ডাক্তাররা ব্যস্ত ক্লিনিকে!

জনবল সংকট, চিকিত্সকদের কর্মস্থলে অনুপস্থিতিসহ নানা অব্যবস্থাপনায় ভেঙ্গে পড়েছে খুলনা জেলার সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসমূহে কর্মরত চিকিত্সকদের একটি অংশ কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। ওই চিকিত্সকদের মধ্যে কেউ কেউ খুলনা শহরে ক্লিনিকের মালিক এবং তাদের অনেকেই হাসপাতালে সময় না দিয়ে ক্লিনিকে ব্যস্ত সময় কাটান। ফলে মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট আর নার্সদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের চিকিত্সাসেবা। অন্যদিকে জেলার অনেক সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সজ্জিত অপারেশন থিয়েটার থাকা সত্ত্বেও সার্জন ও অজ্ঞানকারী চিকিত্সক না থাকায় অপারেশন বন্ধ রয়েছে। জানা গেছে, জেলায় সদর জেনারেল হাসপাতাল ছাড়াও ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৬৮টি ইউনিয়ন পর্যায়ের সাব সেন্টার ও ২১৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। সরকারিভাবে চিকিত্সকের পদ ১৭৫টি। কর্মরত রয়েছেন ৮৮ জন চিকিত্সক। বাকি ৮৭টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। এখানে সরকারিভাবে পর্যাপ্ত ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার রি-এজেন্ট ও এক্স-রে ফ্লিমসহ আনুষঙ্গিক সামগ্রী নিয়মিত সরবরাহ করা হয়। হাতের কাছে এমন চিকিত্সা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও দরিদ্র রোগীরা চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। জেলার প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সকদের জন্য বাসস্থান রয়েছে। তারপরও অনেকে সেখানে থাকেন না। অনেক হাসপাতালে এক্স-রে মেশিন বেশির ভাগ সময় নষ্ট থাকে। কোন কোন স্থানে টেকনিশিয়ান নেই। অভিযোগ রয়েছে, অনেক টেকনেশিয়ান এক্স-রে মেশিন নিজেরাই নষ্ট করে প্রাইভেট ক্লিনিকে গিয়ে চাকরি করেন। এছাড়া ওষুধ সরবরাহ না করে পাচার ও খাবার সরবরাহের নামে লুটপাট করা হচ্ছে। ডাক্তার নিজেই ক্লিনিক ব্যবসায়ী: দাকোপ উপজেলার নয়টি ইউনিয়ন এবং ১টি পৌরসভার দুই লক্ষাধিক মানুষের জন্য একটি মাত্র সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে। এই হাসপাতালে দৈনিক শত শত রোগী চিকিত্সা সেবা নিতে আসেন। কিন্তু চিকিত্সক সংকটের কারণে রোগীরা তাদের কাঙ্ক্ষিত চিকিত্সা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা ৫০ হলেও রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ। বেডের অভাবে হাসপাতালের বারান্দায় থাকতে হয় রোগীদের। হাসপাতালটিতে চিকিত্সক ও যন্ত্রপাতি সংকটের পাশাপাশি আছে খাবার পানির তীব্র সংকট। তার ওপর বেশিরভাগ সময় থাকে না বিদ্যুত্। এ হাসপাতালে চিকিত্সকের ৩০টি পদ থাকলেও সেখানে রয়েছেন মাত্র ১১জন। এরমধ্যে ৪জন আছেন আবার ডেপুটেশনে। ফলে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত চিকিত্সা সেবা না পেয়ে অধিকাংশ সময় নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এদিকে রোগী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, হাসপাতালে নানা ধরনের সমস্যা থাকলেও হাসপাতালের মূল কর্মকর্তা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুর রকিবকে অধিকাংশ সময় হাসপাতালে পাওয়া যায় না। জানা গেছে, ডা. আব্দুর রকিব খুলনা শহরের গল্লামারী এলাকায় ‘রাইসা ক্লিনিক’ নামে নিজেই একটি ক্লিনিক খুলে সেখানেই চিকিত্সার নামে রমরমা ব্যবসা চালাচ্ছেন। ফলে প্রতি সপ্তাহে এক-দুদিনের বেশি তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে পারেন না। