ফুটবলের পুরনো শত্রু ব্রাজিল চিলি
সোহেল সারোয়ার চঞ্চল বেলে হরিজোন্তে ব্রাজিল
প্রকাশ : ২৭ জুন ২০১৪, ২১:৩২
অরল্যান্ডো সিজার। প্রায় ৯০ বছর বয়স তার। এখনো সুন্দরভাবেই চলাফেরা করেন। বাসে উঠে জায়গা না পেয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। কেউ তাকে চেয়ার ছেড়েও দিল না। দুই হাতে বাসের হ্যান্ডল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোক সাংবাদিকদের গলায় ফিফার কার্ড ঝুলতে দেখে পরিচয় জানতে চাইলেন। পরিচয় পেয়েই মেতে উঠলেন ফুটবল আলোচনায়। নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তার অনেক স্মৃতি মনে পড়লো। দোভাষির সহযোগিতায় বললেন, ‘আমি আমার বন্ধুরা মিলে চিলি গিয়েছিলাম। সেবার (১৯৬২) বিশ্বকাপ ফুটবল দারুণ জমে উঠেছিল। ব্রাজিল চিলি ভালো একটা সেমিফাইনাল হবেই। কারণ চিলির সাথে আমাদের ফুটবল শত্রুটা অনেক দিনের। ওরা ভালো না। আমরা কয়েকজন তরুণ বন্ধু মিলে খেলা দেখতে গিয়েছিলাম। প্রায় ৮০ হাজার দর্শক জমা হয়েছিল মাঠে। সেই ম্যাচের টান টান উত্তেজনার ছবিগুলো এখনও আমার চোখে ভাসে।’
ব্রাজিলের সাথে চিলির ফুটবল শত্রুটা প্রায় শত বছরের পুরনো। বিশ্বকাপ ফুটবলের বড় আসরে এই দুই দলের মাঠের লড়াই খুব ঘনঘন না হলেও খেলাটিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের রয়েছে অস্থির একটা সম্পর্ক। বল পায়ে কখনোই সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল না। ব্রাজিল চিলির খেলা হলেই দর্শক আর খেলোয়াড়দের মধ্যে কোনো না কোনো ঘটনা ঘটেছেই। বলেন অরল্যান্ডো। তিনি বলছিলেন, চিলির মাঠে যে বছর বিশ্বকাপ ফুটবল হয়েছিল সেই মাঠে আমরা আক্রমণের শিকার হয়েছিলাম। তা আমি এখনও ভুলতে পারি না।’ এই প্রবীণ ব্রাজিলীয়ান পুরনো ফুটবলের এখনও খবর রাখেন বলে মনে হচ্ছে। ভদ্রলোক জানালেন, ৬২’র বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিফাইনালে ব্রাজিল থেকে যাওয়ার পথে তাদেরকে চিলিয়ানদের তরফে হাজারো বিড়ম্বনা সইতে হয়েছিল। ব্রাজিলের কাছে ৪-২ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছিল চিলি। সেই সেমিফাইনালের ম্যাচের সাক্ষীর কাছ থেকে জানা গেল খেলাটিতে আহত হয়েছিলেন পেলে। ব্রাজিলের আরেক ফুটবল কিংবদন্তি গ্যারিঞ্চা সেমিফাইনালের চারটির মধ্যে গোলের মধ্যে দুই গোল করেছিলেন। দারুণ ফুটবল খেলেছিলেন তিনি। গ্যারিঞ্চা তার আত্মজীবনীতে খেলাটি নিয়ে জানিয়েছিলেন যে, চিলিয়ানদের আক্রমণে তার মাথায় সেলাই দিতে হয়েছিল। তিনি লেখেন, ‘দর্শকদের কাছে থেকে খুবই বাজে ব্যবহার পেয়েছিলাম। আমার সাথে দুর্ব্যবহার করেছিল চিলিয়ানরা। পেলের সাথেও খারাপ আচরণ করেছিল।’
সেই ম্যাচের সাক্ষী অরল্যান্ডো বলেন, ‘ওই ম্যাচটা আমাদের জন্য ঐতিহাসিক একটি অধ্যায়। আমরা কখনো চিলিয়ানদের ক্ষমা করবো না। কারণ চিলিয়ানরা সেদিন ওদের নিজেদের মাঠে আমাদের ফুটবল যোদ্ধাদের উপর আঘাত করেছিল।’ ক্ষীপ্ত এই প্রবীণের ক্ষোভ দেখে সহজেই অনুমেয় ব্রাজিলের এবং চিলির ফুটবল সম্পর্কটা ভালো না। দুই দেশের ফুটবলে শত্রুতার সম্পর্ক। ব্রাজিল যখন চিলিতে খেলতে যেতো, সেখানে সমর্থকরা কোনো না কোনোভাবে চিলির সমর্থকদের আক্রমণের শিকার হতেন। চিলির সমর্থকরা একটু উগ্রই বটে। এবারও তো ব্রাজিলে এসে কিছু চিলিয়ানরা জোর করে রিও ডি জেনেরিওর মারাকানা স্টেডিয়ামের মিডিয়া সেন্টারে ঢুকে পড়েছিলেন। ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন তাদের সমর্থকদের চিলিয়ানদের প্রতি সহযোগিতাপূর্ণ আচরণের আহবান জানিয়েছেন। সরকার মনে করছে আজকের ম্যাচে চিলিয়ানদের সাথে ব্রাজিলীয়ানদের মধ্যে সংঘর্ষ হতে পারে। কোনোভাবেই যেন এমনটা না হয় সেদিকে কড়া নজর রাখতে অনুরোধ জানিয়েছে ফিফা। ব্রাজিল ফেডারেল পুলিশ আজ বেলে হরিজোন্তের মিনেরো স্টেডিয়ামের প্রত্যেকটা পথ নজর রাখবে।
মুখোমুখি
দুই দল
* বিশ্বকাপে এর আগে চিলির সঙ্গে তিনবার মুখোমুখি লড়াইয়ে সবক’টিতেই জয় পেয়েছে ব্রাজিল।
* ১৯৯৮ এবং ২০১০ সালের বিশ্বকাপেও দ্বিতীয় রাউন্ডে মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল-চিলি। এরমধ্যে ’৯৮ সালে ৪-১ এবং গত বিশ্বকাপে ৩-০ গোলে হারে চিলি।
* বিশ্বকাপে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে সর্বশেষ চার ম্যাচের সবক’টিতেই হেরেছে চিলি। তিনটি হারই ব্রাজিলের বিপক্ষে।
* স্বাগতিক ব্রাজিলকে কখনোই হারাতে পারেনি চিলি। ব্রাজিলের মাটিতে দু’দলের ২৬টি লড়াইয়ের মধ্যে ২০টিতেই জিতেছে ব্রাজিল, ছয়টি হয়েছে ড্র।