এসিস্ট্যান্টরাই চিকিত্সক!
আবুল খায়ের ও মেহেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০১৪, ২২:২৫
ছয় লক্ষাধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত মেহেরপুর জেলার সরকারি চিকিত্সা কার্যক্রম কার্যত ভেঙ্গে পড়েছে। জেলার হাসপাতালসমূহে চিকিত্সকদের কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। হাসপাতালে চিকিত্সকদের দেখা তেমন একটা পান না রোগীরা। অবস্থা এমন হয়েছে যে নার্স ও মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্টদেরকেই রোগীরা ‘চিকিত্সক’ বলে মনে করেন। আর এভাবে চিকিত্সা নেয়ার কারণে বলতে গেলে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন এই জেলার রোগীরা।
জানা গেছে, মেহেরপুর সদর জেনারেল হাসপাতাল এবং গাংনী ও মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারিভাবে মঞ্জুরিকৃত চিকিত্সকের ১০২টি পদ থাকলেও বর্তমানে মাত্র ৩২ জন কর্মরত। ৭০টি চিকিত্সকের পদ বহুদিন ধরেই শূন্য। যারা আছেন তারাও ঠিকমতো কর্মস্থলে থাকেন না। এছাড়া জেলায় ৭২টি কমিউনিটি ক্লিনিক ছাড়াও রয়েছে ১২টি ইউনিয়ন পর্যায়ের মেডিক্যাল সাব সেন্টার। সরেজমিনে এসব হাসপাতাল, সাব সেন্টার ও কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে কর্তব্যরত নার্স, মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট ও রোগীদের সঙ্গে আলাপ করে জেলার চিকিত্সাসেবার নানা অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, জেলায় কর্মরত চিকিত্সকদের একটি বড় অংশ জেলা শহর কিংবা রাজধানীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে প্রাইভেট প্র্যাকটিস অথবা চাকরি করেন। মাস শেষে শুধু বেতন-ভাতা আনতে তারা কর্মস্থলে যান। উপজেলা হাসপাতালে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট সংকট থাকায় পরীক্ষা-নিরীক্ষাও বেশিরভাগ বন্ধ। এক্সরে মেশিন অব্যবহূত অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে পড়ে রয়েছে। রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে বাইরে পাঠিয়ে ক্লিনিক থেকে প্রতিমাসে ডাক্তার, নার্স ও টেকনোলজিস্টরা হাজার হাজার টাকার কমিশন পান। মূলত এ কমিশনের লোভেই জেলা ও উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে অনেক পরীক্ষাই বন্ধ। এছাড়া সার্জন ও অজ্ঞানকারী চিকিত্সক না থাকায় অপারেশনও বন্ধ থাকে। এসব কারণে এ জেলার রোগীদের সাধারণ চিকিত্সা ও অপারেশনের জন্য রাজধানীতে আসতে হয়।
রোগীরা জানান, হাতের কাছে হাসপাতাল থাকলেও ছোটখাটো অপারেশনের জন্য তাদের ঢাকায় যেতে হয়। এটা তাদের দুর্ভাগ্য। তারা অভিযোগ করেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরবরাহকৃত ওষুধ বেশিরভাগই বাইরে পাচার হয়ে যায়। খাবার সরবরাহের নামে লুটপাট চলছে। এছাড়া কোন হাসপাতালেই ব্লাড ব্যাংক নেই।
