সালাম মুর্শেদির কলাম
একটু পা হড়কালেই বিপদ
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০১৪, ২২:৫৫
ফুটবল সৌন্দর্যের সবটুকু মেলে ধরে ব্রাজিল বিশ্বকাপ পৌঁছে গেছে নক আউট পর্বে। ফেভারিট দলগুলোর পাশাপাশি সাবেক তিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নকে বিদায় করে দিয়ে এই রাউন্ডে পা রেখেছে কিছু উঠতি শক্তিও। গ্রুপ পর্বের মতো এখানেও যদি আমরা অপ্রত্যাশিত কোন ফলাফল দেখি আমি মোটেই অবাক হবো না।
কারণ, টুর্নামেন্টের এই পর্যায়ে এসে মাঠের খেলায় ফেভারিট নয় কেউই। গ্রুপ পর্বে হয়তো ভুল শুধরে নেয়ার সুযোগ ছিল দলগুলোর, এখন আর সেই সুযোগটা থাকছে না। প্রতিটি ম্যাচই এখন বাঁচা-মরার লড়াই। প্রতিটি দলই নিজেদের সেরাটা ঢেলে দিতে প্রস্তুত। নেইমার-লিওনেল মেসি-করিম বেনজামারা তৈরি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অংশ হতে। পাঠক সেরা তারকাদের সেরা রূপটি দেখতে প্রস্তুত থাকুন আপনিও।
টুর্নামেন্টের শুরুর দিকেই আমি বলেছিলাম এই বিশ্বকাপটা সমালোচক আর বোদ্ধাদের সব পূর্বানুমানকে ভুল প্রমাণিত করতে পারে। আমার এই কথার পেছনে সবচেয়ে বড় যুক্তিটি ছিল ব্রাজিলের আবহাওয়া। ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত আগের টুর্নামেন্টগুলো দেখে আমার মনে হচ্ছিল, সেখানকার কন্ডিশনের সাথে মানিয়ে নেয়াটা খুব কঠিন হবে। একই সঙ্গে প্রচণ্ড গরম, আর্দ্রতা এবং বৃষ্টিপাতের সঙ্গে মানিয়ে নেয়াটা ভিনদেশী কোন মানুষের জন্য মোটেই সহজ নয়। দক্ষিণ আমেরিকায় ইউরোপের কোন দেশের এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিততে না পারার কারণও বোধহয় সেটাই। আমি জানি না জার্মানি-ফ্রান্স কিংবা নেদারল্যান্ডস এবার সেই ধারা ভাঙ্গতে পারবে কিনা, তবে নিশ্চিতভাবেই বলা চলে সেটা করতে হলে কঠিন এক পথই তাদের পাড়ি দিতে হবে।
নকআউট রাউন্ড নিশ্চিত করা ষোলটি দলের দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে সবকিছু, একমাত্র লাতিন দেশ হিসাবে ইকুয়েডরই শুধু শেষ ষোলর টিকেট কাটতে ব্যর্থ হয়েছে। চিলি-কলম্বিয়ার মতো দলগুলোতো রীতিমতো কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছে তাদের প্রতিপক্ষদের। স্পেনকে বিদায় করে দিয়ে গ্রুপের দ্বিতীয় সেরা দল নির্বাচিত হয়েছে চিলি। অন্যদিকে, কলম্বিয়ার গ্রুপে প্রতিষ্ঠিত কোন শক্তি না থাকলেও তিন খেলায় অনায়াস জয় তুলে নিয়ে চিলি বুঝিয়ে দিয়েছে এই কন্ডিশনে তাদের হারানো খুব কঠিন হবে। এদিকে, গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিলেও গত বুধবার রাতে শক্তিশালী ফ্রান্সের বিরুদ্ধে পারফরম্যান্স দিয়ে ইকুয়েডরও প্রমাণ দিয়েছে নিজেদের শক্তিমত্তার। এখানে মনে রাখতে হবে, দ্বিতীয়ার্ধের অনেকটা সময় দশজনের দল নিয়ে খেলতে হয়েছে তাদের।
