আট উপজেলা হাসপাতালে অস্ত্রোপচার বন্ধ
আবুল খায়ের ও ফজলে এলাহী স্বপন
প্রকাশ : ২৯ জুন ২০১৪, ২১:৪৩
দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে জনবল সঙ্কটসহ নানা কারণে চিকিত্সাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলা সদর হাসপাতাল ও ৮ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৭৭ জন চিকিত্সকের মধ্যে মাত্র ৫৯ জন কর্মরত রয়েছেন। বাকি ১১৮টি পদ বহুদিন ধরে শূন্য। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ৪৯ জনের স্থলে মাত্র ৬ জন কর্মরত। তবে ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিসহ সুসজ্জিত অপারেশন থিয়েটার থাকলেও শুধু সার্জন ও অজ্ঞানকারী চিকিত্সকের অভাবে জেলার আট উপজেলা হাসপাতালে ৬ মাস থেকে ২ বছর ধরে অপারেশন বন্ধ রয়েছে। এতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন রোগীরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালগুলোতে এক্সরে মেশিনসহ পরীক্ষা-নিরীক্ষার সকল ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বেশিরভাগ যন্ত্র বাক্সবন্দি কিংবা তালাবন্ধ অবস্থায় অব্যবহূত পড়ে রয়েছে। টেকনেশিয়ান না থাকায় এসব যন্ত্র ব্যবহার হচ্ছে না কোন হেলথ কমপ্লেক্সেই। কোন কোন হেলথ কমপ্লেক্সে পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্র চালু থাকলেও কমিশনের লোভে রোগীদের বাইরের ক্লিনিকে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। এছাড়া এসব হাসপাতালে শতাধিক জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সরকারিভাবে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। কিন্তু রোগীদের মধ্যে মাত্র ২ থেকে ৪ ধরনের ওষুধ দেয়া হয়। বাকি ওষুধ নিয়মিত পাচার হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালে সরবরাহ করা রোগীদের খাবারের মানও নিম্নমানের। জেলার চিকিত্সা ব্যবস্থার এ করুণ অবস্থা যেন দেখার কেউ নেই।
এ ব্যাপারে সদ্য যোগদান করা কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. জয়নাল আবেদীন জিল্লু স্বীকার করেন, সদরসহ জেলার সবগুলো হাসপাতালে চিকিত্সকসহ মারাত্মক জনবল সঙ্কট থাকায় চিকিত্সাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। এরপরও স্বল্প জনবল দিয়েই চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, আমি মাত্র দুইমাস হলো দায়িত্ব নিয়েছি। চিকিত্সকদের শূন্যপদ পূরণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী জুলাই-আগস্ট মাস নাগাদ একটা সমাধান পাওয়া যাবে। রোগীদের খাদ্য মানসম্মত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে তিনি জানান।
খুঁড়িয়ে চলছে সদর হাসপাতাল: হাসপাতালটিতে সিনিয়র কনসালট্যান্ট মেডিসিন ও চক্ষু, জুনিয়র কনসালট্যান্ট অর্থো-সার্জারী, প্যাথলজি ও ডেন্টাল সার্জন নেই। ৪২ জন চিকিত্সকের মধ্যে ১৬ জন কর্মরত থাকলেও ২৬টি পদই রয়েছে শূন্য। বহির্বিভাগে রোগীর চাপের তুলনায় চিকিত্সক সঙ্কট থাকায় প্রায় সময়ই রোগীদের ফিরে যেতে হয়। উপজেলা পর্যায়ে ডিজিটাল এক্সরে মেশিন থাকলেও সদরের হাসপাতালটিতে তা নেই। রোগীদের অভিযোগ, যে কয়জন ডাক্তার রয়েছেন তারা সময়মত রোগী দেখেন না। তারা বেশীরভাগ সময় রেস্টরুমে ও বিভিন্ন ট্রেনিং-মিটিং এ ব্যস্ত থাকেন।
