ইতিহাস গড়ে এবার প্রতিশোধ মিশন
প্রকাশ : ২৭ জুন ২০১৪, ২১:২৩
হিসাব-নিকাশের শেষ একটা বাধা বাকি ছিল। বেলজিয়াম দুই ম্যাচ জিতে আগেই ‘এইচ’ গ্রুপ থেকে নিশ্চিত করে ফেলেছিল দ্বিতীয় রাউন্ড। ঝুলে ছিল, আলজেরিয়া, রাশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া। আগের ম্যাচেই দক্ষিণ কোরিয়াকে ৪-২ গোলে বিধ্বস্ত করা আলজেরিয়ানদের সামনেই সুযোগটা ছিল সবচেয়ে বেশি। শেষ ম্যাচে রাশিয়ার বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করে চলে গেল তারা দ্বিতীয় পর্বে। ব্যাস, হয়ে গেল নতুন এক ইতিহাস।
২৮ বছর পর খেলতে এসে বিশ্বকাপের প্রথম জয় পাওয়া দলের পক্ষে বিশ্বকাপে কতদূর যাওয়া সম্ভব? দ্বিতীয় পর্বে উঠে যাওয়াটাই যে তাদের জন্য বিশ্বজয়ের সমান। সেই অর্থে আলজেরিয়াও জিতে ফেলেছে বিশ্বকাপ। দেশজুড়ে তাই চলছে বিশ্বজয়ের উত্সব। রাজধানী আলজায়ারসের রাস্তায় বিজয় উত্যাপন করে হাজার হাজার মানুষ। বিজয় ছুঁয়ে গিয়েছিল ফ্রান্সেও। সাবেক ফরাসি উপনিবেশ দেশের মানুষের উত্সব এতোটাই উদ্যম হয়ে উঠেছিল যে এক পর্যায়ে আইন-শৃংখলা বাহিনী নামিয়ে তাদের শান্ত করা হয়।
কিন্তু, এতো আয়োজন করে উত্সবের পথটা মোটেই সহজ ছিল না আলজেরিয়ানদের জন্য। তাদের এই বিজয়ের পিছনে লুকিয়ে আছে বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম ন্যক্কারজনক এক ঘটনা। ঘটনাটি ঘটে ১৯৮২ সালের ২৫ জুন। চলছে স্পেন বিশ্বকাপ। গিজন শহরের এল মনিনোন স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয়েছে পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ। এখানেই ঘটে গেল বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম ন্যক্কারজনক ঘটনাগুলোর একটি।
প্রথম থেকেই পশ্চিম জার্মানির মুহুর্মুহু আক্রমণ। গোল পেতে তাই বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না জার্মানদের। ১০ মিনিটের মাথায় হর্স্ট রুবেখের গোলে ১-০ তে এগিয়ে যায় পশ্চিম জার্মানি।
এরপরের ৮০ মিনিট ছিলো ফুটবলের কলঙ্কতম অধ্যায়। দুই দলই জানতো, এই ফলই তাদের দু’দলকে তুলে দিবে দ্বিতীয় রাউন্ডে, বাদ পড়বে আলজেরিয়া। প্রতিবেশী দু’দেশ তাই ম্যাচের বাকি সময়টা বলার মত কোন আক্রমণই করেনি। নিজেদের অর্ধেই বল পাস দিচ্ছিলো, যদি প্রতিপক্ষের কোন খেলোয়াড় আসে, তাহলে ব্যাক পাস দিচ্ছিলো গোলরক্ষককে। কেবল পশ্চিম জার্মানির ড্রেমলার আর অস্ট্রিয়ার শাখনারই যা একটু চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু বাকি ২০ জনের অফুটবলীয় আচরণে ম্যাচটি পরিণত হয় পরিহাসে।
সেই বিশ্বকাপে অভিষিক্ত আলজেরিয়া প্রথম দিনেই পরাক্রমশালী পশ্চিম জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে দেখিয়েছিলো চমক, সেবারই প্রথম কোন আফ্রিকান দল বিশ্বকাপে ইউরোপের কোন দলকে হারায়। পরের ম্যাচে অস্ট্রিয়ার কাছে হারলেও চিলিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে আলজেরিয়া প্রথমবারই বাজিমাত্ করে দিয়েছিলো প্রায়। কিন্তু, পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার এক ম্যাচই শেষ করে দিলো আলজেরিয়ার স্বপ্ন।
ম্যাচশেষে ক্ষুব্ধ আলজেরিয়ান ফুটবল ফেডারেশন আবেদন জানায় ফিফাকে এই প্রহসনের ম্যাচ বাতিল করার। কিন্তু কোন নিয়মভঙ্গ না হওয়ায় ফিফা কোন তদন্তে অস্বীকৃতি জানায় এবং ম্যাচের ফল বহাল রাখে। পশ্চিম জার্মানি শেষপর্যন্ত টুর্নামেন্টে রানার্স-আপ হয়, অস্ট্রিয়া বাদ পড়ে পরের রাউন্ডেই। ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনা ও পেরুর মধ্যকার আরেকটি ম্যাচও পাতানো হয়েছিল বলে সন্দেহ করা হয়।
এই দুই ম্যাচের জের ধরেই ১৯৮৪ সালের ইউরো আর ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ থেকে গ্রুপের শেষ রাউন্ডের দু’টি ম্যাচ একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে, যেন কোন দল এরকম প্রহসনের ম্যাচ খেলতে না পারে। কিন্তু আলজেরিয়ার জন্য তো অপেক্ষার অবসান ঘটে না। ১৯৮৬ সালে কোন ম্যাচ না জিতেই বিদায় নিল গ্রুপ পর্ব থেকে।
এরপর কেটে গেল ২৮ বছর। বিশ্বকাপের বাছাইপর্বই পেড়োনো হল না তাদের। চলমান ব্রাজিল বিশ্বকাপে তারা এসেছিল অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে। কিন্তু এতোদিনের প্রতীক্ষার অবসানটা বেশ জোড়ালো ভাবেই করলো আলজেরিয়া।
এবার প্রতিশোধের মিশন। শেষ ষোলতে যে তাদের সামনে আসবে জার্মান বাধা। কোচ ভাহিদ হালিলডোজিচ তো কোন বিনয় না করে প্রতিশোষ নেয়ার কথাই জানিয়ে দিলেন, ‘৩২ বছর অনেক দীর্ঘ একটা সময়। আমাদের অর্জনের জন্য আমরা গর্বিত। নিজেদের যোগ্যতা দিয়েই আমরা এই অবস্থানে পৌঁছেছি। কিন্তু তাই বলে, আমরা ইতিহাস ভুলে যাইনি। ১৯৮২ সালের পর থেকে আলজেরিয়া ও জার্মানিকে নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। সামনের ম্যাচে জার্মানদের আমরা এক বিন্দু ছাড় দেবো না।’
তাহলে কি দেখা যাবে আরেকটি আলজেরিয়ান ইতিহাস!