গল্প-কথায় পদার্থবিজ্ঞান

মাধব রায় সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিদ্যা) ব্লু-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট গতিসূত্র পর্ব ১২ নীলকান্তবাবু বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছেন আর পত্রিকা পড়ছেন। আজ অফিস বন্ধ। কমলা এসে দাঁড়ালেন তাঁর পাশে,কিছু বলছেন না। নীলকান্তবাবু বুঝতে পারলেন কমলা রেগে আছেন। রাগলে তিনি সাধারণত চুপ করে থাকেন। নীলকান্তবাবু বললেন —কী হয়েছে কমলা, মন খারাপ করে আছো কেন ? কমলা বললেন— তোমাকে বলেছিলাম এদেরকে মার্বেল কিনে দিও না। আজ সারাটা দিন একটুও বই নিয়ে বসেনি। ও, তাই বুঝি ? নীলকান্তবাবু হাসলেন। দাঁড়াও আমি দেখছি, বলে তিনি উঠলেন। কমলা মনে মনে খুশি হলেন। কিছুক্ষণ পরও যখন ছেলেমেয়েদেরকে নিয়ে নীলকান্তবাবু ফিরলেন না, তখন কমলা বাইরে এসে যা দেখলেন,তাতে তাঁর মাথা খারাপ হবার জোগাড়। আকাশ, অণু, চন্দ্রা, কণিকা, রেখা, বিন্দু সবাইকে নিয়ে নীলকান্তবাবু নিজেই মার্বেল খেলতে লেগে গেলেন। কমলার হাসি পেলো। তিনি দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন। প্রায় দুই মিটার দূরত্বে দুটো দাগ দেয়া আছে। একটা দাগে পা রেখে আকাশ বেশ কয়েকটা মার্বেল ছড়িয়ে দিলো। মার্বেলগুলো স্থির হবার পর কণিকা একটা মার্বেল দেখিয়ে দিলো। আকাশকে আরেকটা মার্বেল ছুঁড়ে কণিকার দেখিয়ে দেয়া মার্বেলটাকে আঘাত করতে হবে ওই দাগের বাইরে থেকে। আকাশ ওই মার্বেলটাকে টোকতে (আঘাত করতে) পারলে এই দানটা সে জিতে নিবে। আকাশ প্রথম দাগের বাইরে থেকে এটি টোকে নিলো। সবগুলো মার্বেল তার হয়ে গেলো। নীলকান্তবাবু হাততালি দিয়ে বললেন— এটিই নিউটনের গতিসূত্র। আকাশ অবাক হয়ে বললো— এটি কীভাবে নিউটনের গতিসূত্র মামা ? নীলকান্তবাবু বললেন— নিউটনের গতিবিষয়ক প্রথম সূত্র হলো, বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু স্থির থাকবে, আর গতিশীল বস্তু একই পথে চলতে থাকবে। তা তো বুঝলাম। কিন্তু মার্বেল খেলা কীভাবে নিউটনের গতিসূত্র হলো ? শোন, বলছি। তুই মার্বেলটাকে টোকার আগে এটি স্থির ছিলো। তুই টোকতে পারলি মানে বল প্রয়োগ করলি। এতে ওই মার্বেলটি দৌড়ে গেলো, বল প্রয়োগে গতিশীল হলো। টোকার আগে তো এটি স্থির ছিলো। তার মানে হলো বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু স্থির থাকবে। আর গতিশীল বস্তু চলমান থাকবে। কিন্তু মামা, আমি টোকে ফেলার পরও তো মার্বেলটা কিছু দূর গিয়ে থেমে গেলো। নিউটন তো বলেছেন বল প্রয়োগ না করা হলে গতিশীল বস্তু গতিশীল থাকবে। কেউ তো মার্বেলকে আটকায়নি, তবে এটি থামলো কেন? নীলকান্তবাবু বললেন— তুই ঠিকই বলেছিস। বল প্রয়োগ না করা হলে গতিশীল বস্তু চলতেই থাকতো। মার্বেলটাও সবসময় চলতে থাকার কথা। কিন্তু মার্বেলটা তো মাটিতে গড়িয়ে চলেছে, তাই না ? হ্যাঁ, বললো আকাশ। তাহলে মাটির ঘর্ষণ বল মার্বেলকে আটকে ফেলেছে, বাতাসও বাধা দিয়েছে। বুঝলি ? মাটির ঘর্ষণ আর