ফুলবাড়ী হাসপাতালে ২৩টি পদ শূন্য: ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে ডাক্তার-কর্মচারীর ২৩টি পদ থাকলেও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা-ইউএইচএফপিও ও মেডিক্যাল টেকনিশিয়ান (ল্যাব) ছাড়া বাকি সব পদই শূন্য রয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় ঠিকাদার নিয়োগ দেয়ায় খাদ্যর মান অত্যন্ত নিম্নমানের। সাধারণ ২/৪টি ওষুধ ছাড়া রোগীরা ওষুধ পান না।
রৌমারী হাসপাতালে মাত্র ২ জন চিকিত্সক: এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মাত্র ৬ জন চিকিত্সক থাকলেও ৩ জন ট্রেনিং-এ ও সার্জারীর ১ জন ডেপুটেশনে রয়েছেন রংপুরে। কর্মরত রয়েছেন ইউএইচএফপিওসহ মাত্র ২ জন। অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার থাকলেও অধিকাংশ সময়ই তিনি থাকেন ছুটিতে। ল্যাবরেটরী টেকনিশিয়ান থাকলেও টেস্ট হয় না। সার্জনসহ অজ্ঞানকারী ডাক্তার না থাকায় অপারেশন হয় না। খাদ্যের মান নিম্নমানের। অধিকাংশ জীবন রক্ষাকারী ওষুধ রোগীদের কিনতে হয় বাইরে থেকে।
উলিপুর হাসপাতালে ওটি রুমে ধুলো-বালির আস্তরণ: এই হাসপাতালে ২৬ জন চিকিত্সকের পদ থাকলেও বর্তমানে ইউএইচএফপিওসহ আছেন মাত্র ২ জন। বিকল হয়ে আছে এক্সরে মেশিন। ওটি রুমে পড়েছে ধুলো-বালির আস্তরণ। হাসপাতালটিতে উন্নতমানের যন্ত্রপাতি থাকলেও চিকিত্সকের অভাবে সেগুলোও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
নাগেশ্বরী হাসপাতালে ১৭টি পদ শূন্য: হাসপাতালটিতে ২৫ জন ডাক্তার-কর্মচারীর পদের মধ্যে ১৭টি পদই শূন্য। ইউএইচএফপিও ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ পদে কোন ডাক্তার না থাকায় রোগীরা চিকিত্সাসেবা পাচ্ছেন না। জুনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারী) ও জুনিয়র কনসালট্যান্ট (ইনেসথেশিয়া) না থাকায় অপারেশন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন।
রাজারহাট হাসপাতালে মাত্র ৩ জন চিকিত্সক: রাজারহাট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে ১৬ জন ডাক্তার থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছে ইউএইচএফপিওসহ মাত্র ৩ জন। অজ্ঞান করার ডাক্তার না থাকায় ও অপারেশন থিয়েটারের টেবিল-লাইটসহ পর্যাপ্ত সরঞ্জামাদি না থাকায় বর্তমানে অপারেশন বন্ধ রয়েছে।
ভুরুঙ্গামারী হাসাপাতালেও ৩ জন চিকিত্সক:মাত্র ৩ জন চিকিত্সক দিয়ে চলছে ভুরুঙ্গামারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সার্জারী চিকিত্সক না থাকায় অপারেশন হয় না। ডাক্তার ও টেকনিশিয়ানের অভাবে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষাও বন্ধ। ইউএইচএফপিও সপ্তাহে ২/১ দিন আসেন।
চিলমারী হাসপাতালে নানা সঙ্কট:বর্তমানে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে বিরাজ করছে নোংরা পরিবেশ। পর্যাপ্ত বিছানার অভাবে অনেক সময় রোগীদের মেঝেতে থাকতে হয়। ২৪ জন ডাক্তারের পদ থাকলেও কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২ জন। প্রতিমাসে মোটা অঙ্কের মাসোহারার বিনিময়ে রোগীদের নির্ধারিত প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয়।
রাজিবপুর হাসপাতালে ভোগান্তির স্বীকার রোগী: রাজীবপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সক সঙ্কট থাকায় রোগীরা নানা ভোগান্তির স্বীকার হচ্ছেন। কেউ বা চিকিত্সা না পেয়েই ফিরে যাচ্ছেন। চিকিত্সকের ৯টি পদ থাকলেও ৬টি পদ শূন্য।
এক্সরে মেশিনটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকতে থাকতে নষ্ট হয়ে গেছে। অত্যাধুনিক একটি অপারেশন থিয়েটার থাকলেও সার্জন না থাকায় সেখানে কোন অপারেশন হয় না, ফলে সেটিও নষ্ট হওয়ার উপক্রম।