হাসপাতাল চিত্র: জেলা শহরে অবস্থিত ২৫০ বেডের মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতাল যেন নিজেই রুগ্ন হয়ে পড়েছে। এ হাসপাতালে ৪১টি ডাক্তারের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ১৫ জন। আবার কর্মরতদের অনেকে নিজের কিংবা অন্যের ক্লিনিকে বেশি সময় ব্যয় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। হাসপাতালে রোগী এসে ডাক্তার না পেয়ে অনেকে প্রাইভেট ক্লিনিকে চলে যান। যারা অসহায় ও গরীব তারাই কেবল এই হাসপাতালে ভর্তি হন। কিন্তু ডাক্তার না থাকায় অনেক সময় মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট, এমনকি ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী কিংবা নার্সদের দিয়েও এই রোগীদের চিকিত্সা করানো হয়।
অনেক রোগী অভিযোগ করেন, তারা সরকারি ওষুধ পান না। বাইরে থেকে ওষুধ কিনে আনতে হয়। এছাড়া হাসপাতালে দালালদের দাপটে অনেক রোগীকে নাজেহাল হতে হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব দেখেও না দেখার ভান করেন। প্রয়োজনীয় সুইপার না থাকায় হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিছন্নও থাকে না। দুর্গন্ধে রোগীরা আরো দুর্বল হয়ে পড়েন।
গাংনী উপজেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তারের পদ রয়েছে ২০টি। তবে কর্মরত আছেন মাত্র ৫ জন। এখানে এসিস্ট্যান্টদের দিয়ে নামেমাত্র চিকিত্সা চলছে অনেকদিন ধরে। এ উপজেলায় সাব সেন্টার আছে বামুন্দি, মহাম্মদপুর ও তেঁতুলবাড়িয়া গ্রামে। এ ৩টি সাব-সেন্টারে ৩টি মেডিক্যাল অফিসারের পদ থাকলেও সবগুলো পদই শূন্য। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সেগুলোতে ভুতুড়ে অবস্থা বিরাজ করছে। এছাড়া এই উপজেলায় ইউনিয়ন পর্যায়ে কাথুলি, কাজিপুর, ষোলটাকা, সাহারবাটি, ধানখোলা ও রাইপুরে মেডিক্যাল সাব সেন্টার আছে। এসব সাব সেন্টারে সহকারী সার্জন পদ থাকলেও সবগুলো পদই শূন্য। এখানে এসে কার্যত কোন চিকিত্সা পান না রোগীরা।
মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০টি মেডিক্যাল অফিসারের পদ আছে। তবে কর্মরত আছেন মাত্র ৪ জন। এ উপজেলায় ২টি সাব সেন্টার ও ৪টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র আছে। এসব সাব সেন্টার ও ইউনিয়ন কেন্দ্রগুলোতে কোন মেডিক্যাল অফিসার নেই। মূলত উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসারদের (মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট) দিয়ে চিকিত্সা সেবা দেয়া হয়। ফলে ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি চিকিত্সা সেবা একেবারে ভেঙ্গে পড়েছে। সাব-সেন্টারে বরাদ্দকৃত ওষুধ মাত্র ২/১ দিন বিতরণ করা হয়। পরের দিন গেলে আর ওষুধ পাওয়া যায় না বলে এলাকবাসী অভিযোগ করেছেন।
এদিকে চিকিত্সা সংক্রান্ত রিপোর্ট দেয়ার জন্য সদর উপজেলার আমঝুপি, যাদুখালি ও কুতুবপুর, মুজিবনগর উপজেলার দারিয়াপুর, কেদারগঞ্জ ও গাংনী উপজেলার বামন্দি, মহাম্মদপুর ও তেঁতুলবাড়িয়া মেডিক্যাল সাব সেন্টারে ১টি করে কম্পিউটার দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেগুলো ঠিকমত ব্যবহার হয় না বলে এলাকাবাসী জানান। ফলে দিনে দিনে এগুলো অকেজো হয়ে পড়ছে।
মেহেরপুরের চিকিত্সা সেবা সম্পর্কে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. ইসমাইল ফারুক বলেন, জেলায় ৭০টি মেডিক্যাল অফিসার পদ শূন্য থাকায় রোগীদের চিকিত্সা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। লোকবল জরুরি প্রয়োজন। এলাকাবাসীর অনেক অভিযোগ সঠিক নয় বলে তিনি দাবি করেন।