খুঁড়িয়ে চলছে স্বাস্থ্যসেবা

উত্তরাঞ্চলের সীমান্ত জেলা পঞ্চগড়। প্রায় ১৬ লাখ জনসংখ্যার এ জেলায় স্বাস্থ্যসেবা চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এতো বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর জন্য মাত্র ৩২ জন চিকিত্সক থাকলেও কর্মস্থলে চিকিত্সকদের অনুপস্থিতি ও স্থানীয় প্রশাসনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে কার্যত ভেঙ্গে পড়েছে গোটা জেলার সরকারি চিকিত্সা ব্যবস্থা। সরেজমিনে জেলা সদর হাসপাতাল ও চার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরে চিকিত্সা সেবার ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে। জানা গেছে, অধিকাংশ হাসপাতালেই চিকিত্সকের অভাবে অপারেশন বন্ধ থাকে। টেকনেশিয়ান সংকট থাকায় এক্স-রে মেশিনও বন্ধ। অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও তা রোগীদের কাজে ব্যবহূত হয় না। জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিত্সা কার্যত মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট নির্ভর হয়ে পড়েছে। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সই চিকিত্সক ও ক্লিনিক মালিকদের নিয়োজিত দালালদের নিয়ন্ত্রণে। ওই সকল দালাল হাসপাতালে আসা রোগীদের ভাগিয়ে ক্লিনিকে নিয়ে যায়। সরকারিভাবে সরবরাহকৃত মাত্র ২/১ ধরনের ওষুধ রোগীদের দেয়া হয়। বাকি ওষুধ পাচার হয়ে যায়। রোগীদের খাদ্যের মানও খুবই খারাপ। ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকরা হাসপাতালগুলোতে খাবার সরবরাহের নামে লুটপাটে ব্যস্ত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সদর হাসপাতালসহ পঞ্চগড় জেলায় ৫টি সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায় সাব সেন্টার ৪৩টি থাকলেও মূলত ১৬টির কার্যক্রম চালু রয়েছে। ৯৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। জেলায় সরকারিভাবে মঞ্জুরিকৃত চিকিত্সকের পদ ১৫৪টি। কর্মরত মাত্র ৩২ জন। ১২২টি চিকিত্সকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে চিকিত্সকদের বাসস্থান রয়েছে; কিন্তু বদলি হয়ে চিকিত্সকরা এ সব হাসপাতালে যোগদান করলেও পুনরায় তদ্বির করে ঢাকায় কিংবা তাদের পছন্দের স্থানে চলে যান। এ কারণে হাসপাতালসমূহে ৮০ ভাগ চিকিত্সকের পদই সবসময় শূন্য থাকে। পঞ্চগড় সদর আধুনিক হাসপাতালে চিকিত্সকের অনুমোদিত পদের সংখ্যা ৩৬। কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৯ জন। এর মধ্যে ৪ জন আবার সাধারণ মেডিক্যাল অফিসার। এই কয়েকজন চিকিত্সক হাসপাতালের আন্তঃবিভাগ ও বহির্বিভাগ সামলাতে হিমশিম খান। সার্জারি বিভাগে একজন জুনিয়র কনসালটেন্ট থাকলেও অ্যানেসথেসিয়া চিকিত্সক না থাকায় বর্তমানে কোন অপারেশন হচ্ছে না হাসপাতালে। এক্স-রে মেশিন চালু থাকলেও দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনিহার কারণে অধিকাংশ রোগী বাইরে থেকে এক্স-রে করান। একশ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে শয্যার অভাবে সব সময় রোগীদের মেঝেতে থাকতে হয়। এ ছাড়া এখানে পঞ্চগড় সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ ১১টি সাব-সেন্টারে পদ রয়েছে ১৪টি। এর মধ্যে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৪ জন। এ ছাড়া পঞ্চগড় সিভিল সার্জন অফিসের ৩টি পদের মধ্যে শুধু সিভিল সার্জন