ঐতিহাসিক কালপর্বের জ্বলন্ত বিবরণ

আখতার হুসেন স্বাধীনতার পটভূমি ১৯৬০ দশক মোরশেদ শফিউল হাসান প্রচ্ছদ :ধ্রুব এষ প্রকাশক : অনুপম প্রকাশনী প্রকাশকাল :ফেব্রুয়ারি ২০১৪ মূল্য : ৪০০ টাকা। বিংশ শতাব্দীর ছয়ের দশক (ষাটের দশক বলেও যা অভিহিত) সত্যিই বিশ্বের এক অবিস্মরণীয় ঘটনাবহুল কালপর্ব। আমাদের তারুণ্য ও যৌবন উদ্দীপ্ত করতে এই দশকটির ঐতিহাসিক কালসৃষ্টিকারী সব ঘটনা অপরিমেয় উত্স হিসেবে প্রেরণা যুগিয়েছে। এই দশকেই বিশ্বের প্রথম নারী নভোচারী তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভ্যালেন্তিনা তেরেসকোভা মহাশূন্যে সাফল্যের সঙ্গে বিচরণ করছেন, সঙ্গীতজগতে রক অ্যান্ড রোলের ক্ষেত্রে ‘বিটলস ম্যানিয়া’ সৃষ্টি করছে জন লেনন, পল ম্যাকার্টনি, জর্জ হ্যারিসন ও রিঙ্গোস্টারকে নিয়ে গড়ে তোলা ‘বিটলস’ ব্যান্ড গ্রুপ, কালো মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করার অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে জেলে যাচ্ছেন দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা, জাঁ-পল সার্ত্র ও ফরাসি ছাত্র আন্দোলনও থাকছে না আমাদের মনোযোগের বাইরে, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ইউরোপ ও আমেরিকা জোড়া সেই যুদ্ধ-বিরোধী বিক্ষোভ, বার্ট্রান্ড রাসেলের শান্তিবাদী তত্পরতা, হো-চিন মিনের নেতৃত্বের সাহসিকতা, ভিয়েতনামি যুবক নগুয়েন ভান ত্রোইয়ের বীরত্বসূচক মৃত্যু আমাদের উথালপাথাল করে তুলছে। শুধু কি তাই, এই ছয়ের দশকেই মার্কিন অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ঘাতকের হাতে প্রাণ হারাচ্ছেন, ল্যাটিন আমেরিকায়, আফ্রিকায় প্রাণ হারাচ্ছেন যথাক্রমে আর্নেস্তো চে গুয়েভারা ও প্যাট্রিস লুমুম্বা, এঁদের আত্মাহুতি প্রেরণাদীপ্ত করে তুলছে আমাদের। সর্বোপরি এই দশকেরই শেষাশেষি চাঁদের মাটিতে প্রথম পা রাখছেন আমেরিকান নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং। এ তো গেল আন্তর্জাতিক বা বিশ্বপরিসরে ছয়ের দশকে ঘটে যাওয়া ঘটনার ঘনঘটার আঁচড়কাটা বিবরণ। ওই একই কালপর্বে আমাদের দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যেসব আলোড়ক ঘটনা ঘটে চলেছিল, এতদিন তার ধারাবাহিক বিবরণ রীতিমতো অনুপস্থিত ছিল। মোরশেদ শফিউল হাসান এই প্রথম সেই অভাবটি পূরণ করেছেন তাঁর সদ্য প্রকাশিত ‘স্বাধীনতার পটভূমি ১৯৬০ দশক’ গ্রন্থ রচনার ভেতর দিয়ে। এ জন্য প্রথমেই তাঁকে অকুণ্ঠ অভিনন্দন। ছয়ের বা ষাটের দশক এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল কেন, তারও একটা পটভূমি রয়েছে। মোরশেদ সেই কাজটি যথাযথভাবে সমাধা করেছেন এই গ্রন্থের প্রথম পরিচ্ছেদটি রচনার ভেতর দিয়ে। যার এক জায়গায় তিনি বলছেন, “দেশের পূর্বাংশের নাম ‘পূর্ব বাঙলা’ বদলে সরকারিভাবে তার পূর্ব পাকিস্তান নামকরণই শুধু করা হল না, সংখ্যাসাম্য নীতির নামে জাতীয় পরিষদে উভয় প্রদেশ থেকে সমসংখ্যক প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা করে জনসংখ্যার দিক থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ এই প্রদেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠতাও হরণ করা হয়। এই শেষোক্ত পদপেক্ষপগুলোর লক্ষ্য ছিল, বলা বাহুল্য, পাকিস্তান রাষ্ট্র তথা শাসনব্যবস্থায় পাঞ্জাবের আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত করা। প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানের পরবর্তী অনেক সমস্যা-সংকট-বিপর্যয়ের বীজ সেদিন এভাবেই উপ্ত হয়েছিল। জাতীয় সংহতির নামে নেওয়া এসব ব্যবস্থাই কার্যত দেশটির দুর্বলতা ও ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।” পাকিস্তানের পাঞ্জাবি স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর এসব পদেক্ষেপের পথ ধরেই চালু হয়েছিল ১৯৫৯ সালের বুনিয়াদি গণতন্ত্র, ১৯৬২-এর তথাকথিত শাসনতন্ত্রের কল্যাণেই শুরু হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশকে আগ্রাসী শোষণ-শাসনে পদানত করে রাখার পথ পরিষ্কার করার প্রায় খোলাখুলি প্রয়াস। মোরশেদ তাঁর এই অধ্যায়ে তথ্যের যে সমাবেশ ঘটান, ইতিহাসের পুনঃপাঠে আগ্রহী সবাইকে রীতিমতো তা চমকে দেবে। ছয়ের বা ষাটের দশক যে তার স্বৈরাচারবিরোধী দ্রোহ ও সংগ্রামময় এক ঐতিহাসিক এক কালপর্ব হয়ে উঠবে অন্তিমে এইসবের সমাহার যে ভবিষ্যত্ বাংলাদেশের বীজ বপণ করবে, তার প্রস্তুতিপর্ব আমরা লক্ষ করি এই দশকের একেবারে সূচনালগ্নেই। আইউব তথা পাকিস্তানি সামরিক শাসন-বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন এ-দেশের প্রগতিশীল ও গণতন্ত্রকামী ছাত্রসমাজ। তাদের এই আন্দোলন-সংগ্রামকে আরও জোরদার করা ও ঐক্যবদ্ধভাবে পরিচালনা করার লক্ষ্যে ১৯৬১ সালের শেষ দিকে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার অনুষ্ঠিত হয় সেই ঐতিহাসিক বৈঠক, যে বৈঠকের ফলাফল এনে দিয়েছিল ভবিষ্যত্ বাংলাদেশের অস্তিত্বের অনুকূলে এক তত্পর্যপূর্ণ পরিণতি। এই ঐতিহাসিক বৈঠকের অব্যবহিত পরেই শুরু হয়ে যায় সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, এনডিএফ গঠনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধকারী সদ্য জারি করা কালাকানুনের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের আন্দোলন, ছাত্রসমাজের শিক্ষা আন্দোলন; ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রবল আন্দোলনের মুখে সমাবর্তন অনুষ্ঠান পণ্ডের ঘটনা, তত্কালীন প্রাদেশিক গভর্নর মোনেম খানকে লাঞ্ছনার ঘটনা, ওই একই সালে শুরু হওয়া হামুদুর রহমান কমিশন-বিরোধী আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে সঞ্চার করে এক নতুন জীবন। ষাটের দশকের ঘটনা পরম্পরা বা তার ধারাক্রম অনুসরণে মোরশেদ শফিউল হাসানের এ যাবত্ কোনো ত্রুটি ধরা পড়েনি। তথ্য সংগ্রহ বা আহরণে নানা সূত্রের আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। একরোখা মনোভাব নিয়ে কিছু করেননি। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান যে ষাটের দশকের শুরুতেই (১৯৬১ বা ১৯৬৩ সালে) আগরতলা গিয়েছিলেন, গিয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করার অনুকূলে সর্বতোমুখী সমর্থন আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে, তার উল্লেখ দেখতে না পেয়ে একটু খটকা লেগেছে বই কি! তথ্যসূত্রের তো অভাব ছিল না। এ গ্রন্থ রচনার বেশ আগেই বেরিয়ে গেছে ফয়েজ আহমদের ‘আগরতলা মামলা, শেখ মুজিব ও বাংলার বিদ্রোহ’ এবং মমিনুল হক খোকার ‘অস্তরাগে স্মৃতি সমুজ্জ্বল : বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবার ও আমি’ নামের দুটি বই। শেখ মুজিব কীভাবে কোন পথে আগরতলা গিয়েছিলেন, তার বিবরণ ধরা আছে খোকার গ্রন্থে এবং তখনকার ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহের সঙ্গে তাঁর আলাপের সাক্ষ্য ধরা আছে ফয়েজ আহমদের গ্রন্থে। যা-ই হোক, ছাত্রসমাজের আইউব-বিরোধী আন্দোলন ও রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলনের পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার নানামুখী তত্পরতাও যে চলছিল সমানভাবে, তারও বিবরণ তুলে ধরেছেন মোরশেদ শফিউল হাসান। তুলে ধরেছেন প্রসঙ্গিত বিষয়ে কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর ভূমিকার কথা, ইনার গ্রুপের কথা, ইস্ট বেঙ্গল লিবারেশন পার্টির কথা, বেঙ্গল লিবারেশন এসোসিয়েশনের কথা, বঙ্গবাহিনী, অপূর্ব সংসদ, নিউক্লিয়াস বা ছাত্রলীগের স্বাধীনতা গ্রুপের কথা, পরিশেষে প্রবাসে স্বাধীনতার উদ্যোগের কথা। ভূমিকায় মোরশেদ লিখেছেন, “বইয়ের নামে যদিও ১৯৬০ দশক কথাটা আছে, আমি ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৭ এই দশ বছর সময় পরিধিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে চেষ্টা করেছি। আগেপরের কিছু ঘটনার উল্লেখ এসেছে নিতান্ত প্রসঙ্গক্রমে। ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ মামলা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতাপূর্ব অসহযোগ আন্দোলন সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ সংবলিত অজস্র গ্রন্থ ইতিমধ্যে নানাজন লিখেছেন।” মোরশেদের ‘অজস্র’ কথাটির আমি ঘোর আপত্তি করি। বিচ্ছিন্ন সেসব প্রয়াস। ষাট দশককে যেখানে পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে ধরার কথা, না হলে যেখানে এই গ্রন্থের নামের সার্থকতা থাকে না, সেখানে তিনি ১৯৬৭ সালে গিয়ে থামতে পারেন না। তাঁকে ১৯৬৮, ১৯৬৯ ও ১৯৭০-এ আসতেই হবে। সান্ত্বনার কথা, লেখক দ্বিতীয় খণ্ডে এই শূন্যতা পূরণ করবেন বলে কথা দিয়েছেন। তিনি কথা রাখবেন, এই আশায় থাকছি। মোরশেদ শফিউল হাসানকে আবারও অজস্র অভিনন্দন এই প্রথম ষাটের দশক নিয়ে সমভাবে ইতিহাসবিদ ও সমাজতাত্ত্বিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে একটি গ্রন্থ রচনা করার জন্য, যে গ্রন্থ হয়ে উঠেছে আমাদের একটি উজ্জ্বল কালপর্বের উজ্জ্বলন্ত দলিলবিশেষ।