বাতাসের বাধা না থাকলে এটি চলতেই থাকতো। আকাশ কিছু বলছে না। সে বুঝে ফেলেছে। কণিকা বললো— কিন্তু নিউটনের গতিবিষয়ক সূত্র তো তিনটি, দ্বিতীয়টি বলো। দ্বিতীয়টি হলো ভরবেগ সংক্রান্ত। ভরবেগ তো বলেছি, তাই না ? কণিকা মাথা নাড়লো। ভরবেগ তার মনে আছে। নীলকান্তবাবু বললেন— বল প্রয়োগে বেগের পরিবর্তন হয়, ফলে ভরবেগেরও পরিবর্তন হয়। এক সেকেন্ডে এই ভরবেগের যে পরিবর্তন হয়, তাকে বলি ভরবেগের পরিবর্তনের হার। যত বেশি বল প্রয়োগ করা হবে, ভরবেগের পরিবর্তনের হারও তত বেশি হবে। বুঝলাম না —বললো আকাশ। তুই মার্বেলটাকে যত জোরে টোকবি, সেটি তত জোরে দৌড়াবে —বললেন নীলকান্তবাবু। অর্থাত্ যত জোরে আঘাত করবি, মার্বেলের বেগ এবং ভরবেগ তত বাড়বে। তার মানে বল প্রয়োগ যত বেশি হবে, ভরবেগের পরিবর্তনের হারও তত বেশি হবে। একেই বলে ভরবেগের পরিবর্তনের হার প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক। আকাশ বললো— বুঝেছি। তাহলে তৃতীয় সূত্র কোনটি ? নীলকান্তবাবু বললেন— তুই যখন মার্বেলটাকে টোকলি, তখন তোর ছুঁড়ে মারা মার্বেলটা কোন দিকে গেলো ? পিছন দিকে, বললো আকাশ। নীলকান্তবাবু বললেন— এটিই তৃতীয় সূত্র। বুঝিয়ে বলো। বললো চন্দ্রা। মার্বেল ছুঁড়ে মেরে টোকার সময় সেটি মাটির স্থির মার্বেলকে আঘাত করে বল প্রয়োগ করলো। মাটির স্থির মার্বেলটাও একে সমান ও বিপরীতমুখী বল প্রয়োগ করলো। ফলে এটি পিছিয়ে এসেছে। তুই যখন ছুঁড়ে মারলি, সেটি হলো ক্রিয়া, আর মাটির স্থির মার্বেলটা তোরটাকে বিপরীত দিকে ফিরিয়ে দিলো। এটি হলো প্রতিক্রিয়া। এটি সবক্ষেত্রে হবে মামা ? বললো চন্দ্রা। হ্যাঁ, প্রত্যেক ক্ষেত্রেই। প্রত্যেকটি ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। এটিই নিউটনের তৃতীয় সূত্র। সব ক্ষেত্রেই আছে ? আকাশ অবাক হলো ! হ্যাঁ, সব ক্ষেত্রেই আছে। এই যে আমরা মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছি, এটিও তৃতীয় সূত্রের ফল। কমলা এসেছিলেন রাগ নিয়ে, নীলকান্তবাবু’র ব্যাখ্যা শুনে তিনিও অবাক হয়ে গেলেন। বললেন তুমি সবকিছুতেই ফিজিক্স টেনে আনো। আমরা দাঁড়িয়ে আছি, এটি কীভাবে তৃতীয় সূত্র ? নীলকান্তবাবু বললেন— আমরা দাঁড়িয়ে থেকে মাটিতে আমাদের ওজনের সমান বল প্রয়োগ করছি, এটি হলো ক্রিয়া। মাটিও সমপরিমাণ বল ওপর দিকে প্রয়োগ করছে, এটি প্রতিক্রিয়া। এই দুটোই সমান এবং বিপরীত। সমান না হলে কী হতো ? কমলার প্রশ্ন। যদি আমরা মাটিতে বেশি বল প্রয়োগ করতাম, তাহলে মাটির গর্তে তলিয়ে যেতাম, সাগরের তীরে চোরাবালিতে যে ঘটনা ঘটে। চোরাবালি মানুষের ওজনের সমান বল ফিরিয়ে দিতে পারে না। ফলে মানুষ তলিয়ে যেতে থাকে। আর মাটি বেশি বল প্রয়োগ করলে কী হতো ? কণিকা জিজ্ঞেস করলো। মাটি বেশি বল প্রয়োগ করলে আমরা লাফিয়ে উপরে উঠে যেতাম। কমলা বললেন— ঠিক আছে, আর খেলতে হবে না। এবার সবাই বাসায় চলো। হ্যাঁ চলো —বললেন নীলকান্তবাবু। সবগুলো মার্বেল গুটিয়ে নিয়ে এরা চলে এলো বাসায়।