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলেও থাকেন মাত্র ঘন্টা খানেক। তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগের কথা স্বীকার করেছেন খোদ সিভিল সার্জন ডা. মো. ইয়াসিন আলী সরদার। সিভিল সার্জন জানান, রোগী ও স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়ে গত ২৪ জুন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের মাসিক সভায় তাকে মৌখিকভাবে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। এর পরেও যদি অভিযোগ পাওয়া যায় তাহলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নার্সরাই যেখানে চিকিত্সক! :বটিয়াঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দিনে দুইজন চিকিত্সক থাকলেও সন্ধ্যার পর নার্সরাই চিকিত্সকের কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সন্ধ্যার পর জরুরি বিভাগে কোন চিকিত্সক না থাকায় গর্ভবতী নারী এবং গুরুতর অসুস্থ রোগীরা এখানে এসে মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে পড়েন। এ উপজেলার রোগীদের ভোগান্তির শেষ নেই। স্টাফ বলতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রয়েছে কাগজে-কলমে ৫ জন স্বাস্থ্য সহকারী ও ৮ জন নার্স। স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সুশান্ত কুমার দেশের বাইরে যাওয়ায় রোগীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. নিয়াজ নওশেদ থাকেন খুলনা শহরে। রাতে জরুরি বিভাগের চিকিত্সক ডা.আয়ুব আলীর ডিউটি থাকলেও তিনি সন্ধ্যার আগেই চলে যান জেলা শহরে। নেই ব্লাড ব্যাংক: ৩১ শয্যা বিশিষ্ট পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৯ জন ডাক্তার থাকার কথা থাকলেও সেখানে রয়েছেন ৬ জন। দীর্ঘদিন ধরে এক্স-রে মেশিনটি বিকল হয়ে পড়ে আছে। ফলে রোগীদের এক্স-রে করতে ১০০ কিলোমিটার দূরে জেলা সদরে ছুটতে হয়। রেডিওলজিস্ট-এর ২টি পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় প্যাথলজি বিভাগের লোককে রেডিওলজিস্টের দায়িত্ব পালন করতে হয়। হাসপাতালে ব্লাড ব্যাংক না থাকায় রোগীদের বাইরে থেকে রক্ত সংগ্রহ করতে হয়। প্রয়োজনীয় রক্তের অভাবে অনেক সময় রোগী মারা যায়। এর ওপরে হাসপাতালে রয়েছে তীব্র ওষুধ সংকট। হাসপাতালে ভর্তি রোগী শাহজাদপুর গ্রামের তারাবানু, জবেদ আলী ও গড়ইখালী গ্রামের রহিম জানান, তারা ঠিকমত ওষুধ পাচ্ছেন না। দামী ওষুধগুলো তাদের বাইরে থেকে কিনে খেতে হচ্ছে। এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানান, ৩১ শয্যার এ হাসপাতালে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৪০ জন রোগী ভর্তি থাকে। ফলে রোগীদের চাহিদামত ওষুধ সরবরাহ করা যায় না। মাত্র একজন চিকিত্সক দিয়ে চলছে হাসপাতাল! : কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চলছে মাত্র একজন চিকিত্সক দিয়ে। এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৬টি চিকিত্সকের পদ থাকলেও খাতা-কলমে মাত্র ৩জন চিকিত্সক রয়েছেন। তার মধ্যে ১ জন ট্রেনিংয়ে রয়েছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা অধিকাংশ সময় উপজেলা ও জেলাতে দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে হাসপাতালে সময় দিতে পারেন না। একমাত্র আরএমও ডা. সুজাত আহমেদ রোগীদের চিকিত্সা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান ভুক্তভোগী রোগীরা। এই হাসপাতালে ডা. দীপিকা রানী নামে একজন চিকিত্সকের পোস্টিং থাকলেও তিনি খুঁটির জোরে দীর্ঘদিন ধরে ডেপুটেশনে খুলনা জেনারেল হাসপাতালে রয়েছেন। অথচ তিনি নিয়মিত এই হাসপাতাল থেকে বেতন-ভাতা উত্তোলন করেন। তেরখাদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক্স-রে মেশিনটি দীর্ঘদিন ধরে অচল। এ হাসপাতালে ১৫ টি চিকিত্সকের পদ থাকলেও আছেন মাত্র চারজন। এরমধ্যে একজন ডেপুটেশনে ও আরেকজন দুই মাসের ছুটিতে আছেন। মূলত দুইজন চিকিত্সক থাকলেও দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফকির মো. মনিরুজ্জামান। কারণ ডা. আহসান হাবিব নামে অপর মেডিক্যাল অফিসার এখানে পোস্টিং থাকলেও থাকেন খুলনাতে। হাসপাতাল সূত্র, রোগী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, তিনি মাঝে-মধ্যে হাসপাতালে এসে হাজিরা খাতায় সই করেই চলে যান। শিশু বিভাগ চালান মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট! :আটজন মেডিক্যাল অফিসারের পরিবর্তে মাত্র তিনজন