-এর প্রাথমিক ফলাফল তুলে ধরা হয়। এসময় পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মো. নজিবুর রহমান, বিবিএস মহাপরিচালক গোলাম মোস্তফা কামাল উপস্থিত ছিলেন। মূল তথ্য উপস্থাপন করেন কর্মসূচি পরিচালক মো. দিলদার হোসেন।
প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রবাসে দক্ষ এবং শিক্ষিত প্রবাসীদের সংখ্যা খুবই কম। অশিক্ষিত প্রবাসীদের প্রধান গন্তব্য হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। প্রবাস আয় গ্রহণকারী পরিবারগুলো জমির মালিকানা, শিক্ষার হার, বিশুদ্ধ পানি পান ইত্যাদি বিষয় সাধারণ পরিবারের তুলনায় ভালো। প্রবাস আয় গ্রহণকারী পরিবারগুলোর মধ্যে ৯৯ শতাংশ বিশুদ্ধ পানি পান করে এবং ৮২ শতাংশ স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ব্যবহার করে। সাধারণ পরিবারের মধ্যে এ হার যথাক্রমে ৯৭ ও ৬২ শতাংশ। প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ৯৭.৪% পুরুষ এবং মাত্র ২.৬% মাহিলা। মোট প্রবাসীর প্রায় ৬৩ শতাংশের বয়স ৩৫-এর নিচে। মহিলাদের ক্ষেত্রে এ হার ৭০ শতাংশের বেশি।
জরিপের ফলাফলে আরো দেখা গেছে- মোট প্রবাসীর পাঁচ ভাগের তিন ভাগেরও বেশি ১০ বছরের কম সময় ধরে বিদেশে কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৫% প্রবাসী ৫ বছরের বেশি সময় ধরে প্রবাসে রয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্য কিংবা এশিয়ার দেশগুলোতে প্রবাসীরা শ্রমিক কিংবা চাকরিতে কর্মরত আছেন। অন্যদিকে জাপান, ইউরোপের অন্যান্য কিছু দেশ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার দেশগুলোতে প্রবাসীরা ব্যবসা-বাণিজ্যেও নিয়োজিত রয়েছেন। প্রবাসে চিকিত্সক কিম্বা প্রকৌশলীদের সংখ্যা খুবই কম। মোট প্রবাসীদের ৬২ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা নবম শ্রেণীর নিচে। মাত্র ২.৪১ শতাংশ রয়েছেন ডাক্তার কিংবা প্রকৌশলী। তবে বৃত্তিমূলক শিক্ষায় ডিগ্রিধারী প্রবাসীর বেশিরভাগ রয়েছে কানাডা, জাপান, জার্মানি এবং যুক্তরাষ্ট্রে।
প্রশিক্ষণ ছাড়াই দেশের বাইরে যাচ্ছেন অধিকাংশ প্রবাসী: সামগ্রিকভাবে মাত্র ১২.৮% প্রবাসী প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশের বাইরে যাচ্ছেন। সিঙ্গাপুর এবং জাপানের ক্ষেত্রে এই হার ব্যতিক্রম। সিঙ্গাপুরে ৫৭.৫৮% এবং জাপানে ৬৯% প্রবাসী প্রশিক্ষণ নিয়ে যাচ্ছেন।
জরিপে আরো দেখা গেছে- বিদেশ থেকে প্রেরিত অর্থের মধ্যে ৪৪.৬৩ ভাগ প্রবাসীদের পিতা-মাতা গ্রহণ করেন। স্বামী-স্ত্রী কিম্বা পুত্র-কন্যা গ্রহণ করেন ৩৮.৮১% অর্থ। এক শতাংশের কম অর্থগ্রহণ করেন শ্বশুর-শাশুড়ি।
টাকা পাঠাতে জনপ্রিয় ব্যাংক: মোট প্রবাস আয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৭ শতাংশ আসছে ব্যাংকের মাধ্যমে। হুন্ডির মাধ্যমে আসছে ১০ শতাংশ এবং ৬.৮৭ শতাংশ আসছে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মাধ্যমে।
গত এক বছরে সর্বোচ্চ অর্থ এসেছে ঢাকা বিভাগে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ এবং সবচে কম এসেছে রাজশাহী বিভাগে। তবে অগ্রাধিকার পাচ্ছে বাড়িঘর নির্মাণ এবং ফ্ল্যাট ক্রয়ে। গত এক বছরে (২০১৩) প্রবাস আয়ের মোট ৭২ শতাংশ বিনিয়োগ হয়েছে বাড়ি-ঘর নির্মাণে। ১৫.৮৯ শতাংশ ব্যয় হয়েছে ফ্ল্যাট ক্রয়ে। বাড়িঘর নির্মাণে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে বরিশাল বিভাগ ৮১%। এরপর খুলনায় ৮০%, রংপুরে ৭৯%, রাজশাহী ৭৮%, সিলেট ৭৫%, চট্টগ্রাম ৭০% এবং ঢাকায় ৬৮%।