জেলায় জেলায় ‘হাঁটুভাঙ্গা মাজাভাঙ্গা’ সড়ক

‘মন্ত্রী যোগাযোগের ক্ষেত্রে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু আমার নির্বাচনী এলাকার মাদারীপুর (কুলপুদ্দি)-কালকিনি-ভুরঘাটা সড়কটি এতই খারাপ যে, প্রতিদিনই এখানে দুর্ঘটনা ঘটছে। এজন্য লোকজন এর নাম দিয়েছে হাঁটুভাঙ্গা সড়ক। মন্ত্রীর কাছে জানতে চাই, কতদিনের মধ্যে আমার এলাকার হাঁটুভাঙ্গা সড়কের এই বদনাম ঘুচবে? গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কাছে এভাবেই সম্পূরক প্রশ্ন রেখেছিলেন মাদারীপুর-৩ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য আ.ফ.ম বাহাউদ্দিন নাছিম। শুধু বাহাউদ্দিন নাছিম-ই নন, গতকালের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রশ্নকারী সরকারি, বিরোধী দলীয় ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের বেশিরভাগেরই তারকা চিহ্নিত, লিখিত ও সম্পূরক প্রশ্ন ছিল তাদের নির্বাচনী এলাকার সড়ক-মহাসড়কের দুরাবস্থা নিয়ে। বিশেষ করে বর্ষাকাল চলে আসায় রাস্তাঘাটের খানাখন্দে পানি জমে যাওয়ায় দুর্ঘটনার মাত্রা বেড়ে গেছে। জেলায় জেলায় এসব সড়ক-মহাসড়কের দ্রুত মেরামত দাবি করেছেন সংসদ সদস্যরা। সংসদ সদস্যদের এই দাবির প্রেক্ষিতে যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘আমাদের রাস্তাগুলো বুড়ো হয়ে গেছে। ওভার লোডের কারণে সড়কগুলো বয়সের আগেই নষ্ট হয়ে যায়। যে পরিমাণ ওভার লোড সে তুলনায় রাস্তাগুলোর ধারণক্ষমতা কম। বর্ষা মৌসুম চলে আসায় সমস্যাটা একটু বেশি মনে হচ্ছে। আমি অনেক রাস্তা পরিদর্শন করেছি, খারাপ রাস্তাগুলোর সংস্কার চলছে। খানাখন্দ ভরাট করে মোটামুটি চলাচলের উপযুক্ত করে দেয়া হচ্ছে। বর্ষা শেষে ভালোভাবে সংস্কার কাজ করা হবে। এ নিয়ে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। সরকার সব এলাকার সড়ক নিয়ে সচেষ্ট আছে। সব সংসদ সদস্যকেই একটু ধৈর্য ধরতে হবে সড়কের সংস্কারের জন্য।’ বাহাউদ্দিন নাছিম তার সম্পূরক প্রশ্নে বলেন, মাদারীপুর (কুলপুদ্দি)-কালকিনি-ভুরঘাটা সড়কটির প্রশস্তকরণের কাজ চলছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন খাতে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার পর মাঝপথে বন্ধ করা হয়। তার প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, মাদারীপুর-আগৈলঝাড়া সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প, যার ৩ কিলোমিটার মাদারীপুর সদর উপজেলায় এবং ১৬ কিলোমিটার ১০ মিটার পড়েছে কালকিনি উপজেলায়। উন্নয়ন প্রকল্প দুটিতেও সংস্কার কাজ অন্তর্ভুক্ত আছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এই দুটি উপজেলায় পিরিওডিক মেইনটেন্স প্রোগামের আওতায় (পিএমপি) প্রয়োজনীয় সংস্কারের কাজ হাতে নেয়া হবে। বাগেরহাট-২ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মীর শওকত আলী বাদশা সম্পূরক প্রশ্নে যোগাযোগ মন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আমার আগের সংসদ সদস্য (বাহাউদ্দিন নাছিম) বলেছেন তার এলাকার সড়ক হাঁটুভাঙ্গা। কিন্তু আমার এলাকার পিরোজপুর-বাগেরহাট সড়কের সাইনবোর্ড এলাকার সড়কটির এখন মাজাভাঙ্গা অবস্থা। এখানে প্রতিদিন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, অফিসগামী ও এই সড়কে চলাচলকারীরা। দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অনেকেরই মাজা ভাঙ্গছে। এই মাজাভাঙ্গা সড়কের কাজ শেষ করে কতদিনে সরকারের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনা হবে।’ এই প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন ‘ওনার (প্রশ্নকারী সদস্য) কথা শুনে মনে হচ্ছে দেশের রাস্তাঘাটের ওপর সরকারের যেন কোনো প্রকার নজরদারি নেই। আমি নিজে ওই রাস্তা ভিজিট (পরিদর্শন) করেছি। রাস্তাটা খারাপ। তবে টেন্ডার হয়েছে, কাজও শুরু হয়ে গেছে। বর্ষার পর দ্রুতগতিতে কাজ হবে।’ ঢাকা-দিনাজপুর-পঞ্চগড় সড়ক নিয়ে প্রশ্ন করেন বগুড়া-১ আসনের আওয়ামী লীগের আব্দুল মান্নান। তার প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন ‘অন্যান্য মহাসড়কের তুলনায় এই মহাসড়কের অবস্থা তুলনামূলক ভালো। খুব ভালো, বলছি না। তবে ভালো। ওভারলোডের কারণে সড়কটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সড়কে পণ্যের ওজন মাপার জন্য আমরা বর্তমান সরকারের মেয়াদেই আরও দশটি স্কেলযন্ত্র বসাবো। যার প্রথমটিই বসবে এই মহাসড়কের বগুড়ায়।’ টাঙ্গাইল জেলার সদর থানার শান্তিকুঞ্জ মোড় থেকে নাগরপুর থানার কেদারপুর পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার করা হবে কিনা, জানতে চেয়ে যোগাযোগমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন করেন মনোয়ারা বেগম (মহিলা আসন-১৭)। জবাবে মন্ত্রী জানান, এই সড়কটিসহ আরিচা-ঘিওর-দৌলতপুর-নাগরপুর-টাঙ্গাইল সড়ককে আঞ্চলিক মহাসড়কে উন্নীতকরণ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বর্তমানে সড়কের অবস্থা ভালো। এডভোকেট নাভানা আক্তারের (মহিলা আসন-২৭) প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, শরীয়তপুর সড়ক বিভাগের আওতাধীন মনোহর বাজার মোড়-শরীয়তপুর, শরীয়তপুর-গোসাইরহাট, কনেশ্বর-ডামুড্যা, শরীয়তপুর-জাজিরা-কাওড়াকান্দি সড়ক এবং শরীয়তপুর-গংগানগর-মংগলমাঝিরঘাট সড়কের কাজীরহাট থেকে মংগলমাঝিরঘাট পর্যন্ত সংস্কার চলছে। সিলেট-২ আসনের জাতীয় পার্টির (জাপা) সংসদ সদস্য ইয়াহ্ইয়া চৌধুরীর প্রশ্ন ছিল ‘সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের রশিদপুর থেকে শেরপুর পর্যন্ত রাস্তাটি অবিলম্বে সংস্কার করা হবে কিনা, হলে কবে নাগাদ?’ এর উত্তরে যোগাযোগ মন্ত্রী জানান, ‘সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের রশিদপুর থেকে শেরপুর পর্যন্ত রাস্তাটির সংস্কারের জন্য গত ১২ মে পর্যন্ত ৯০৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে কাজ শুরু করতে দেরি হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, বৃষ্টিপাত বন্ধ হওয়ার পর রাস্তাটির সংস্কার কাজ শুরু হবে। বেগম পিনু খান (মহিলা আসন-২৩) প্রশ্ন রাখেন, আগামী অর্থবছরে ঢাকা জেলার দোহার-নবাবগঞ্জ উপজেলায় সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতায় সড়ক মেরামত, সংস্কার ও পাকাকরণের জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ আছে কিনা। উত্তরে মন্ত্রী জানান, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে পিএমপি’র আওতায় দোহার-নবাবগঞ্জ উপজেলার দোহার-বাঁশতলা-কার্তিকপুর-ঝাউকান্দা সড়ক সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। কক্সবাজার-২ আসনের আশেক উল্লাহ রফিকের এক প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, কক্সবাজার সড়ক বিভাগের আওতাধীন মহেশখালী-কুতুবদিয়া-জনতাবাজার-গোরকঘাটা সড়কটির সংস্কারের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এই সড়কে কার্পেটিং ও সীলকোটের মাধ্যমে দুই কিলোমিটার সংস্কার করা হয়েছে। নোয়াখালী-৩ আসনের সদস্য মামুনুর রশীদ কিরনের এক প্রশ্নের জবাবে যোগাযোগমন্ত্রী জানান, নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলায় সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন সড়কের অংশসমূহ সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া।