শান্তিপূর্ণ ভোটে জয়ী সেলিম ওসমান
সাইদুর রহমান ও হাবিবুর রহমান বাদল, নারায়ণগঞ্জ থেকে ফিরে
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০১৪, ২২:৫৫
শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপ-নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন জাতীয় পার্টির-জাপা প্রার্থী সেলিম ওসমান। ১৪১ কেন্দ্রের মধ্যে ১৪০ কেন্দ্রের বেসরকারি ফলাফলে লাঙ্গল প্রতীকে সেলিম ওসমান পেয়েছেন ৮২ হাজার ৮৫৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম আকরাম আনারস প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৬৬ হাজার ১১৪ ভোট। অনিয়মের অভিযোগে মালিবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়েছে। ওই কেন্দ্রের মোট ভোট সংখ্যা ২ হাজার ২৬। সেলিম ওসমান ১৬ হাজার ভোটে এগিয়ে থাকায় তা ফলাফলে কোনো প্রভাব ফেলবে না। সেলিম ওসমানকে বিজয়ী ঘোষণার পরপরই তার কর্মী-সমর্থকরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। ফলাফল ঘোষণার পর তাত্ক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় সেলিম ওসমান ইত্তেফাককে বলেন, এ বিজয় নারায়ণগঞ্জবাসীর। শহর ও বন্দরের ভোটারদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি কাউকে বিজয় মিছিল না করার জন্য অনুরোধ করেন।
গতকাল রাতে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষ থেকে ফলাফল ঘোষণা করেন রিটার্নিং অফিসার মিহির সারোয়ার মোর্শেদ। রিটার্নিং অফিসার বৃহস্পতিবার রাত ১২টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা নির্বাচনী এলাকায় যে কোন ধরনের মিছিল-মিটিং-এর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন তিনি। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রগুলো ফাঁকা থাকলেও নির্বাচন কমিশন বলছে, ভোট পড়েছে ৪৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ। দুপুরের পর ভোটার বেড়েছে বলে জানানো হয়। শহর এলাকার চেয়ে বন্দর এলাকায় ভোটার উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী বাকী প্রার্থীর মধ্যে কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগের শফিকুল ইসলাম (গামছা) পেয়েছেন ১ হাজার ৩৯৬ ভোট এবং আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুন সিরাজুল মজিদ (চিংড়ি মাছ) পেয়েছেন ৭৪৩ ভোট। এই আলোচিত উপ-নির্বাচনে মোট কেন্দ্র ছিল ১৪১টি। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের পর আলোচিত এই নির্বাচনে শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম ও পূর্বপাড়ের এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৪২ হাজার ৪০৫ জন। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৪ হাজার ৩১১ ও মহিলা ভোটার ১ লাখ ৬৮ হাজার ৯৪ জন। গত ২৯ এপ্রিল পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য নাসিম ওসমানের মৃত্যুতে শূন্য হয় নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন।
এদিকে, উত্কণ্ঠার মধ্য ভোটগ্রহণ শুরু হলেও সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে নির্বাচন। ভোটার উপস্থিত ছিল কম। রিটার্নিং কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সকালে ভোটার উপস্থিতি কম থাকলেও বিকালে ভোটার উপস্থিতি বেড়েছে। ভোটকেন্দ্রে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সরব উপস্থিতিতে কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে আলোচিত এই উপনির্বাচনে ভোটার ক্রমিক নম্বর জানতে না পারায় ভোট না দিয়েই কেন্দ্র থেকে ফিরে যেতে হয়েছে কিছু ভোটারের। নির্বাচনে একজন প্রার্থীর পক্ষ থেকে কেন্দ্র দখল, জাল ভোট ও কেন্দ্র থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়ার অভিযোগ আনা হলেও তার সত্যতা পাননি নির্বাচনী কর্মকর্তারা।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ জানিয়েছেন, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। তবে নির্বাচনে কেউ অপরাধ করলে, তিনি যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। এমনকি নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা হলে তাও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দু’একটি বিছিন্ন ঘটনা ছাড়া ১৪১টির অধিকাংশ কেন্দ্রে সুষ্ঠু ভোট সম্পন্ন হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মালিবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগে ভোট স্থগিত করেছেন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা। এছাড়াও সৈয়দপুর বঙ্গবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ ১০ মিনিটের জন্য বন্ধ রাখা হয়। বন্দরের কেওঢালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুপুরে জাল ভোট দেয়ার অপরাধে র্যাব দুইজনকে আটক করে। এক পুলিশ কর্মকর্তাকে হুমকি দেয়ার অভিযোগ উঠলেও পুলিশের পক্ষ থেকে তা স্বীকার করা হয়নি। বিকালের দিকে কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি বাড়ে বলে নির্বাচন কর্মকর্তারা বলছেন। বিএনপি এই নির্বাচনও বর্জন করেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এই আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিয়েছে বলে নৌকা প্রতীকের কোনো প্রার্থী নেই এই নির্বাচনে।
