চকের ইফতারি বাজার যেন এক উত্সব

হাঁক-ডাক শুরু সেই দুপুর থেকেই। বাতাসে ভাসছে নানা স্বাদের মুখরোচক খাবারের মনকাড়া সুবাস। সেইসাথে ক্রেতাদের সরব উপস্থিতি। যেন ইফতার বাজার নয় উত্সব! কালের বিবর্তনে ঢাকার চকবাজারের ঐতিহ্যবাহী ইফতারিবাজার যেন এক উত্সবে পরিণত হয়েছে। গতকাল সোমবার পহেলা রমজানে সেই উত্সবে মিলল রোজাদাররা। উত্সবের শুরু মোগল আমলে। ঐতিহাসিক মতে, মোগল আমলে পুরনো ঢাকার চকবাজারের শাহী মসজিদের সামনে একটি কূপ ছিল। তার চারপাশে চেয়ার-টেবিল সাজিয়ে বিক্রি করা হতো হরেক রকম নবাবী ইফতার সামগ্রী। এখন সেই কূপ নেই, আগের মতোই মসজিদের সামনে চেয়ার-টেবিল সাজিয়ে বিক্রি করা হয় ইফতার সামগ্রী। তবে সময়ের আবর্তে এখানকার ইফতার সামগ্রীর সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। নাজির হোসেনের ‘কিংবদন্তির ঢাকা’ বইয়ে উল্লেখ আছে, ‘১৮৫৭ সালের আগেই চকবাজারে গড়ে ওঠে নানা রকম মুখরোচক খাবারের দোকান। রমজানের সময় মোগলাই খাবার এবং রকমারি ইফতারি বিক্রি করা হতো এখানে।’ কি কি পদ আছে চকবাজারের ইফতার সামগ্রীতে? বলা যায়, কি নেই? বড় বাপের পোলায় খায়, দইবড়া, সুতি কাবাব, জালি কাবাব, শিক কাবাব, হালিম, কচুরি, ফুলুরি, খাসির রান, মুরগি, কোয়েল ও কবুতরের রোস্ট, পনিরের পেটিস ও রোল, চিকেন টোস্ট, ভেজিটেবল রোল, নিমকি, ছোলা বুট, কাঁচা বুট, কিমা পরোটা, সিঙ্গাড়া, সমুচা, বেগুনি, আলু ও ডিমের চপ, পেঁয়াজু, টিকিয়া, ঘুগনি ইত্যাদি। ঝাল খাবারের পাশাপাশি মিষ্টি খাবারও রয়েছে চকবাজারে। সকলকে তাক লাগিয়ে দেয়া ৪ কেজি ওজনের শাহী জিলাপিও পাওয়া যায় এখানে। আরো রয়েছে ছানার মিষ্টি, ফিরনি, মিষ্টি সিঙ্গাড়া, জর্দা। শরবতের মধ্যে রয়েছে কাশ্মীরি শরবত, বোরহানি, লাবাং, লাচ্ছি ও লেবুর শরবত। এসব ইফতার সামগ্রী শুধু নামে নয় স্বাদেও অনন্য। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে রোজাদাররা চকবাজারের এসব ইফতার সামগ্রী কিনতে আসেন। ইফতার বিক্রেতারা জানান, পুরান ঢাকার বাসিন্দারা বাড়ির তৈরি ইফতারির চেয়ে দোকানে তৈরি ইফতারি দিয়েই ইফতার করতে অভ্যস্ত। যে কারণে পুরো রমজান জুড়েই চকের ইফতারিবাজার থাকে সরগরম। ক্রেতাদের সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় বিক্রেতাদের। গতকাল ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে চকবাজারে ইফতারি কিনতে আসা এনায়েতুর রহমান বলেন, চকবাজারের ইফতার সামগ্রীতে এমন কিছু পদ আছে যা অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না। এছাড়া এখানকার খাবারের মধ্যে একটি নবাবী স্বাদ ও আমেজ রয়েছে। দাম কেমন? জানতে চাইলে এই ক্রেতা জানান, এখানকার ইফতারের দাম তুলনামূলক একটু বেশি। তবে ঐতিহ্যেরও তো একটা মূল্য আছে। এ প্রসঙ্গে শাহী জিলাপি বিক্রেতা হোসেন বললেন, সব জিনিসের দামই বাড়তি। রমজান উপলক্ষে বিভিন্ন পণ্যের দাম আরেক দফা বেড়েছে। তিনি এক কেজি ওজনের শাহী জিলাপি ১৬০ টাকায় বিক্রি করছেন। এর কমে বিক্রি করলে পোষায় না বলে তিনি জানান। গতকাল চকের ইফতারবাজার ঘুরে দেখা যায়, এই বাজারের আলোচিত পদ ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ খাবারের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ চোখে পড়ার মতো। বিক্রেতা হামিদ বলেন, এ খাবারটি মোট ৩৬টি আইটেম ও ১৮টি মশলা দিয়ে তৈরি করা হয়। গরুর মগজ, গরুর কলিজা, মুরগির মাংসের কুচি, সুতি কাবাব, মাংসের কিমা, ডিম, আলু, ঘি, বুটের ডালসহ নানা পদের খাবার ও নানা ধরনের মশলা মিশ্রণে খাবারটি তৈরি করা হয়। প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩শ’ থেকে ৩৫০ টাকা। এছাড়া অন্যান্য উল্লেখযোগ্য খাবারের মধ্যে খাসির রানের রোস্ট ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, মুরগীর রোস্ট ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, কবুতরের রোস্ট ২০০ টাকা, বিভিন্ন ধরনের কাবাব ৪০ থেকে ৫০ টাকা, টানা পরোটা ২০ থেকে ৩৫ টাকা, দই বড়া (বাটির আকারভেদে) ১০০ থেকে ২০০ টাকা, হালিম (বাটির আকারভেদে) ৬০ থেকে ২০০ টাকা, ডিম চপ ১৫ টাকা, সমুচা ৫ থেকে ১০ টাকা, পনির সমুচা ৫ টাকা, পেঁয়াজু ৪ থেকে ৫ টাকা, আলুর চপ ৫ টাকা, বেগুনি ৫ টাকায় বিক্রি করা হয়। অনেকের মতে, ঢাকার বয়সের সমান চকবাজারের ইফতারির বাজার। তাদের মতে, ১৭০২ সালে ঢাকার দেওয়ান মুর্শিদ কুলি খাঁ চকবাজারকে আধুনিক বাজারে পরিণত করেন। চকবাজারের এই ইফতারের গল্পটা আসলে ৪শ’ বছরের পুরোনো। যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে, চলবে।