ব্রাজুকায় বাড়লো গোল
প্রকাশ : ২৮ জুন ২০১৪, ২১:১৪
বিশ্বব্যাপী ফুটবল দর্শকদের কাছে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ গোল। ১৯৭০ সালের পর অন্য যে কোন বিশ্বকাপের তুলনায় এবার ব্রাজিলের আসরটিতে অনেক বেশি গোল হচ্ছে। তাতে দর্শকদের তুষ্টি মিটছে অনেকখানি। এ নিয়ে চলছে আলোচনা। তবে এত বেশি গোলের কারণ হিসাবে অনেকেই কৃতিত্ব দিচ্ছেন নতুন ডিজাইনের বল ব্রাজুকাকে।
ব্রাজিল বিশ্বকাপে প্রতিযোগিতার প্রথম ৪৮ খেলায় গোল হয় ১৩৬টি। প্রতি খেলায় গড়ে ২.৮৩টি করে গোল হয়েছে। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডে গোল হয়েছিল ১০১টি। গড় হিসেবে খেলা প্রতি ২.১টি গোল। ২০০৬ সালে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ৪৮ খেলায় গোল হয়েছিল ১১৭টি। ম্যাচ প্রতি গড়ে ২.৪। ২০০২ সালে জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপে একই সময়ে গোল হয়েছিল ১৩০টি। প্রতি খেলায় গড়ে ২.৭ গোল। আর ফ্রান্স বিশ্বকাপে প্রথম রাউন্ডে মোট গোল হয়েছিল ১২৬টি। প্রতি ম্যাচে গড়ে ২.৬টি গোল হয়েছিল।
এই বিশ্বকাপে গোলের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে অনেকেই গোল বিস্ফোরণ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। এ ব্যাপারে অনেক তত্ত্ব পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে আছে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় খেলাটির মান বাড়ার বিষয়টিও। এমএলসকারডটকমের প্রতিবেদক বেঞ্জামিন বায়েরের ব্যাখ্যা হলো সাম্প্রতিক বিশ্বকাপগুলোয় ট্রফি জয়ের জন্য রক্ষণভাগকে জোরদার করাই ছিল প্রাথমিক কৌশল। সর্বশেষ চারটি বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়নরা সাত খেলায় কেবল দুটি গোল হজম করে। বায়েরের মতে-‘তখনকার তত্ত্বটা ছিল সেরা রক্ষণভাগই জয়ী হবে। অনেক ক্ষেত্রে সেটাই সঠিক হয়েছে।’
এবারের বিশ্বকাপে আবার দলগুলো বেশি আক্রমণাত্মক হওয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ব্যাপারে অনেক গবেষণার পর কৌশল নির্ধারণ করা হয়। তাও আবার দিন বিশেষে আলাদা কৌশল নেয়া হয় গোল পাওয়ার জন্য। বায়েরের মতে, কোন সন্দেহ নেই যে এবারের বিশ্বকাপ হবে এক দশকের মধ্যে অন্যতম সর্বাধিক গোলের আসর এবং শিহরণ জাগানো টুর্নামেন্ট।
এবার বেশি গোল হওয়ার পেছনে আরো একটি ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। এ ব্যাখ্যার আলোকে বলা হচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপে গোলের সংখ্যা বাড়ার কারণ ব্রাজুকা নামের অফিসিয়াল বলটি।
