প্রশাসনে সচিবসহ অন্য পদে বহিরাগত নয়

সরকারি কর্মচারী আইন অনুমোদন  দুর্নীতি ও নৈতিক স্খলনে অভিযুক্ত কর্মচারীকে গ্রেফতারে শর্ত আরোপ  কোন কর্মচারীকে শাস্তি দেয়ার আগে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে সচিব পদে বহিরাগতদের (আউট সোর্সিং) গণনিয়োগের বিধান বাদ দিয়ে সরকারি কর্মচারী আইন সংশোধিত আকারে পাস করেছে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি। আইনে সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা ফৌজদারি মামলার অভিযোগপত্র আদালতে গৃহীত হবার আগে গ্রেফতার করার প্রয়োজনে সরকারের পূর্বানুমতির বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কিংবা বিভাগীয় ব্যবস্থার আগে কারো বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। অবশ্য গণকর্মচারী অবসর আইনে বাধ্যতামূলক অবসরের বিধান থাকায় এ আইনে এ বিধান রাখা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। গতকাল বুধবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসেইন ভূইঞার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটিতে সরকারি কর্মচারী আইনের অনুমোদন দেয়া হয়। এতে জনপ্রশাসন, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক, আইন বিচার, স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিবগণ উপস্থিত ছিলেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, আইনটি যতদ্রুত সম্ভব সংসদের অনুমোদনের জন্য প্রস্তুতি চলছে। সংবিধানে আইন দ্বারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের পরিচালনার উল্লেখ থাকলেও এখন পর্যন্ত এ আইনটি করা হয়নি। এবার আইনটি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিটি নাগরিকের কর্মে সুরক্ষার অধিকার রয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও অনুরূপ সুরক্ষা দরকার। সেজন্য কোন কারণে কর্মচারীকে গ্রেফতারের আগে সরকারের পূর্বানুমতির বিধান রাখা হয়েছে। এ সুরক্ষা না থাকলে যে কেউ প্রতিহিংসার বশে সরকারি কর্মচারীদের হেনস্থা করতে পারে যা কাজের ক্ষেত্রে হতাশা তৈরি করবে। প্রসঙ্গত, সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মে কর্মচারিগণের নিয়োগ (কর্মচারী বলতে কর্মকর্তাকেও বুঝায়), ও কর্মের শর্তাবলী নিয়ন্ত্রণের জন্য সংসদে আইন করার বিধান রয়েছে। ১৯৭২ সালে সংবিধানে এই বিধান সংযোজন করা হলেও এ পর্যন্ত তা করা হয়নি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর সরকারি কর্মচারীদের জন্য আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। ২০১২ সালে আইনের একটি খসড়াও তৈরি করা হয়। একই বছরের ৩ জুন প্রকৌশলীসহ পেশাজীবীদের সঙ্গে এবং ২৭ ডিসেম্বর সর্বশেষ বিভিন্ন ক্যাডার কর্মকর্তা, সচিবালয় কেন্দ্রিক কর্মচারীদের সংগঠনের সঙ্গে মত বিনিময় করা হয়। এতে তত্কালীন জনপ্রশাসন বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড.গওহর রিজভী উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ করা যেতে পারে ওই সময়ে প্রণীত খসড়া আইনে আউট সোর্সিং-এর মাধ্যমে সচিবসহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিধান রাখা হয়। আর এই বিধান নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়-যার পরিপ্রেক্ষিতে আইনটি পাস করার উদ্যোগ থেমে যায়। যদিও ২০১৩ সালের ৭ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে আইনের খসড়ায় অনুমোদন এবং তা সচিব কমিটিতে পাঠানোর অনুমতি চেয়ে সার-সংক্ষেপ পাঠনো হয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সে সময় তা অনুমোদন করেননি। এখন সংশোধিত আকারে আইনের যে খসড়া তৈরি করা হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, সরকারি কর্মচারীদের আত্মরক্ষামূলক বেশকিছু বিধান রাখা হয়েছে। যদিও কর্মচারীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে এসব বিধান করতে হয়েছে। তাদের মতে সরকারের নির্বাহী অংশের ওপর নানামুখী হস্তক্ষেপ চলছে। নির্বাহী অংগ ঠিকমত কাজ করতে না পারলে সরকার পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই আত্মরক্ষামূলক কিছু বিধান নির্বাহী কর্তৃত্বে রাখা হয়েছে। দুর্নীত ও নৈতিক স্খলনজনিত কারণ ছাড়া অন্যকোন অপরাধে কোন কর্মচারী উপযুক্ত আদালত কর্তৃক তিন বছর কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হলে তিনি কর্মচারী হিসেবে বহাল থাকবেন কি না সে সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতির উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। তবে তিন বছরের অধিক সময়ের জন্য দণ্ডিত হলে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত হবেন। শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মচারী আপিল করতে পারবেন এবং নির্দোষ প্রমাণিত হলে বরখাস্তকালীন সময়ে বেতন-ভাতা ও মানহানি বাবদ প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ পাবেন এবং বয়স থাকলে চাকরিতে পুনর্বহাল হবেন। আইনে সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্থায়ী পে-কমিশন গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। কমিশন বাজার মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করে সময়ে সময়ে কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করবে এবং সরকার এই সুপারিশ মেনে চলবে। পদোন্নতির বিধান: মেধা, জ্যেষ্ঠতা, প্রশিক্ষণ, পেশাগত দক্ষতা ও কর্মমূল্যায়ন হবে পদোন্নতির সাধারণ ভিত্তি। কর্মচারিগণের বিভি্ন্ন শ্রেণী এবং সার্ভিসের প্রয়োজনে পৃথক পৃথক বিধি দ্বারা পদোন্নতির বিধিমালা সুনির্দিষ্ট থাকবে। সরকারি কর্মচারী দায়িত্ব পালনকালে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোন নির্দেশ আইন ও বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে তিনি তা পালনে বিরত থাকতে পারবেন। তবে এ বিষয়ে লিখিতভাবে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন। আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, কোন কর্মচারীকে শাস্তি দিতে হলে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে। বিভাগীয় কর্যক্রম গ্রহণ না করে কারো বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া যাবে না।