আয় বৈষম্য ও বেকারত্ব দূর করতেই সামাজিক ব্যবসা

নোবেল বিজয়ী বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, আমাদের পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যার টাকা আছে তাকেই অর্থের জোগান দেয়া হয়। যার টাকা নেই সে সুযোগ পায় না। প্রচলিত ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলোও যার অর্থ নেই, তাকে ঋণ দেয় না। এ অবস্থা ভেঙ্গে দিতে হবে। সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠন করতে হবে। সমাজের সমস্যা চিহ্নিত করে তরুণরা যে উদ্যোগ গ্রহণ করবে, এ তহবিল থেকে তাদেরকে সহায়তা করতে হবে। যাদের প্রয়োজন তাদেরকে অর্থের জোগান দিতে হবে। এটি সম্ভব হলে আয়ের বৈষম্য কমবে, বেকারত্ব দূর হবে। এলাকাভিত্তিক সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠন করা হলে সমাজের-মানুষের সমস্যা নিরসন হবে। ফলে সৃষ্টি হবে বেকারবিহীন বিশ্ব, যেখানে গরীব বলে কেউ থাকবে না। গতকাল বুধবার বিকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে সামাজিক ব্যবসা যুব সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি এবং ইউনূস সেন্টার যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সামাজিক ব্যবসার প্রবক্তা ড. ইউনূস বলেন, তরুণরা সমাজের পরিবর্তন চায়। এজন্য তারা পথ খুঁজে। সামাজিক ব্যবসা তাদের কাঙ্ক্ষিত পথগুলোর চমত্কার একটি পথ। এ ব্যবসার মাধ্যমে তরুণরা নিজেদের সৃজনশীল শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সমাজ-দেশ-বিশ্বের সমস্যা সমাধান করতে পারবে। তিনি বলেন, আমাদের তরুণরা কিছুটা হতাশ। তারা নিজের ভবিষ্যত্, সমাজের ভবিষ্যত ঠিকভাবে দেখতে পায় না। সামাজিক ব্যবসার ধারণা তাকে স্বস্তি দিয়েছে। নিজেদের যোগাযোগ-সৃষ্টিশীলতার ক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ তারা এ ব্যবসায় কাজে লাগাতে চায়। এটি বাস্তবায়িত হলে সমাজেও ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে ‘সামাজিক ব্যবসা’ কোর্স পড়তে চাইছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী এ অর্থনীতিবিদ বলেন, বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও পুঁজিবাদী কাঠামো গোটা দুনিয়াকে হতাশ করেছে। এ কাঠামোর মধ্যে আমরা মানবিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখি না। যে পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি, তা বাস্তবায়নের পথ দেখি না। ২০০৮ সালে বিশ্ব জুড়ে অর্থনৈতিক সংকট এ ধারণাকে প্রমাণ করে। গুটি কয়েক মানুষ বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। মানুষে মানুষে আয়ের বিরাট পার্থক্য। এ বৈষম্য শুনতে ভালো লাগে না। বিশ্বে ৮৫ ব্যক্তির যে ধন সম্পদ আছে, পৃথিবীর অর্ধেক জনসংখ্যার সব সম্পদ যোগ করলেও সেই পরিমাণ সম্পদ নেই। এ পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে যিনি যত বেশি উপরে আছেন, নিচের জনকে তিনি তত বেশি চুষছেন। এ অর্থনীতির কাঠামোটাই এমন। পুঁজিপতিরা ইচ্ছে করলেই এটি থেকে বের হতে পারবেন না। পুজিবাদী অর্থনীতির এ কাঠামো থেকে মুক্ত হতে না পারলে আয়ের বৈষম্য দূর হবে না। মূলের পরিবর্তন না হলে সরকার যতই প্রণোদনা দিক, তাতে কাজ হবে না। এটি আপতকালীন ঠেক দেয়ার কাজ। এ অবস্থার নিরসনে অর্থ ব্যবস্থাকেই ঢেলে সাজাতে হবে। তিনি বলেন, বিশ্ব জুড়েই দারিদ্র্য ও বেকারত্বের সমস্যা রয়েছে। বিদ্যমান পুঁজিবাদী অর্থনীতির কাঠামো থেকে বের হওয়া ছাড়া মুক্তি মিলবে না। মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক যখন শুরু হলো, তখন