এবিসি নিউজের মতে এবারের বিশ্বকাপের বল ব্রাজুকা আগের বিশ্বকাপগুলোর বল থেকে একেবারেই ভিন্ন প্রকৃতির। অতীতের বলগুলোর ডিজাইনে সাধারণত ৩২টি ষড়ভূজের প্যাচ ব্যবহার করা হতো। কিন্তু ব্রাজুকায় রয়েছে মাত্র ৬টি প্যাচ। সেগুলোকে ভেতর দিয়ে সেলাই দিয়ে মিলিয়ে দেয়া হয়েছে। বাইরের অংশে কোন সেলাই নেই। এই বৈপ্লবিক কৌশলের কারণে এটি হচ্ছে ইতিহাসের সবচাইতে ভাল অ্যারোডাইনামিক বল। এ কারণেই ব্রাজুকায় খেলার সুবাদে চলতি বছরের বিশ্বকাপে গোলের সংখ্যা বেড়েছে। এবিসি নিউজের মতে ব্রাজুকাই হলো সবচাইতে আধুনিক ফুটবল বল।
এমনকি ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে ব্যবহূত ‘জাবুলানি’র থেকেও বেশি কার্যকরি হয়েছে ব্রাজুকা। অ্যাডিডাস ট্যাঙ্গো ১২ সিরিজের উন্নত সংস্করণ ব্রাজুকার মোট ওজন ৪৩৭ গ্রাম এবং পরিধি ৬৯ সেন্টিমিটার। এবিসি নিউজের মূল্যায়নে এখন পর্যন্ত তৈরি হওয়া বলগুলোর মধ্যে ব্রাজুকাই সবচেয়ে উন্নত ধরনের বল। খেলোয়াড়রা খুব সহজে বল নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে এবং যেখানে পাঠাতে চাইছে সেখানেই যাচ্ছে বলে গোলের সংখ্যা বেড়ে গেছে।
ব্রাজুকা নামটি এসেছে ব্রাজিলীয়দের এক অভিব্যক্তি থেকে যার অর্থ হলো জীবনের আনন্দ। সিএনএন এর প্রতিবেদক সারাহ হল্ট জানিয়েছেন, আর্জেন্টিনা ও স্পেন জাতীয় দলের পাশাপাশি জার্মানির বুন্দেশলিগায় এবং ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগেও ব্রাজুকার পরীক্ষা হয়। সাও পাওলো থেকে শুরু করে যুক্তরাজ্যের রকি পর্বতমালায়ও পরীক্ষা করা হয়েছে ব্রাজুকার। অনেক বেশি উচ্চতায় বায়ুচাপের পরিবর্তন হলে কোন রকম প্রভাব পড়ে কীনা তা-ও পরীক্ষা করা হয়েছে। ভিন্ন মৌসুম, ভিন্ন জলবায়ু, ভেজা কিংবা ঝড়ো দমকা হাওয়ার মধ্যেও বলটি পরীক্ষা করা হয়েছে।
এতোভাবে পরীক্ষা পরে দেখা গেছে ব্রাজুকা দ্রুত ভেসে চলতে সক্ষম, অনেক বেশি নিখুঁত শট নেয়া যায় এই বলে। এছাড়া বল নিয়ন্ত্রণ করতে এবং পাস দেয়ার ক্ষেত্রেও খুব কার্যকরি ব্রাজুকা। এসব কারণে এবারের বিশ্বকাপে গোলের সংখ্যা বেড়ে গেছে।
হল্টের মতে, ইতিহাসের যে কোন সময়ের বলের তুলনায় ভালভাবে পরীক্ষিত ব্রাজুকা। ১৯৭০ সাল থেকে বিশ্বকাপে বল সরবরাহ করে আসছে অ্যাডিডাস। তাদের সরবরাহকৃত ব্রাজুকা পাকিস্তানের শিয়ালকোটভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ফরোয়ার্ড স্পোর্টসে তৈরি হয়েছে। ব্রাজুকা তৈরির পর অ্যাডিডাস এটিকে তিনটি মহাদেশে পাঠায়। প্রায় ১২টি দেশের পাঁচ শ’য়ের বেশি খেলোয়াড় খেলে ব্রাজুকা বল দিয়ে। বল তৈরির পর নাম নির্ধারণ করার জন্য অ্যাডিডাস এবং ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের পক্ষ থেকে ব্রাজিলের সাধারণ মানুষের মতামত নেয়া হয়। বলটির নাম নির্বাচনে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ মতামত প্রকাশ করে যেখানে ৭৭.৮ ভাগ ব্রাজুকার পক্ষে রায় দেয়।