কুমিল্লায় ইভটিজিংয়ে অতিষ্ঠ ছাত্রীরা

অনেকের স্কুল-কলেজে যাওয়া বন্ধ কুমিল্লা শহরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার রাস্তা-ঘাট ও অলি-গলিতে বখাটেদের উত্পাত বেড়েই চলেছে। এসব বখাটে ও মাস্তান স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসাগামী ছাত্রীদের প্রকাশ্যে উত্ত্যক্ত করছে। তাদের হাত থেকে রেহাই পেতে অনেক ছাত্রী বোরখা পরে যাচ্ছে স্কুল-কলেজে। এমনকি হিন্দু ছাত্রীরাও বোরখা পরে স্কুল-কলেজ, কোচিং ও প্রাইভেট টিউটরের কাছে আসা-যাওয়া শুরু করে দিয়েছে। বখাটেদের উত্পাতে অভিভাবকসহ শিক্ষকদের প্রতিনিয়ত উত্কণ্ঠায় থাকতে হচ্ছে। অনেক ছাত্রীকে তার পরিবার স্কুল-কলেজে যেতে দিচ্ছে না। কুমিল্লা মহানগরীতে রয়েছে দেশের নামকরা অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, কুমিল্লা সরকারি কলেজ, কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ, কুমিল্লা মহিলা মহাবিদ্যালয়, অজিতগুহ মহাবিদ্যালয়, কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড মডেল কলেজ, ইবনে তাইমিয়া স্কুল এন্ড কলেজ, নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কুমিল্লা মডার্ন হাইস্কুল, আওয়ার লেডি অব ফাতিমা গার্লস হাইস্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অসংখ্য ছাত্রী লেখাপড়া করছে। এছাড়া রয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ, ল্যাবরেটরি হাইস্কুল, বেসরকারি মেডিক্যাল ও কারিগরীসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পায়ে হেঁটে বা রিকশা ও অটোরিকশায় চড়ে অনেক ছাত্রী আসা-যাওয়া করে থাকে। সূত্র জানায়, নগরীর অর্ধশতাধিক স্পটে এসব বখাটের উত্পাতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন অভিভাবক ও তাদের স্কুল-কলেজগামী মেয়েরা। কয়েকজন অভিভাবকের সাথে কথা বলে জানা যায়, এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বখাটে, ছিচেক ক্যাডার ও মিনি মস্তান গ্রুপ। তারা তাদের বড় ভাইদের (এলাকার নিয়ন্ত্রক নেতা-পাতি নেতা) ছত্রছায়ায় ছিনতাই-চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি স্কুল-কলেজগামী ছাত্রীদের বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করে থাকে। পাড়া-মহল্লার বিভিন্ন রাস্তায় ও অলি-গলিতে ছাত্রী ও কিশোরী মেয়েদের দেখামাত্র সামনে-পেছনে অবস্থান নিয়ে মুখে শীষ বাজানো, অঙ্গভঙ্গি ও হই-হুল্লোড় করা, অশালীন কথা বলা, মোবাইল ফোনে ছবি তোলা, ভিডিও চিত্র ধারণসহ বিভিন্নভাবে হয়রানি করে থাকে। নগরীর হিন্দু সম্প্রদায়ের এক কলেজ ছাত্রীর অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘বখাটেদের উত্পাত এড়াতে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে কলেজে পৌঁছে দিতে হয়। মেয়েকে বোরখা কিনে দিয়েছি, মাঝে-মধ্যে কর্মব্যস্ততার জন্য সঙ্গে যেতে না পারলে মেয়ে বোরখা পরে একা কলেজে যায়। এতেও টেনশনে থাকতে হয়।’ নগরীর প্রায় প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে উঠতি বয়সের এসব বখাটেদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়। কয়েকজন শিক্ষক ও অভিভাবক জানান, বিশেষ করে সকাল ৯টা থেকে ১১টা ও বিকাল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত বিভিন্ন স্পটে বখাটেদের উত্পাতের কারণে ছাত্রীদের নিয়ে তাদেরকে উত্কণ্ঠায় থাকতে হয়। জেলার দেবিদ্বারের ফতেহাবাদ গ্রামে ইভটিজিংয়ে বাধা দেয়ায় গত ৪ জুন বখাটেদের হামলায় হিন্দু পরিবারের ৫ জন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। বরুড়া উপজেলার বড় কৈয়ানী উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে বিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী তারাপুকুরিয়া গ্রামের সবুজ নামে এক বখাটে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করত। এ ঘটনার প্রতিবাদ করায় গত বছরের ২৩ জুন ইভটিজারদের হামলায় ৩ জন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। অপরদিকে জেলার ব্রাহ্মণপাড়ায় মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী কলেজের এক ছাত্রীকে ইভটিজিংয়ে বাধা দেয়ায় গত বছরের ২৮ জুলাই ইভটিজারের হাতে কলেজ অধ্যক্ষ আলতাফ হোসেন লাঞ্ছিত হন। জেলার মুরাদনগর উপজেলা সদরের বাজার থেকে গোমতী বেড়িবাঁধ হয়ে ভুবনঘর-দড়িকান্দি রাস্তার পাশে বেশিরভাগ সময় এলাকার উঠতি বয়সী বখাটেরা স্কুল-কলেজগামী মেয়েদেরকে উত্ত্যক্ত করে থাকে। পথে পথে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার এমন ঘটনা অন্যান্য উপজেলা এলাকায়ও কম-বেশি ঘটছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল জানান, জেলা সদরসহ উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে সাজা প্রদানসহ জরিমানা আদায় করা হয়েছে। জেলা-উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির জন্য শিক্ষক-অভিভাবকসহ সমাজের সকল মহল সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসলে এটি প্রতিরোধ সম্ভব।