নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ

কাব্যের রুপালি গল্প

বরেণ্য কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতা অবলম্বনে সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত মাসুদ পথিকের চলচ্চিত্র ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে। এই ছবিতে নিজের চরিত্রে অভিনয় করেছেন বরেণ্য কবি নির্মলেন্দু গুণ। এছাড়া নেকাব্বর চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছেন জুয়েল জহুর এবং ফাতেমা চরিত্রে সাবলীল অভিনয় করেছেন সিমলা। অভিনয়ের এই তিন গুণীশিল্পীর সাথে গত রবিবার আমরা বসেছিলাম এক আনন্দ আড্ডায়। সেখানে তারা নিজেদের কাজ নিয়ে নানা কথা বলেছেন। সেই আলাপচারিতার উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ে লিখেছেন খালেদ আহমেদ ও ছবি তুলেছেন সোহেল মামুন রবিবার সকালে আমরা যখন কবি নির্মলেন্দু গুণের কামরাঙ্গির চরের বাসায় পৌঁছালাম, তখন সবে তিনি নাস্তা করছিলেন। কুশল বিনিময়ের পর প্রথমেই শুরু হলো ফটোসেশনের পর্ব। ফটোগ্রাফার সোহেল মামুন বেশ যত্ন নিয়ে ক্লিক করে যাচ্ছেন একের পর এক। ছবি তোলা শেষ হলে আমরা কথা বলা শুরু করলাম। প্রথমেই মুখ খুললেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। তার ভাষ্যে, ‘আমি বড়পর্দায় এর আগে অভিনয় না করলেও ছোটপর্দায় অভিনয় করেছি সেই তরুণ বয়সে। পরেও অভিনয় করা হয়েছে। আমার কবিতা নিয়ে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ হয়েছে বলে বলছি না, এর চিত্রনাট্য অনেক সুন্দর হয়েছে। কেননা কবিতায় যতটুকু দৃশ্যকল্প আছে তা নিয়ে তো আর চলচ্চিত্র হয় না, চলচ্চিত্রের জন্য অনেক বেশি চিত্রকল্পের প্রয়োজন হয়। যা মাসুদ পথিক করতে সফল হয়েছে। আবার এই ছবিতে উঠে এসেছে বাংলার ঐতিহ্য। প্রেম, প্রকৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের গাঁথাসূত্রে তথ্যের ইমেজ ধরে আবহমান বাংলার নিবিড় রিচুয়াল, জীবনের অন্তর্গত দর্শন, তথা জীবনবোধের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত পরিলক্ষিত। মোটকথা কৃষক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে রচিত কাহিনীতে বিভিন্ন প্রাণের উপস্থিতির মাধ্যমে প্রাণের যে পরম্পরা তা সুন্দরভাবে ইমেজায়িত হয়েছে এই চলচ্চিত্রে। পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধার সর্বহারা উপস্থিতি ও পরিচিতি আমাদের অনুভূতিতে ব্যাপকভাবে প্যাথডের ভেতর দিয়ে যায়। যা সবার হূদয়কে নাড়া দিতে পেরেছে বলে আমার ধারণা। আমার কবিতা অবলম্বনে আগেও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। তানভীর মোকাম্মেলের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘হুলিয়া’। বেশ সাড়া ফেলেছিল। সুতরাং আমরা চলচ্চিত্রের যে ধারার প্রতিনিধিত্ব করি বলে দাবি করি, স্বাধীন ও বিকল্পধারার ছবি, সে চলচ্চিত্রের যে আন্দোলন আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়েছিল, সে ধারার প্রধান দুটি ছবি ছিল ‘আগামী’ ও ‘হুলিয়া’। কবিতার যে বিষয়ভাবনা ও সহজাত ভঙ্গিমা, কী করে তা একটা চলচ্চিত্রে রূপ দেওয়া যায় এবং সেটা সার্থক চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে, সেটাই প্রধান বিচার্য বিষয়। আসলে কবিতার পরস্ফুিটনের চাইতে চলচ্চিত্রে বিষয়বস্তু বা আখ্যান-তথ্য কত সূক্ষ্ম আঙ্গিকে, কত ডিটেইলে, কত আবেদনময়রূপে ফুটিয়ে তোলা হয়, সাধারণত তাই বিবেচনা করা হয়। তাছাড়া চলচ্চিত্র একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মাধ্যম। অন্য কোনো মাধ্যম থেকে ভাবনাচিন্তা, আখ্যান বা প্লট যদি নিতে হয়, চারিত্র্য-চিত্রনের স্বার্থে তাকে চলচ্চিত্রায়িত করে নিতে হয়। কবিতার যা স্বভাব বা প্রকাশধরন, তা অনেকটাই অ্যাবেস্ট্রাক্ট। সংগীতও তাই। চলচ্চিত্রে সে সুযোগ কম। কারণ চলচ্চিত্র অনেক বেশি প্রত্যক্ষ মাধ্যম। তা দেখা এবং শোনার বিষয়। অবয়ব ও দৃশ্যমানতার বিষয়। তবুও মজার বিষয় হচ্ছে, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে একটা কথা বলা হয়ে থাকে, ‘সার্থক চলচ্চিত্র তাই, যা কবিতা হয়ে ওঠে। সব মিলিয়ে আসি এই ছবিতে ধ্রুপদী একটি চলচ্চিত্রই বলব।’ এবার মুখ খুললেন সিমলা। তিনি বলেন, ‘ভিন্নধর্মী গল্পের এই ছবিতে আমি ফাতেমা চরিত্রে অভিনয় করেছি। গ্রামের মেয়ে ফাতেমা চরিত্রটি বেশ মজার। এই চরিত্রে অভিনয়ের অনেক সুযোগ ছিল। এরকম একটি চরিত্রে অভিনয় করতে পেরে আমি আনন্দিত।’ সব শেষে নেকাব্বর চরিত্রে অভিনয় করা জুয়েল জহুর কথা বলা শুরু করলেন। তিনি বলেন, ‘এই ছবিতে আমি তরুণ বয়সের নেকাব্বরের চরিত্রে অভিনয় করেছি। চরিত্রটি করতে আমার অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। বেশ কয়েকমাস আমি চরিত্রটির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে কাজ করেছি। গ্রামের প্রতিবাদী নেকাব্বরের চরিত্র করতে পেরে আমার ভালো লেগেছে। আমাকে এরকম একটি চরিত্র অভিনয়ের সুযোগ দেওয়ার জন্য আমি পরিচালক মাসুদ পথিক ভাইয়ের কাছে কৃতজ্ঞ।’ ব্রাত্য চলচ্চিত্র প্রযোজিত ও পরিবেশিত এই চলচ্চিত্রের গানগুলো—‘ইস্টিশন’, ‘নিশিপক্ষী’, ‘এই সুন্দর দুনিয়া’ ইতোমধ্যে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। ছবিটির সংগীত পরিচালনা করেছেন ড. সাইম রানা। এই ছবিটিতে আরও অভিনয় করেছেন মামনুর রশীদ, মিতুল, প্রবীর মিত্র, রেহেনা জলি, রানী সরকার, এহসানুর রহমান, অসীম সাহা, শেখ শাহেদ আলী, দুখু সুমন, সৈয়দ যোবায়ের প্রমুখ। ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ শুধু চলচ্চিত্র নয়, এ যেন গ্রাম ও শহরের স্মৃতির জানালা হল-ফেরত দর্শকের অভিমত ছিল এমনই। প রি চা ল ক যা ব ল লে ন ... এই চলচ্চিত্র নিয়ে পরিচালক মাসুদ পথিক বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সুস্থধারার সিনেমা দেখার দর্শক নিতান্ত হাতেগোনা। পরিবেশকরাও এমন সিনেমা নিতে চান না সহজে। যারা আমার সিনেমাটি প্রদর্শনের ব্যাপারে সায় দিয়েছেন তারাও ব্যবসায়িক সাফল্যের ব্যাপারে আশাবাদী নন। এত টাকা লগ্নি করলাম। এর কতভাগ টাকা যে উঠে আসবে বা আদৌ উঠে আসবে কি না জানি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আবহান গ্রামীণ রিচ্যুয়ালের ইমেজের মাধ্যমে একছত্র গ্রাম তথা বাংলাদেশকে তুলে আনার চেষ্টা করেছি এই ছবিতে। আমার খুব ভালো লেগেছে দেখে যে দর্শকরা চোখে আবেগের জল নিয়ে হল থেকে বের হচ্ছে।’