শিক্ষা ক্যাডারে অসন্তোষ
প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০১৪, ২২:৪২
সপ্তম বিসিএসে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে শিক্ষকতার চাকরি শুরু করেন জওহরলাল। ১৯৮৫ সালে অনুষ্ঠিত ঐ বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে চাকরিতে নিয়োগ পান ১৯৮৮ সালে। এ বছরের নভেম্বর মাসে অবসরে যাচ্ছেন। কিন্তু প্রাণিবিদ্যার প্রভাষক পদে চাকরি শুরু করে বিদায় নিতে যাচ্ছেন সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে। অথচ তার কনিষ্ঠ, ১৪তম বিসিএস ব্যাচের অনেকেই অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। অবস্থার প্রতিকার না হলে অধ্যাপক হওয়ার অতৃপ্তি নিয়ে বাকি জীবনটা কাটাতে হবে তাকে। এরকম পদোন্নতি বৈষম্য, অনিয়মিত সিলেকশন গ্রেড, অসঙ্গতি, অপ্রাপ্তি, অতৃপ্তি, দুর্নীতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপসহ বিভিন্ন কারণে হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে শিক্ষা ক্যাডারের বিভিন্ন স্তরে।
শিক্ষকদের অসন্তোষ-হতাশার প্রভাব পড়ছে শিক্ষা ব্যবস্থায়। শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় লালিত হচ্ছে বিশৃংখলা। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ পরিস্থিতি নিরসনের জন্য নিয়মিতই দাবি জানিয়ে আসছেন শিক্ষকরা। কিন্তু প্রতিকার পাচ্ছেন না তারা। ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা আন্দোলনে নামতে শুরু করেছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে ও দাবি জানিয়ে গত ১১জুন শিক্ষা ভবন চত্বরে সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা-শিক্ষকরা। ২২ জুন সারা দেশের বিভিন্ন কলেজে সমাবেশ করেন তারা। অসঙ্গতি দূর করতে ২৮ আগস্ট পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি। এর মধ্যে দাবি বাস্তবায়িত না হলে আগামী দুই সেপ্টেম্বর শিক্ষা ভবন থেকে পদযাত্রা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি পেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। এছাড়া বৃহত্তর আন্দোলনের পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হচ্ছে বলে ক্যাডারভুক্ত কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন।
রাজধানীর ঢাকা কলেজসহ কয়েকটি কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষক জানান, শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত পদোন্নতি-জট, অর্জিত ও শ্রান্তি বিনোদন, সাপ্তাহিক ছুটি জটিলতা, আন্তঃক্যাডার বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এক দশকের বেশি সময় ধরে চলছে পদোন্নতি জট। দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়া এবং সুপারসিডেড (জ্যেষ্ঠতা লংঘন) হওয়া এবং ছুটি জটিলতায় আর্থিক সুবিধা কমে যাওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মহাজোট সরকারের বিগত ৫ বছরের মেয়াদে শিক্ষা ক্যাডারের সহকারী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত একাধিকবার পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু পদোন্নতিকালে তৈরি বেশকিছু জটিলতার ফলে দেখা দেয় বিশৃংখল অবস্থা। বিভাগ বা বিষয়প্রীতির কারণেই এ জটিলতা তৈরি হয়েছে। অনেক স্থানে গড়ে ৬ থেকে ৮ বছরের কনিষ্ঠ শিক্ষকরা জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের ওপরে পদোন্নতি পেয়েছেন। কাগজে-কলমে জ্যেষ্ঠ হওয়া ওইসব কনিষ্ঠের অধীনে প্রকৃত জ্যেষ্ঠদের চাকরি করতে হচ্ছে। ফলে প্রথাগত কারণে চাকরিতে কনিষ্ঠরাই এখন ঐ জ্যেষ্ঠদের এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন) তৈরি করছেন। এরকম সারা দেশে সহকারী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত তিন ক্যাটাগরিতে অন্তত ২ হাজার ৮২৪ জন বঞ্চিত শিক্ষক রয়েছেন।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক এবং বিসিএস শিক্ষা সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন বলেন, পদোন্নতিতে কিছুটা ধীরগতি রয়েছে। এরফলে শিক্ষা ক্যাডারের সদস্যদের মধ্যে কিছুটা অসন্তোষ এবং হতাশাও আছে। তবে অসন্তোষ দূর করতে এবং পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শিগগিরই এ পরিস্থিতির নিরসন হবে।