এর সাফল্যের সম্ভাবনা সম্পর্কে অনেকেই দ্বিমত করলেন। পরে প্রমাণিত হলো, আমরা পারি। দেশে ও দেশের বাইরে সব জায়গায় আমরা পাস করেছি। কিন্তু এ ব্যবস্থা এখনও শুধু ক্ষুদ্র ঋণ বলেই অভিহিত করা হচ্ছে। এটিকে ঠিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা বলে স্বীকৃতি দেয়া হলো না। অথচ অর্থনৈতিক সংকটে আমাদের বিদ্যমান ব্যাংকিং ব্যবস্থা বরফের মত গলে গেল। সরকার ঋণ দিয়ে এটিকে আপাতত ঠেকালো। অথচ এ সুযোগে ব্যাংকিং খাতকে ঢেলে সাজানো যেত। সমন্বিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেত। কিন্তু সেটি আর হলো না। তিনি বলেন, তরুণরা লেখাপড়া শিখেও বেকারত্বের শিকার। এটি তাদের দোষ নয়। আমাদের অর্থ ও সমাজ ব্যবস্থার কারণে এটি হয়েছে। বিদ্যমান অর্থকাঠামো তাদেরকে সে সুযোগ দিচ্ছে না। সমাজ বেকারকে পরিত্যক্ত হিসেবে বিবেচনা করে। সুযোগ না দিয়ে একজন যোগ্য মানুষকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। এ সমাজের পরিবর্তন করতে হবে, যেখানে তরুণরা চাকরিপ্রার্থী নয়, চাকরিদাতায় পরিণত হবে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে চাইলেইতো চাকরি পাওয়া যায় না। চাকরি পাওয়া মানে, শুধু সময় দেয়া নয়। এর জন্য টাকাও লাগে। এক লাখ, দুই লাখ, পাঁচ লাখ, দশ লাখ টাকা দেয়া লাগে। এটি এখন সবাই জানে। টাকা দিয়ে চাকরি পেতে হলে টাকা দিয়ে ব্যবসা করাই ভালো। তখন তরুণ চাকরি পাওয়া নয়, চাকরি দিতে পারবে। ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ভিসি অধ্যাপক আবদুর রবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এনায়েত উল্লাহ, ইউনিভার্সিটি ফাউন্ডেশনের সহ-সভাপতি ড. এবিএম শহিদুল ইসলাম, প্রো-ভিসি অধ্যাপক আব্দুল হান্নান চৌধুরী, ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক লামিয়া মোর্শেদ। সৃজনশীল মানুষ বেকার হতে পারে না নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, বেকারত্ব নকল জিনিস। সৃজনশীল মানুষ কখনও বেকার হতে পারে না। বেকারত্বের একটি ‘তাত্ত্বিক কাঠামো’ সৃষ্টি করা হয়েছে। এটা অবশ্যই ভুল কাঠামো। গতকাল বুধবার মহাখালীর রাওয়া কনভেনশন সেন্টারে ‘দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সামাজিক ব্যবসা’ শীর্ষক কর্মশালায় তিনি এসব কথা বলেন। কর্মশালার আয়োজক ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সোশ্যাল বিজনেস একাডেমিক সেল ও ইউনূস সেন্টার। অনুষ্ঠানে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. কে. এম মোহসীনের সভাপতিত্বে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাপানের কিউসু বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. আশির আহমেদ, মালয়েশিয়ার কেবাংসাং বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাহ আলম, ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক লামিয়া মোর্শেদ প্রমুখ। তরুণদের উদ্দেশে ইউনূস বলেন, তরুণরা চাকরিপ্রার্থী নয়, তারা চাকরিদাতা। পরিকল্পনা নিয়ে এলে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তহবিলের সংকট হবে না। তিনি বলেন, তরুণরা যখন ব্যবসার উদ্যোগ নিয়ে আসেন, তখন আমরা খুব অনুপ্রাণিত হই। সামাজিক ব্যবসা দিয়ে সামাজিক সমস্যা দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তরুণদের স্বপ্ন ও উদ্যোগ নিয়ে বেকারত্ব দূর করতে হবে। ড. ইউনূস মনে করেন, পৃথিবীতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে যখন বেকারত্ব বলে কিছু থাকবে না। সুস্থ শরীরের একজন মানুষ বেকার থাকবে, এটা হতে পারে না।