বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি ক্যাম্পাস
প্রকাশ : ২৮ জুন ২০১৪, ২২:৫৬
বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। এখন থেকে পাঁচ কোটি টাকা জমানত ও নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বাংলাদেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস বা স্টাডি সেন্টার করা যাবে। এর ফলে নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে পরিচালিত বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা, স্টাডি, লার্নিং, রিক্রুটিং সেন্টারসহ এ সংক্রান্ত সকল প্রতিষ্ঠান আইনের আওতায় আসবে। ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত একটি নীতিমালাও জারি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নীতিমালা লঙ্ঘন করলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের মতোই পাঁচ বছর কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডের বিধান রয়েছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের নির্দেশনার আলোকে তৈরি বিধিমালার গেজেট জারি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের শাখা ক্যাম্পাস বা স্টাডি সেন্টার পরিচালনা বিধিমালা-২০১৪ শীর্ষক এই বিধিমালার ফলে বিদেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার নামে দেশে যে অবৈধ শিক্ষা-বাণিজ্য চলছে তা বন্ধ হবে বলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
২০১০ সালের ১৮ জুলাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ শীর্ষক আইনের ৩৯ ধারা অনুযায়ী সরকারের বাংলাদেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়নের কথা ছিল। কিন্তু কতিপয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকের বাধার কারণে এই দীর্ঘ সময় বিষয়টি ঝুলে ছিল। দেশে বহুদিন ধরেই অবৈধ প্রক্রিয়া বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা, স্টাডি সেন্টার বা কোচিং সেন্টার, আঞ্চলিক কেন্দ্র ও ক্যাম্পাস পরিচালিত হয়ে আসছিল। তাদের ব্যাপারে কোনো আইন বা বিধিমালা না থাকায় চলছিল অনেকটা লাগামহীনভাবেই। এমন পরিস্থিতিতে ২০০৭ সালের জুলাই মাসে সরকার ৫৮টি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা তাদের ক্যাম্পাস পরিচালনা অবৈধ ঘোষণা করে। এরপর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে।
নতুন এই বিধিমালা অনুযায়ী, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে শাখা ক্যাম্পাস ও স্টাডি সেন্টার পরিচালনা করা যাবে। অনুমতির জন্য নির্ধারিত শর্ত মেনে আবেদন করতে হবে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাসের জন্য ১০ লাখ টাকা ও স্টাডি সেন্টারের জন্য তিন লাখ টাকা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অনুকূলে অনুমতিপত্রের জন্য নিবন্ধন ফি দিতে হবে।
শাখা ক্যাম্পাসের জন্য পাঁচ কোটি টাকা নিজ প্রতিষ্ঠানের নামে সংরক্ষিত তহবিলে এবং স্টাডি সেন্টারের জন্য এক কোটি টাকা জমা রাখতে হবে। বিধিমালা অনুযায়ী, অনুমতির জন্য শাখা ক্যাম্পাস স্থাপন ও পরিচালনার জন্য নিজস্ব অথবা ভাড়া করা ভবনে কমপক্ষে ২৫ হাজার বর্গফুট জায়গা কাভার্ড এরিয়া থাকতে হবে। আর স্টাডি সেন্টারের জন্য নিজস্ব অথবা ভাড়া করা ভবনে ন্যূনতম ১০ হাজার বর্গফুট জায়গা থাকতে হবে। এছাড়া অন্যূন ১ হাজার ৫শ বর্গফুটের লাইব্রেরি (অন্যূন ২ হাজার ভলিউমসহ) থাকতে হবে। প্রত্যেক বিভাগ ও প্রোগ্রামে নির্ধারিতসংখ্যক পূর্ণকালীন শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। আর খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ করলে তার সংখ্যা মোট শিক্ষকের এক তৃতীয়াংশের বেশি হতে পারবে না।
শাখা ক্যাম্পাস পরিদর্শনের জন্য ২ লাখ ও স্টাডি সেন্টার পরিদর্শনের জন্য ১ লাখ টাকা ফি দিতে হবে। শর্ত ভঙ্গ করলে অনুমোদন বাতিল বা স্থগিত করা হবে। সাময়িক অনুমতির মেয়াদ হবে সাত বছর। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কিত কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত একটি পরিকল্পনা থাকতে হবে। কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত তিন সদস্যের একটি বোর্ড অব ট্রাস্টিজ থাকতে হবে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের শাখা ক্যাম্পাস ও স্টাডি সেন্টারে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কোন ব্যক্তিকে শর্তসাপেক্ষে শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারি হিসাবে নিয়োগ দেয়া যাবে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ব্যক্তিকে শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারি হিসাবে নিয়োগ করতে চাইলে কমিশনে তাদের জীবনবৃত্তান্ত জমা দিতে হবে। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রত্যেক শাখা ক্যাম্পাস বা স্টাডি সেন্টারে একটি অভ্যন্তরীণ গুণগত মান নিশ্চিতকরণ সেল বা ইউনিট থাকবে।
বিধিমালা অনুযায়ী কম্পিউটার সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকৌশল বিষয় থাকলে প্রতি পাঁচজন ছাত্রের জন্য একটি কম্পিউটার থাকতে হবে। ক্যাম্পাসের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারির সাথে সম্পাদিত চুক্তিনামা ও নিয়োগপত্রের কপি কমিশনে জমা দিতে হবে। শিক্ষার্থী ফি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার মানদণ্ডে নিরূপিত এবং তা ইউজিসিতে জমা দিতে হবে। পরীক্ষা মূল্যায়নে কমিশনের পূর্বানুমোদনসাপেক্ষে নিজ নিজ মূল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রেডিং নীতি অনুসরণ করা যাবে। খরচের সার্বিক পুস্তিকা থাকবে, যা ওয়েবসাইটে প্রকাশ ও ইউজিসিতে জমা দিতে হবে।
তবে এই বিধিমালার বিরোধিতা করছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকদের একটি অংশ। এ বিষয়ে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আবুল কাসেম হায়দার সাংবাদিকদের বলেছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অব্যাহত আপত্তি উপেক্ষা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একতরফাভাবেই একটি নীতিমালা করা হয়েছে। আমরা এ নীতিমালার ড্রাফট চেয়েছিলাম তা দেয়া হয়নি। এ নীতিমালা জারি হলে দেশের উচ্চ শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বার উন্মোচিত হবে। দেশে অবাধে এবং সরকারি অনুমতিসাপেক্ষে সার্টিফিকেট বাণিজ্য শুরু হবে। তবে বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যান এমকে বাশার বলেছেন, যারা গোপনে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনা করছেন তারাই এই বিধিমালার বিরোধিতা করছেন। তাদের এখন নীতিমালার আওতায় আসতে হবে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস বা স্টাডি সেন্টারগুলোতে পড়াশোনা করে শিক্ষার্থীরা বিদেশের নামকরা প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগের পাশাপাশি সারা বিশ্বের চাকরি বাজারে প্রবেশের অবাধ সুযোগ পাবে।