নজরকাড়া প্রহরীরা
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০১৪, ১৯:৪৯
চলমান বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় তারকা হতে যাচ্ছেন কে? লিওনেল মেসি, নেইমার, টমাস মুলার কিংবা হালের জেমস রড্রিগেজ নামগুলোই বার বার ঘুরে-ফিরে আসবে। কেউ ভুলেও গুইলেরমো ওচোয়া, ভিনসেন্ট এনেইমা, টিম হাওয়ার্ড বা কেইলর নাভাসদের নাম নিবেন না। কিন্তু ব্রাজিলে যে তারকাদের চেয়ে তারাই বেশি আলো ছড়াচ্ছেন। গোলপোস্টের নিচে তাদের সতর্ক পদচারণা নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে এবারের বিশ্বকাপে। বিশ্বকাপের প্রথম পর্ব থেকেই শিরোনামে আসছিলেন মেসি, নেইমার, পার্সিরা। কিন্তু মূল নায়ক যে তারা নন। বিশ্বকাপের মূল তারকার আসনে উঠে এসেছেন একেকটি দলের গোলরক্ষকরা। টিম হাওয়ার্ড, গুইলারমো ওচোয়া এবং জুলিও সিজাররা তার প্রমাণ ইতোমধ্যেই দিয়ে দিয়েছেন।
গতকাল সালভাদোরে শেষ ষোলোর কঠিন লড়াইয়ের পরে বেলজিয়াম অতিরিক্ত সময়ে ২-১ গোলে জয়ী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বিদায় করে শেষ আট নিশ্চিত করেছে বেলজিয়াম। ম্যাচটির পরপরই বেলজিয়ামের অধিনায়ক ভিনসেন্ট কোম্পানী যুক্তরাষ্ট্রের গোলরক্ষক হাওয়ার্ড সম্পর্কে টুইটারে মন্তব্য করেছেন, ‘দুটি শব্দ...টিম হাওয়ার্ড’!
৩৫ বছর বয়সী এভারটনের এই গোলরক্ষকের ১২০ মিনিটের ক্লান্তিহীন পারফরমেন্সের পরে বেলজিয়ামের রোমেলু লুকাকু এবং ড্রিয়েস মারটেনস জড়িয়ে ধরে অভিবাদন জানাতে ভুল করেননি। পুরো ম্যাচে বেলজিয়ামের ১৬টি দুর্দান্ত প্রচেষ্টা আটকে দিয়ে তিনি ১৯৬৬ সালের পরে বিশ্বকাপের এক ম্যাচে কোন গোলরক্ষক হিসেকে অনন্য এক রেকর্ড গড়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণভাগ যখন বেলজিয়ামের মারটেনস, ডিভোক ওরিগি, ইডেন হ্যাজার্ডদের মুহুর্মুহু আক্রমণ সামলাতে ব্যস্ত ছিল তখন গোলবারে অতন্দ প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন হাওয়ার্ড। ম্যাচ শেষে যুক্তরাষ্ট্রের কোচ জার্গেন ক্লিন্সম্যানও হাওয়ার্ডের কৃতিত্বের প্রশংসা করেছেন। তার মতে ম্যাচের শেষ মিনিট পর্যন্ত হাওয়ার্ডই বেলজিয়ামকে আটকে রেখেছিল। সাবেক জার্মান খেলোয়াড় বলেন, ‘হাওয়ার্ড আজ যেভাবে খেলেছে তা অতি অসাধারণ। তার পারফরমেন্সের কারণেই আমরা ম্যাচে টিকেছিলাম।’ প্রায় একই ধরনের পারফরমেন্স দেখিয়ে গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের বিপক্ষে মেক্সিকোকে গোলশূন্য ড্র করার ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছিলেন গোলরক্ষক গুইলেরমো ওচোয়া। আর নকআউট পর্বে চিলির বিপক্ষে দু’টি পেনাল্টি আটকে দিয়ে স্বাগতিকদের শেষ আটে পৌঁছে দিয়েছিলেন সিজার। গ্রিসের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে নায়ক ছিলেন কোস্টারিকার গোলরক্ষক কেইলর নাভাস।