প্রিজাইডিং কর্মকর্তা জানান, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষ ভোটারের উপস্থিতি বাড়লেও নারী উপস্থিতি ছিল কম। ভোট শুরু হওয়ার দুই ঘন্টা পর সকাল ১০টায় নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের ১ নং মহিলা বুথে ভোট পড়ে মাত্র ৫টি। সেই বুথের মোট ভোটার সংখ্যা ৫২৫। ৪ নং পুরুষ বুথে ৫১২ ভোটের মধ্যে দুই ঘন্টায় পড়ে ৯ ভোট। দুপুর ১১টায় একই চিত্র দেখা যায় সংসদীয় এলাকার মর্গ্যান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের দেয়া তথ্য মতে, বেলা ৩টার পরে অনেক কেন্দ্রে ৩৫-৫০ শতাংশ ভোট পড়েছে।
ভোটার নম্বর নিয়ে হয়রানি
ভোটার ক্রমিক নম্বর জানতে না পারায় ভোট না দিয়েই কেন্দ্র থেকে ফিরে যেতে দেখা গেছে ভোটারদের। সকাল ৮টায় ভোট শুরুর তিন ঘণ্টার মাথায় নারায়ণগঞ্জ ক্লাব কেন্দ্রে এমন অন্তত ২০ জনকে ভোট না দিয়েই ফিরে যেতে দেখা যায়। রেখা সাহা নামে তাদের একজন বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে কেন্দ্রে এসেও ভোটার নম্বর না জানার কারণে ভোট দিতে পারিনি। জয়গোবিন্দ উচ্চ বিদ্যালয়ের সোনালি নামের ভোটার জানান, তিনি ভোটার স্লিপ অনুযায়ী যে বুথে ভোট দিতে গেছেন সেখানে তালিকায় তার নাম পাওয়া যায়নি। কেন্দে র ভোটার সেলিম হোসেন অভিযোগ করেন, ভোটার তালিকায় তার নাম খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ১৯৭২৬৭৯৫৮১৭০০০০০৭ নং জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে তিনি সাংবাদিকদের কাছে বলেন, ‘আমার পরিচয়পত্র থাকলেও ভোটার তালিকায় নাম তিন ঘন্টা ধরে খুঁজে পাইনি। এমন অভিযোগ বেশ কয়েকজন ভোটারের কাছ থেকে পাওয়া যায়। এ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন তাদের ওয়েবসাইট ও মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে ভোটারদের কেন্দ্র ও তাদের ভোটার নম্বর জানানোর ব্যবস্থা করে। আগের বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তথ্য সরবরাহ করলেও এবার তারা তা করেননি। বিষয়টি নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে অনুযোগও করছেন অনেক ভোটার। তবে কেন্দ্র ফেরত ভোটারদের সামনে ‘অসহায়’ রিটার্নিং কর্মকর্তা মিহির সারওয়ার মোর্শেদ। নারায়ণগঞ্জ ক্লাব কেন্দ্রে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বাড়ি বাড়ি ভোটার স্লিপ পৌঁছানোর কথা প্রার্থীদের। ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের বাইরে প্রার্থীদের অনুমোদিত এজেন্টদেরও ভোটার নম্বর দেয়ার কথা। এখন তারা না করলে আমরা কী করতে পারি?
পরিবেশ শান্তিপূর্ণ :পুলিশ সুপার
সকাল ১০টার দিকে নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল কেন্দ্র পরিদর্শনে এসে পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদউদ্দিন জানান, সকাল থেকে যে কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়েছি, সেখানে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখতে পাইনি। ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রয়েছে। কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের সঙ্গেও আমি কথা বলেছি, তাদের কোনো ধরনের ভয়ভীতি কিংবা বাধা দেয়ার অভিযোগ পাইনি। তবে ভোটার উপস্থিতি কম রয়েছে।
নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে :সিইসি
উপনির্বাচন শেষে নির্বাচন কমিশনের মিডিয়া সেন্টারে এক ব্রিফিং-এ প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেছেন, ‘নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। এখন ভোটের পরবর্তী ভায়োলেন্স যাতে না হয় সে প্রস্তুতি নিচ্ছি আমরা। সহিংসতা করলে কঠোর হস্তে দমন করা হবে। ভোটে অনিয়মের কারণে একটি কেন্দ্রের ভোট বাতিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, এর আগে দু’জন প্রার্থী পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছেন। আমরা তিনটি অভিযোগ তদন্ত করে দেখেছি। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।