দিয়ে চলছে রূপসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। আরএমও পদটি দীর্ঘ ৮ বছর ধরে শূন্য থাকার কারণে ১জন মেডিক্যাল অফিসার অস্থায়ীভাবে এ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। একজন মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট দিয়ে চালানো হচ্ছে শিশু বিভাগ। ল্যাবে ২টি পদই শূন্য থাকায় রোগীদের সামান্য পরীক্ষার জন্যও শহরে যেতে হয়। রোগীবহনকারী একমাত্র এম্বুলেন্সটি সার্ভিসিং না করার কারণে লক্কর ঝক্কর মার্কা যানবাহনে পরিণত হয়েছে। এ হাসপাতালে খাবারের মান অত্যন্ত নিম্নমানের বলে রোগীদের অভিযোগ রয়েছে। এক্স-রে মেশিন অকেজো:ফুলতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৫ জন চিকিত্সকের স্থলে আছেন ১৪ জন ডাক্তার। এর মধ্যে আবার ৭ জনই আছেন ডেপুটেশনে। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালটির এক্স-রে মেশিনটি বহুদিন যাবত্ অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। একমাত্র জেনারেটরটিও দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট। এখানকার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মনজুর মোর্শেদ ডেলিভারী রোগীসহ অন্যান্য রোগীদের অপারেশন করে থাকেন। চিকিত্সকরা আসেন মাঝে-মধ্যে! : ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এ হাসপাতালে ২৩টি প্রথম শ্রেণির পদের মধ্যে আছে মাত্র ৮টি। সার্জারি, মেডিসিন ও অজ্ঞানকারী চিকিত্সকের (এ্যানেসথেশিয়া) পদসহ ১৫টি পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। এ উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রেও কোন চিকিত্সক নেই। ফলে রোগীদের প্রবল চাপ থাকে উপজেলা হাসপাতালে। সূত্র জানায়, এ হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. ইউনুস আলী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিত্সা সেবা দানের একমাত্র ভরসা। অন্যান্য চিকিত্সকরা মাঝে-মধ্যে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে কিছু সময় থেকে চলে যান। বাধ্য হয়ে উপ-সহকারী চিকিত্সকরা (মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট) চিকিত্সকদের রুমে বসে রোগীদের সেবা দিয়ে থাকেন। একই অবস্থা জরুরি বিভাগেও। চিকিত্সক সংকটের পাশাপাশি এ হাসপাতালে ওষুধ সংকটও প্রকট। এর ওপর নার্সদের রূঢ় আচরণে অতিষ্ঠ রোগীরা। ডাক্তার থাকলেও চিকিত্সা মেলে না!:দিঘলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সক সংকট না থাকলেও রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পান না বলে অভিযোগ রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ হাসপাতালের ১৫টি পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে শুধুমাত্র আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ও অজ্ঞানকারী চিকিত্সকের পদটি। এছাড়া এ হাসপাতালের এক্স-রে মেশিনটি দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সিভিল সার্জনের বক্তব্য: খুলনার চিকিত্সা ব্যবস্থার নানা সংকট-অনিয়ম সম্পর্কে সিভিল সার্জন ডা. মো: ইয়াসিন আলী সরদার ইত্তেফাককে বলেন, বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকসহ জনবল সংকট সমাধানের জন্য চেষ্টা চলছে। আশা করা হচ্ছে, চলতি জুলাই মাসের মধ্যেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এছাড়া এক্স-রে মেশিনসহ চিকিত্সা সরঞ্জামাদি কেনার জন্য এই অর্থবছরে (২০১৪-১৫) সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হবে। তিনি বলেন, ওষুধ পাচার হওয়ার তথ্যটি সঠিক নয়। আর রোগীদের মধ্যে মানসম্মত খাবার পরিবেশন করা হয় বলে তিনি দাবি করেন। চিকিত্সকদের ক্লিনিকে সময় কাটানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চিকিত্সকদের মাসিক সমন্বয় সভায় এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মৌখিকভাবে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। এরপরও যদি কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।