সোমবার আলজেরিয়ার বিপক্ষে জার্মানীর গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যারের পারফরমেন্সও সকলের দৃষ্টি কেড়েছে। কোচ জোয়াকিম লো’ও ম্যাচ শেষে নয়্যারের প্রশংসা করেছেন। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে নয়তার ধারাবাহিক ভাল পারফর্ম করছেন। জাতীয় দলের হয়েও তার এমন রূপ নতুন কোন ঘটনা নয়। বেশ ক’দিন ধরেই তাকে বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রতিভাবান গোলরক্ষকদের একজন বলে মনে করা হয় । আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে কেবল গোলপোস্ট আগলে রেখেই সন্তুষ্ট ছিলেন না নয়্যার। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, ম্যাচে যতগুলো সেভ করেছেন, তার চেয়ে বেশি ট্যাকল করেছেন নয়্যার। পরিসংখ্যান বলছে গোটা ম্যাচে ২১ বার নিজের জায়গা ছেড়ে ডি-বক্সের বাইরে চলে এসে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করেছেন নয়্যার। প্রথমার্ধে ডি-বক্সের ভিতরেই বা ছিলেন কতক্ষণ!
জার্মান ফুটবল ইতিহাসে জন্ম হয়েছিল বিশ্বখ্যাত বেশ কয়েকজন সুপারের। এদের মধ্যে অন্যতম দু’জন হলেন বিশ্বকাপ জয়ী দুই অধিনায়ক — ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার ও লোথার ম্যাথুস। নকআউট পর্বের ম্যাচে যেন তাদের কাতারেই চলে এলেন নয়্যার। সাথে গোলপোস্ট আগলে রাখার বাড়তি দায়িত্ব তো আছেই। শুধু আক্রমণ প্রতিহত করেই ক্ষান্ত ছিলেন না নয়্যার, বল বানিয়ে সামনে দিতেও দেখা যায় তাকে। লম্বা করে তার নিক্ষিপ্ত বল থেকে প্রায় গোল করেই ফেলেছিলেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব চেলসির ফরোয়ার্ড আন্দে শুরলে। ম্যাচ শেষে খেলার এই অভিনব ধরনকে মোটেই নতুন বলে মানছেন না নয়্যার। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রথম নব্বই মিনিটে আমি কোন গোল হজম করতে চাইনি। আর এমন না যে আমি নিজের খেলার ধরনে অনেক বড় একটা পরিবর্তন এনেছি। এভাবে বায়ার্ন মিউনিখে বা জাতীয় দলের হয়েও আমি খেলেছি। ফলে ব্যাপারটার সাথে আমি ভালভাবেই অভ্যস্ত ছিলাম। কোন সমস্যা ছাড়াই তাই করতে পেরেছি।’ তবে, বিশ্বকাপ শুরুর আগে নয়্যারের মত সব গোলরক্ষকই এতোটা স্বস্তিতে ছিলেন না। ওচোয়ার ফ্রেঞ্চ ক্লাব অ্যাজাসিও রেলিগেটেড হয়ে দ্বিতীয় বিভাগে নেমে যাবার পরে গত মৌসুমটা কোন ক্লাবে খেলতে পারেননি এই মেক্সিকান গোলরক্ষক। ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন ফ্রি এজেন্ট হিসেবে। ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচে স্ট্রাইকার নেইমারের শক্তিশালী হেড এক হাতে যেভাবে আটকে দিলেন তাতে আরেকবার ১৯৭০ বিশ্বকাপের ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তী পেলের হেডের বিপরীতে ইংলিশ গোলরক্ষক গর্ডন ব্যাঙ্কসের পারফরমেন্সকে মনে করিয়ে দিলেন ওচোয়া। একটা ঘটনাই বদলে দিচ্ছে ওচোয়ার জীবন। সেই ম্যাচের পরপরই ওচোয়াকে পেতে ইংলিশ দল লিভারপুল আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ওচোয়া নিজেও ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবটিতে খেলার ব্যাপারে আগ্রহী। -এএফপি/ওয়েবসাইট