শিল্পায়নে ভূমিকা রাখবে স্পেশাল ইকোনমিক জোন

রাজধানী ঢাকা বা এর আশেপাশে শিল্প কলকারখানা স্থাপন করা হলে তার ওপর দ্বিগুণ কর আরোপ করা হবে। আর যেসব শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ঢাকার বাইরে চলে যাবেন তাঁদের কর কমানোসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেয়া হবে বলে কিছুদিন আগে এক আলোচনায় জানিয়েছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন। এমনিতেই ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকা এখন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে গেছে। এর জন্য ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং অস্বাভাবিক গতিতে বৃদ্ধি পাওয়া শিল্প কারখানাই দায়ী। এ ক্ষেত্রে ঢাকাকে বসবাসযোগ্য করতে হলে শিল্পোদ্যোক্তাদের ঢাকার বাইরে যাওয়ার কথা চিন্তা করতেই হবে। ঢাকার বাইরে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে আগ্রহী উদ্যোক্তাদের যে সব সুযোগ সুবিধা দেয়ার কথা বলা হচ্ছে তা যদি ঠিকঠাক মতো বাস্তবায়িত হয় তাহলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন নতুন শিল্প কারখানা গড়ে উঠবে। যাকে কেন্দ্র করে ঐ সব জায়গায় নানা অবকাঠামো গড়ে উঠবে, উন্নয়নের ভিন্নমাত্রা যুক্ত হবে। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় গড়ে ওঠা শিল্পনগরী ও রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত শিল্প কারখানাগুলো জাতীয় প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় অল্প অল্প করে হলেও ভালো অবদান রাখতে শুরু করেছে। তবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় নতুন নতুন শিল্প কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে নানা ধরনের জটিলতা, প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন আগ্রহী উদ্যোক্তারা। কিছুদিন আগে একটি দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, তদবির সুপারিশ ও আইনি জটিলতায় অব্যবহূত প্লট বরাদ্দ নিয়ে বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। ইতিমধ্যে সারা দেশের বিভিন্ন শিল্প নগরীর অব্যবহূত প্লট বাতিলের উদ্যোগ নেয়া হলেও তা পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। দেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা শিল্প নগরীতে কারখানা নির্মাণে সুবিধামতো জায়গা সরবরাহের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে বিসিকের ৭৪টি শিল্পনগরীর প্লটগুলোর যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কিনা বা বর্তমানে কী অবস্থায় আছে তার বিবরণ জানাতে নির্দেশনা দেয়া হয়। বাস্তবতা হলো, দেশের বিভিন্ন শিল্প নগরীতে অনেক প্লট এখনও অব্যবহূত রয়েছে। প্লট বরাদ্দ নিয়েও কারখানা নির্মাণ করেনি অনেকে। আবার বরাদ্দ দেয়া হয়নি এমন প্লটও কম নয়। বরাদ্দ নিয়েও ন্যূনতম পাঁচ বছরের বেশি সময় ফেলে রাখা প্লট নতুন মালিকানায় দিতে পুরনো বরাদ্দ বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ইতিমধ্যে অসংখ্য প্লট বাতিলের নোটিস পাঠানো হয়েছে বরাদ্দপ্রাপ্ত মালিকদের কাছে। দেশের বিভিন্ন শিল্পনগরীতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনেক উদ্যোক্তা রাজনৈতিক তদবিরে প্লট পেয়েছেন। আবার অনেকে প্লট বরাদ্দ পেলেও সেখানে শিল্প কারখানা স্থাপন না করে বিদেশে চলে গেছেন। তারা প্লট পেয়েও দীর্ঘদিন অব্যবহূত অবস্থায় ফেলে রেখেছেন। বিষয়টি বিসিক কর্তৃপক্ষের গোচরীভূত হওয়ায় পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন অব্যবহূত প্লটের উদ্যোক্তাদের নামে বরাদ্দকৃত প্লট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিক ইদানিং বেশ মনোযোগী হয়েছে। তারা প্লটগুলো প্রকৃতউদ্যোক্তাদের দেয়ার ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন বলে জানা যায়, দুঃখজনক ব্যাপার হলো, যেখানে উদ্যোক্তারা জায়গার অভাবে কারখানা নির্মাণ করতে পারছেন না, সেখানে বিসিকের অনেক প্লট এখনও অব্যবহূত রয়েছে। কিছুদিন আগে বিসিকের ৭৪টি শিল্পনগরীর ওপর তৈরি করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বিসিকের শিল্প নগরীগুলোয় মোট প্লটের সংখ্যা ১০ হাজার ৩৩৮টি। মোট বরাদ্দকৃত প্লট ৯ হাজার ৮৭৬টি। বরাদ্দকৃত প্লটে মোট শিল্প ইউনিট পাঁচ হাজার ৭৪৮টি। উত্পাদনে রয়েছে চার হাজার ২৭৮টি শিল্প ইউনিট। বাস্তবায়নাধীন শিল্প প্লট সংখ্যা ৫০৭টি। নির্মাণ কাজ শুরু হয়নি ৬৪২টিতে। দেশের ৭৪টি শিল্পনগরীর প্রতিটির গড় আয়তন ২৬ দশমিক ৬১ একর। ঐ প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ১৯৮০ থেকে ১৯৯৮ সময়ে ১৮ বছরে রাজনৈতিক বিবেচনায় ৪০টি শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বিসিক কর্তৃপক্ষ এসব শিল্পনগরীকে যথাযথ নিয়ন্ত্রণে এনে বিধি মোতাবেক সব নিয়মাচার পালনপূর্বক প্লট বরাদ্দ দিতে পারেনি। দেশের বিভিন্ন রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) গুলোতেও প্রায় একই দৃশ্য দেখা যায়। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে গতির সঞ্চার হয়েছে তা অব্যাহত রাখতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ পৃথক পৃথক অর্থনৈতিক অঞ্চল ও রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠা অন্যতম। ইতিমধ্যে যেসব অর্থনৈতিক ও রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেগুলো নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত রয়েছে। সম্প্রতি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কাজ শুরু করতে প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। প্রথম পর্যায়ে চট্টগ্রামে দুটিসহ চারটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) তৈরি করা হবে। দেশে ব্যাপকভাবে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন প্রথম পর্যায় শীর্ষক প্রকল্পটি সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সারাদেশে সুবিধাজনক অঞ্চলে এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। এই প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে সিরাজগঞ্জ, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রামের আনোয়ারা, মিরসরাইয়ে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করা হবে। অন্যান্য অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইপিজেড) থেকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পার্থক্য হচ্ছে, ইপিজেডে শুধু রফতানি নির্ভর পণ্য উত্পাদন করা হয়। কিন্তু বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে সব ধরনের পণ্য উত্পাদন করা হবে। সরকার জমি, গ্যাসলাইন, বিদ্যুত্ সরবরাহ করবে। বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মতো করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করবে। এসইজেড গড়ে তোলার উদ্দেশ্য হলো, দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিল্প কারখানার প্রসার ঘটানো। এজন্য ইকোনমিক জোনস স্থাপনের মাধ্যমে বরাদ্দপ্রাপ্ত জমিতে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো তৈরি ও ইউটিলিটি সরবরাহ করা হবে। বিদেশি উদ্যোক্তদের এসব বিশেষ জোনে শিল্প কারখানা স্থাপন ও পরিচালনায় আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে উপযুক্ত ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা একান্ত প্রয়োজন। দেশের মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিল্পায়নের প্রসার ঘটানোই এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য।