লাতিন আবহাওয়ার সাথে কিছুটা পরিচিত দুই দল মেক্সিকো এবং কোস্টারিকাও চলে গেছে পরের রাউন্ডে। সুতরাং, এই দলগুলো নকআউট রাউন্ডে কঠিন চ্যালেঞ্জ জানাবে প্রতিষ্ঠিত শক্তিগুলোকে। গ্রুপ পর্বে ভালো খেলায় তাদের আত্মবিশ্বাসের মাত্রাটাও থাকবে অনেক উঁচুতে। নকআউট রাউন্ডের প্রথম খেলায় ব্রাজিল মুখোমুখি হবে চিলির। শক্তিমত্তা বা ফুটবল ঐতিহ্যে ব্রাজিলই এগিয়ে থাকবে এই ম্যাচে। তবে, আবারো সেই পুরনো কথাই বলবো আমি। ব্রাজিলের কন্ডিশন চিলির পুরোপুরি পরিচিত। তাছাড়া প্রতিপক্ষ হিসাবেও আন্তঃমহাদেশীয় টুর্নামেন্টে বহুবার ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়েছে তারা। চিলির এই দলের বেশ কিছু খেলোয়াড় খেলেন ব্রাজিলিয়ান লিগে। তাছাড়া, চোট কাটিয়ে আগামীকালের এই ম্যাচ দিয়ে মাঠে ফিরছেন চিলির মূল তারকা আরতুরো ভিদাল। এই সব কিছু মিলে আমার মনে হয়, কাগজে-কলমে বিশাল পার্থক্য থাকলেও, দু’দলের মধ্যে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটা খেলা আমরা দেখবো।
রাতের অন্য খেলায় মুখোমুখি হবে দুই লাতিন প্রতিবেশী উরুগুয়ে এবং কলম্বিয়া। প্রথম ম্যাচের মতোই এখানেও লড়াই হবে সমানে সমানে। যদি লুইস সুয়ারেজ আগের ম্যাচে ঐ কামড়ের ঘটনার কারণে কোন শাস্তির মুখোমুখি না হন, তাহলে এই ম্যাচে নিশ্চিতভাবে খেলবেন তিনি। এবং উরুগুয়ের খেলাটা হবে তাকে কেন্দ্র করেই।
বি গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন নেদারল্যান্ডস খেলবে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে। আগের ম্যাচে একাদশের বাইরে থাকলেও এই ম্যাচে শুরু থেকেই হয়তো খেলবেন রবিন ফন পার্সি। দারুণ ছন্দে আছেন পার্সির আক্রমণ সহযোগী আরিয়েন রোবেনও। মেক্সিকোর মূল চ্যালেঞ্জটা হবে এই দু’জনকে গোলবঞ্চিত রাখা। সেটা যদি করা যায়, তাহলে ম্যাচের ফলাফল তাদের পক্ষে চলে আসলেও অবাক হবো না আমি।
ডেথ গ্রুপ ‘ডি’র চ্যাম্পিয়ন কোস্টারিকার সামনে শেষ আটে যাবার দারুণ একটা সুযোগ অপেক্ষা করছে। কারণ, শেষ ষোলোতে তারা প্রতিপক্ষ হিসাবে পেয়েছে তুলনামূলক বিচারে সবচেয়ে দুর্বল দল গ্রীসকে। কোস্টারিকার পারফরম্যান্স আর আত্মবিশ্বাস বিবেচনায় আমি এই ম্যাচে তাদেরই এগিয়ে রাখবো।
এদিকে, সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স করিম বেনজামার হাত ধরে বেশ ছন্দময় গতিতে এগিয়ে চলেছে। ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে গত বুধবারের ম্যাচেও বেশ কয়েকবার গোলের সম্ভাবনা জাগিয়েছিলেন এই রিয়াল মাদ্রিদ তারকা। শেষ পর্যন্ত গোল না পেলেও প্রথম দুই ম্যাচে ভাল খেলার ধারাবাহিকতা এই ম্যাচেও ধরে রেখেছিলেন তিনি। পাশাপাশি পল পোগবা, অলিভার জিরুও ফর্মে আছেন। তবে নাইজেরিয়াকে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। আর্জেন্টিনার সাথে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছিল তারা। আমি বলবো ফ্রান্স সামান্য এগিয়ে থাকলেও এই ম্যাচে দু’দলের সামনেই সুযোগ থাকছে সমান সমান। অন্যদিকে, এই গ্রুপের রানার্সআপ সুইজারল্যান্ডের সামনে অপেক্ষা করছে লিওনেল মেসির দল আর্জেন্টিনা।নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে তাদের পারফরম্যান্স প্রথম দু্ই ম্যাচের চাইতে ভাল হলেও মেসির ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি দলটি। অথচ, নকআউট রাউন্ডে ভাল করতে এর গুরুত্ব অপরিসীম।