নরক থেকে স্বর্গে!
প্রকাশ : ২৯ জুন ২০১৪, ২১:৫৪
রং বদল ছিল, ছিল নাটকীয়তা। একদিকে ছিল সীমাহীন উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া হূদয়ের তীব্র যন্ত্রণা। আনন্দের অশ্রু ছিল, ছিল অভাবনীয় হতাশা। এতো কিছুর মাঝে শেষ পর্যন্ত এমন একজন নায়ক হয়ে গেলেন যিনি কিনা গত মৌসুমে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় বিভাগের দলেও সুযোগ পেয়েছিলেন একটি মাত্র ম্যাচে!
জুলিও সিজার এবার নিশ্চিত ভাবেই গত এক বছরের স্মৃতি ভুলে যাবেন। আর যাই হোক, শনিবার রাতে বেলো হরিজন্তের স্ট্যাডিও মিনোইরোর মাঠে তার কীর্তি যে বেঁচে থাকবে আজীবন। শুধু সিজার নন, রোমাঞ্চকর ম্যাচটির স্মৃতি প্রত্যেক ফুটবল প্রেমিকের মনেই দাগ ফেলার জন্য যথেষ্ট!
ব্রাজিল ও চিলির মধ্যকার নক আউট পর্বের ম্যাচটি নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় ১-১ গোলে ড্র হওয়ার পর টাইব্রেকারে গড়ায়। হেক্সা মিশনে নামা তরুণ ব্রাজিলিয়ান দলটির ওপর তখন আকাশচুম্বি চাপ, সমর্থকদের মনে তখন ছিটকে পড়ার উত্কণ্ঠা।
গ্যালারির উচ্ছ্বাস যেন হঠাত্ই থমকে গেল। উত্সবমুখর পরিবেশের জায়গাটা দখল করে নিলো সম্মিলিত অস্ফুট আওয়াজ। কি হতে যাচ্ছে? সবার চোখে মুখে উত্কণ্ঠা। কি হতে যাচ্ছে? ব্রাজিল কি তাহলে এতো আগেই বিদায় নেবে? মাঠেও যেন ছুঁয়ে গেল আবেগ। খেলোয়াড়রা একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন, কেউ প্রার্থনা করলেন, কে কে পেনাল্টি নেবেন সেটা নিয়েও তর্ক করতে দেখা গেল কয়েকজনকে। তবে, মূল লক্ষ্যটা একই, ব্রাজিলের জয়!
আত্মবিশ্বাসী সিজার এগিয়ে আসলেন। জনপ্রিয় কোন সিনেমায় নায়ক যেমন শেষ মুহূর্তে চলে আসেন, ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেন, ভয়াবহ কোন বিপদকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে হাসেন বিজয়ী হাসি।
এই কাজটাই করলেন সিজার। কোচ লুইস ফিলিপ স্কোলারি কানে কানে কি যেন একটা মন্ত্র দিয়ে দিলেন। সিজারও কোচের কাঁধে হাত রাখলেন। যেন বলতে চাইলেন, ‘ভয় নেই, আমি আছি না!’
আর ভরসার প্রতিদান দিলেন সিজার। মোউরিসিও পিনিয়েলার শট আটকে দিয়ে শুরু করলেন। দ্বিতীয় শটে ফিরিয়ে দিলের বার্সা তারকা অ্যালেক্সিস সানচেজের শট। মাঝে উইলিয়ান সুযোগ হাতছাড়া না করলে হয়তো ম্যাচটা সেখানেই শেষ হয়ে যায়। শেষ পেনাল্টি শট পর্যন্তই গড়ালো ম্যাচের ভাগ্য। সিজারের বীরত্বের দরকার পড়লো না এবার। গঞ্জালো জারার নেয়া শেষ শট বারে লেগে ফিরে আসে।
শুরু হয়ে গেল ব্রাজিলিয়ান উত্সব। লা রোজাদের হারিয়ে বেঁচে থাকলো ব্রাজিলের হেক্সা স্বপ্ন। জুলিও সিজারকে মাথায় তুলে নিলেন সতীর্থরা। নেইমার, ডেভিড লুইজদের ছাপিয়ে তিনিই যে ম্যাচের সবচেয়ে বড় তারকা।
তবে এই নায়ক হয়ে ওঠার পিছনের গল্পটাও যে কত ত্যাগ-তিতিক্ষায় ভরা! একটা সময় সিজার ব্রাজিলের তো বটেই ছিলেন বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষকদের একজন। ইন্টার মিলানে কাটিয়েছেন সাতটি বছর। পাঁচবার জিতেছিলেন স্কুডেট্টি। ২০০৯ ও ২০১০ সালে টানা দু’বার জিতেছিলেন সিরিএ’র সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার। ২০০৯ সালে ব্যালন ডি’অর জয়ের দৌড়েও ছিলেন তিনি। জিতেছিলেন ইউরোপ সেরা গোলরক্ষকের খেতাব। সাবেক ইতালিয়ান ও ইন্টার মিলানের গোলরক্ষক জিয়ানলুকা পাগলিউকার মতেও সেই মুহূর্তে বিশ্বসেরাদের একজন ছিলেন সিজার।
কিন্তু সব কিছু এলোমেলো করে দেয় কেবল একটি ম্যাচ। সদ্য ইন্টারের হয়ে ট্রেবল জয় করে এসেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। দ্বিতীয় পর্ব পর্যন্ত সব ঠিক ঠাক ছিল। গোল বাঁধলো কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচে এসে। ওয়েন্সলি স্নেইডারের দু’গোলে নেলসন ম্যান্ডেলা স্টেডিয়াম দেখেছিল কমলা উত্সব।
সেই থেকেই একটু করে ফুরিয়ে যেতে থাকেন সিজার। ২০১২ সালে চলে আসেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দুর্বল দল কুইন্স পার্ক রেঞ্জার্সে। দল নেমে যায় দ্বিতীয় বিভাগে। সিজার দলের জন্য এক রকম বোঝা হয়ে দাঁড়ান। ট্রান্সফার উইনডো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দল বদলানোর জন্য তাকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। ২০১৩ সালের এপ্রিল থেকে এই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ক্লাব পর্যায়ে খেলেছেন মাত্র একটি ম্যাচ।
এখন আছেন মেজর লিগ সকারের ক্লাব টরেন্টো এফসিতে। হারিয়েই গিয়েছিলেন সিজার। তারপরও তার উপরই ভরসা রেখেছিলেন কোচ স্কোলারি। কোচের ভরসার প্রতিদানও দিলেন সিজার। হয়ে উঠলেন, গোটা ব্রাজিলের ভরসার প্রতীক।