বিসিএস ক্যাডারে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সাধারণত ব্যাচ পদ্ধতি অনুসরণ করা হলেও শিক্ষা ক্যাডারে তা তেমন অনুসরণ করা হয় না। এ ক্যাডারে ব্যাচের পরিবর্তে বিষয়ভিত্তিক পদোন্নতি দেয়া হয়। ৭ম ব্যাচের শিক্ষকরা ২০০৫ সাল থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে সহযোগী অধ্যাপক হয়েছেন। অথচ একই সময়ে ১৪তম ব্যাচের বেশ কিছু বিষয়ের শিক্ষক সহযোগী অধ্যাপক হয়েছেন। এমনকি এই ব্যাচের ৪০ শিক্ষক ওই সময়ে অধ্যাপক পর্যন্ত হয়ে গেছেন। আবার ২০১০ সালে ১৭তম ব্যাচের শিক্ষকদের কেউ কেউ সহযোগী অধ্যাপক হয়েছেন। সাধারণত সহযোগী অধ্যাপকরা কিছু কলেজে উপাধ্যক্ষ আর অনেক কলেজেই অধ্যক্ষ হয়ে থাকেন। ফলে যেসব কলেজে আগে পদোন্নতি পেয়ে কনিষ্ঠরা অধ্যক্ষ বা উপাধ্যক্ষ, সেসব কলেজে কনিষ্ঠদের অধীনে জেষ্ঠ্যরা কাজ করছেন। ৭ম বিসিএস থেকে ১৩তম বিসিএস পর্যন্ত ৮৪৮ জন এখনও সহযোগী অধ্যাপক হিসেবেই রয়েছেন।
আবার এই ক্যাডারের ১৪তম ব্যাচ থেকে ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের অনেকেই এখনও সহকারী অধ্যাপক পদে কর্মরত। অথচ ২০তম ব্যাচের বাংলা ও সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষকরা সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। ফলে এই ২০তম ব্যাচের যারা উপাধ্যক্ষ বা অধ্যক্ষ হয়েছেন, তাদের অধীনে কাজ করতে হচ্ছে ‘বঞ্চিত ব্যাচগুলোর শিক্ষকদের’। এ স্তরে ৪৬টি বিষয়ের ১ হাজার ৩৬১ জন পদোন্নতি বঞ্চিত। এছাড়া ২১তম বিসিএস থেকে ২৪তম বিসিএস পর্যন্ত ৪টি ব্যাচের ৪৭টি বিষয়ের ৬১৫ জন আছেন পদোন্নতি বঞ্চিত। এই চারটি ব্যাচের অনেকেই সহকারী অধ্যাপক হয়ে গেছেন। এসব কর্মকর্তা তাদের কনিষ্ঠদের অধীনে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম কলেজের এক শিক্ষক বলেন, কনিষ্ঠ শিক্ষকের অধীনে কাজ করতে সব সময়ই অস্বস্তিতে থাকতে হয়। প্রায়ই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। আবার বিশৃংখলাও সৃষ্টি হয়। কিন্তু তা দূর করা সহজ হয় না। শিক্ষা ক্যাডারের এ জট নিরসন করা জরুরি।
জানা যায়, গত বছর ৭ম বিসিএস থেকে ১০ম বিসিএস পর্যন্ত ব্যাচগুলোর সহযোগী অধ্যাপকদের অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তখনকার শিক্ষা সচিব কামাল আবদুল নাসের বর্তমানে জনপ্রশাসন সচিব। এই উদ্যোগে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে আশা সঞ্চারিত হলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর এ প্রচেষ্টা থমকে গেছে। এ প্রসঙ্গে সর্বশেষ অবস্থা জানতে গতকাল সোমবার ফোনে কয়েকদফা চেষ্টা করেও কামাল আবদুল নাসেরের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির মহাসচিব আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার বলেন, ১৩তম ব্যাচ পর্যন্ত ৮৪৮ জন সহযোগী অধ্যাপক, ১৮ ব্যাচ পর্যন্ত ১৩৬১ জন সহকারী অধ্যাপক, ২৪ ব্যাচ পর্যন্ত ৬১৫ জন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা যথাক্রমে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ হওয়া থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি বা পদোন্নতি দিয়ে এ বৈষম্য নিরসনে মাউশি ও সাধারণ শিক্ষা সমিতির প্রস্তাব অনেকদিনের। প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশও রয়েছে। এ দাবি ও সুপারিশ বাস্তবায়ন করা জরুরি। দাবি বাস্তবায়নে তারা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবেন বলেও তিনি জানান।