কর্মরত রয়েছেন। মেডিক্যাল অফিসারের দুইটি পদই শূন্য। জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর মধ্যে দেবীগঞ্জ হাসপাতালের অবস্থা বেশি নাজুক। এখানকার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার বাড়ি একই এলাকায়। ফলে তিনি হাসপাতালে একক আধিপত্য বিস্তার করে চলেছেন। অথচ জনপ্রশাসনের নিয়মানুযায়ী প্রথম শ্রেণীর কোন কর্মকর্তাই নিজ জেলা কিংবা উপজেলায় বদলি হতে পারেন না। ২০ জন চিকিত্সক থাকার কথা হলেও তিনি ও আর একজন ডেন্টাল চিকিত্সক দিয়ে চলছে গোটা হাসপাতাল। আর ১০টি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের জন্য রয়েছেন মাত্র ১ জন চিকিত্সক। তেঁতুলিয়া উপজেলা হাসপাতাল ও এর অধীনে ৭টি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিত্সকের অনুমোদিত পদের সংখ্যা ২৭টি। এর মধ্যে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৪ জন। উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের জন্য কোন চিকিত্সক নেই। বোদা হাসপাতাল ও ৯টি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিত্সকের পদ রয়েছে ২৯টি। এর মধ্যে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৬ জন। আটোয়ারী উপজেলা হাসপাতাল ও ৬টি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিত্সকের পদ রয়েছে ১৫টি। এর মধ্যে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৫ জন। জেলার ৫ সরকারি হাসপাতালে এ্যাম্বুলেন্স থাকলেও রয়েছে তেলের সংকট। মেরামতের অভাবে এর কয়েকটির অবস্থা খুবই নাজুক। জরুরি প্রয়োজনে স্বজনরা নিজস্ব অর্থায়নে এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে রোগীকে জেলার বাইরে উন্নত চিকিত্সার জন্য নিয়ে যান। জেলা সদর ছাড়া বাকি ৪ উপজেলা হাসপাতালে এক্স-রে মেশিন থাকলেও একটিও চালু নেই। টেকনিশিয়ান না থাকায় অধিকাংশই প্যাকেটবন্দী। ফলে এগুলো নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। হাসপাতালে ওষুধ সংকটও চরমে। রোগীদের অভিযোগ, সামর্থ্য না থাকলেও তাদের বেশিরভাগ ওষুধ কিনতে হয় বাইরে থেকে। সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও দামি ওষুধ তাদের হাসপাতাল থেকে দেয়া হয় না। এদিকে শীর্ষ কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে সকল হাসপাতালে যথেষ্ট স্যালাইন মজুদ রয়েছে; কিন্তু বেশিরভাগ রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, কর্তব্যরত নার্সরা তাদের বাইরে থেকে স্যালাইন আনার জন্য কাগজে লিখে দেন। হাসপাতালের এক শ্রেণীর কর্মচারী রোগীদের ওষুধ ও স্যালাইন না দিয়ে কালোবাজারে বিক্রি করেন বলে তারা অভিযোগ করেন। এসব ব্যাপারে জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. মোজাম্মেল হক জানান, চিকিত্সক সংকটের কারণে আমরা প্রায় ১৬ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছি। এ নিয়ে বার বার স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ মন্ত্রণালয়কে লিখিত ভাবে জানাচ্ছি। কয়েকজন চিকিত্সক দীর্ঘ ছুটিতে ও দেশের বাইরে রয়েছেন বলে তিনি স্বীকার করেন। ওষুধ সংকট সম্পর্কে তিনি বলেন, পঞ্চগড়ে কোন ওষুধের সংকট নেই। চাহিদামাফিক সব ওষুধ হাসপাতাল থেকে সরবরাহ করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দার বাইরে অন্য জেলার চিকিত্সকরা এ জেলায় থাকতে চান না বলেও তিনি জানান।