ইতিহাস গড়েও থামছে না কোস্টারিকা!

চলমান বিশ্বকাপের নক আউট পর্বের প্রথমদিন যদি হয় রোমাঞ্চকর, তাহলে দ্বিতীয়দিন ছাড়িয়ে যাবে বিশ্বখ্যাত কোন রোমাঞ্চকর চলচ্চিত্রকেও। নেদারল্যান্ড-মেক্সিকো কিংবা গ্রীস-কোস্টারিকা দুটি ম্যাচই যে আলাদা করে ছড়িয়েছে উত্তেজনা। মুহুর্মুহু খেলায় চলেছে রদবদল। এদের মধ্যে একটু আলাদা করে বলতে হয় কোস্টারিকা ও গ্রিসের মধ্যকার ম্যাচটির কথা। ম্যাচটি দিয়ে একদিক দিয়ে বিশ্বকাপই গড়লো অনন্য এক ইতিহাস। এবারই যে প্রথমবারের মতো শেষ ষোলোর দু’টি ম্যাচে টাইব্রেকার পর্যন্ত খেলা গড়ালো। মধ্য আমেরিকান ও ইউরোপিয়ান দেশের মধ্যে লড়াইয়ে হাসি ফুটলো স্থানীয়দের মধ্যেই। গ্রীসকে পেনাল্টি শ্যুট আউটে হারিয়ে কোস্টারিকা চলে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে। এখানেও হল নতুন আরেক ইতিহাস। এবারই যে প্রথম শেষ আটের টিকেট পেয়ে গেল কোস্টারিকান ফুটবলাররা। গ্রীসের বিপক্ষে গত রবিবার রেসিফের অ্যারেনা পারনামবুকোতে টাইব্রেকারে ৫-৩ গোলে জয়ী হয়ে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের শেষ আট নিশ্চিত করেছে কোস্টারিকা। কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ গতবারের রানার আপ নেদারল্যান্ড। ২০ মিনেটের খেলা ১-১ গোলে অমীমাংসিত থাকার পর ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ায়। ম্যাচের সময় গ্রিসের রক্ষণদুর্গ খুব বেশি ভাঙতে না পারলেও টাইব্রেকারে ৫-৩ গোলে জিতে ইতিহাস গড়ে মধ্য আমেরিকার দেশ কোস্টারিকা। ম্যাচ শেষে কোস্টারিকা কোচ জর্জ লুইস পিন্টো বলেন, ‘বিষয়টি এমন নয় যে, কোস্টারিকা টাইব্রেকারে গেল আর জয় নিয়ে ফিরল। সৌভাগ্যক্রমে কোনভাবেই এই জয় আসেনি। আমরা যেকোন মুহূর্তের জন্য প্রস্তুত ছিলাম। এই পরিস্থিতির জন্য নিজেদের আগে থেকেই প্রস্তুত করে রেখেছিলাম আমরা। আমরা আগেই পেনাল্টি নেয়ার অনুশীলন করেছি এবং প্রতিপক্ষকে নিয়ে গবেষণা করেছি। এ কারণেই শতভাগ সাফল্য পেয়েছি।’ নাটকীয় ম্যাচের মধ্যদিয়ে ইতিহাস গড়ায় স্বাভাবিকভাবেই গর্বিত কোচ, ‘সবার মধ্যেই দারুণ এক আবেগের অনুভূতি কাজ করছে। দলের এবং দেশের জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ একটা জয়। সত্যিকার অর্থেই আমরা গর্বিত।’ গ্রিস কোচের অনুভূতিটা ঠিক উল্টো হওয়াই স্বাভাবিক। শেষ ষোলোতে উঠেই ইতিহাস গড়েছে তারা। ইউরোর সাবেক চ্যাম্পিয়নরা স্বপ্ন দেখছিল, ইতিহাসটাকে আরো সমৃদ্ধ করার। কিন্তু তারা সেটা পারেনি বলে হতাশ ফার্নান্দো সান্তোস। অতিরিক্ত সময়ের খেলা শেষে লালকার্ড দেখেন এই কোচ। টাইব্রেকারের সময় মাঠে থাকতে পারেননি। ম্যাচ শেষের সংবাদ সম্মেলনে সান্তোস তার হতাশার কথা বলেন, ‘আমাদের জন্য খুব দুঃখকর মুহূর্ত গেছে। কারণ আমরা ইতিহাস গড়তে এবং গ্রিসের মানুষদের আনন্দ দিতে চেয়েছিলাম। এটা সম্ভব ছিল না। পঞ্চম পেনাল্টিটা হওয়ার পর আমি দুঃখ অনুভব করেছি, শুধু দুঃখই।’ ম্যাচের শুরুটা বেশ ভালই করেছিল কোস্টারিকা। ক্রিস্টিয়ান বোলানোস, রুইজ এবং ক্যাম্পবেলকে নিয়ে সাজানো আক্রমণভাগ গ্রিক ডিফেন্ডারদের জন্য বারবার অসুবিধার কারণ হয়ে দেখা দিচ্ছিল। ম্যাচের ২৫ মিনিটে বামদিক থেকে রুইজের সহযোগিতায় বোলানোস পোস্টে শট করলেও তা কারনেজিসের হাতের উপর দিয়ে বাইরে চলে যায়। এই প্রথমবারের মত শেষ ষোলতে খেলতে আসা গ্রিস ৩৭ মিনিটে প্রথম ভাল একটি সুযোগ নষ্ট করে। বামদিক থেকে আসা একটি ক্রসে ডিমিট্রিয়স সালপিংডিসের প্রচেষ্টা কর্ণারের মাধ্যমে রক্ষা করেন নাভাস। দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য অন্য গ্রিসকেই মাঠে দেখা গেছে। কিন্তু তাদের আক্রমণাত্মক মেজাজের সুযোগে ম্যাচে প্রথম এগিয়ে যায় কোস্টারিকা। ৫২ মিনিটে আবারো সেই ক্যাম্পবেল ও বোলানসের সহায়তা সুযোগসন্ধানী রুইজ কারনেজিসকে বোকা বানিয়ে দলকে এগিয়ে দেন। এক গোলে পিছিয়ে থেকে ম্যাচে সত্যিকার অর্থেই ফিরে আসার গুরুত্ব যেন টের পায় গ্রিস। ডিফেন্ডার অস্কার ডুরাটে দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের কারণে ৬৬ মিনিটে মাঠের বাইরে চলে গেলে এক গোলে পিছিয়ে থাকা গ্রীস ম্যাচে ফিরে আসার জন্য কোস্টারিকার উপর চেপে বসে। একের পর এক আক্রমণ করে তারা কোস্টার রিকান গোলরক্ষক কেইলর নাভাসসহ পুরো রক্ষণভাগকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ইনজুরি টাইমে সক্রেটিস পাপাস্টাথোপোলাস ম্যাচে সমতা ফেরালে নির্ধারিত সময় ১-১ গোলে শেষ হয়। অতিরিক্ত সময়ে অবশ্য উভয় দলই রেসিফের প্রচণ্ড গরমে পরিশ্রান্ত হয়ে কোনরকমে সময় অতিবাহিত করেছে। টাইব্রেকারে নাভাস গ্রিক স্ট্রাইকার ফ্যানিস গেকাসের শর্ট দুর্দান্তভাবে এক হাতে আটকে দিয়ে দলের জয় নিশ্চিত করেন গোলরক্ষক নাভাস। দলকে বাঁচানো এই গোলরক্ষকই কালকের ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন। সামনের ম্যাচে কোস্টারিকানদের প্রতিপক্ষ শক্তিশালী নেদারল্যান্ড। তবে এই মুহূর্তে বিজয় উদযাপনের কথাই কেবল ভাবছে কোস্টারিকা ফুটবল দল। কোচ পিন্টো বলেন, ‘আমরা ইতিহাস গড়েছি। যা ঘটেছে সেটা অনেক মহিমাময়। এই জয়টা আমাদের দেশের সবার জন্য। তাদেরকে আমরা এটাও জানিয়ে দিতে চাই যে আমাদের লড়াইটা এখনও শেষ হয়নি। আমরা আরও সামনে যাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। এখন কেবল বর্তমান সময়টা উপভোগ করতে চাই।’